অবরুদ্ধ হানাদার বাহিনী

7

জামাল উদ্দিন

৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ : এদিন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। আকাশ ও স্থল পথে যৌথবাহিনীর শাণিত আক্রমণে দিশেহারা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। ঢাকার দিকে পালাবার কোন পথই তাদের সামনে খোলা নেই। একের সঙ্গে অন্যের যোগ দেয়ারও কোন উপায় নেই। এই সুযোগে মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তারা তিনটি ব্যবস্থা গ্রহণ করে পুরো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। জেনারেল জগজিত সিং অরোরা তিনটি কলাম (ব্যাটালিয়ন) নিয়ে ঢাকার দিকে দ্রæত অগ্রসর হতে থাকেন এবং একটি ব্রিগেডকে দ্রæত হালুয়াঘাটের দিক থেকে ময়মনসিংহের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে এই আশ্বাস দেন যে, আত্মসমর্পণ করলে পাকিস্তানীদের প্রতি জেনেভা কনভেনশনের রীতি অনুয়ায়ী সম্মানজনক ব্যবহার করা হবে। জেনারেল মানেকশ’র এই আহবান আকাশবানী বেতার থেকে নানা ভাষায় বারবার প্রচার করা হয়।

ঢাকা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন : ডেইলি টেলিগ্রাফ- এর সংবাদদাতা ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ ৮ ডিসেম্বর ঢাকার বর্ণনায় লিখেছেন, সামনে এগিয়ে চলা ভারতীয় বাহিনীর কামানের গোলাবর্ষণের আওয়াজ এখন ঢাকা থেকে শোনা যাচ্ছে, সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ঢাকা। শুধু কয়েকটি টেলিফোন কাজ করছে এবং টেলিগ্রাফ মাঝে মাঝে সচল হয়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমানে রূপসী বাংলা হোটেল), যেখানে আমি রয়েছি, সেখানকার বাগানে একদল লোক অস্থিরতায় ভুঁগছে। পাকিস্তানী সামরিক শাসকরা কিছুতেই আত্মসমর্পণের দিকে না গিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও পরাজয় সম্পর্কে নিশ্চিত হন রণাঙ্গনে থাকা পাকিস্তানী কমান্ড। এদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানী বেসামরিক গভর্নর ডা. মালেক মুক্তিবাহিনীর দাবী মেনে নিয়ে একটি সমঝোতায় উপনীত হতে পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের পরামর্শ দিয়ে ইসলামাবাদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানী সামরিক শাসকরা সে পরামর্শ উড়িয়ে দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন।
এদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকে। প্রতিক্ষেত্রে পাকিস্তানী বাহিনীকে একের পর এক পরাজিত করতে থাকে মুক্তিবাহিনী। পূর্ব সীমান্ত থেকে জেনারেল জগজিত সিং এর নেতৃত্বাধীন সবকয়টা বাহিনী দ্রæত গতিতে ঢাকার দিকে এগিয়ে আসছিল। এদিন কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হানাদার মুক্ত হয়। এর আগের দিন ৭ ডিসেম্বর রাতে সীমান্তবর্তী এলাকার তিনদিকে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী কুমিল্লা বিমান বন্দরে পাকিস্তানী বাহিনীর ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের ঘাঁটিতে আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানী বাহিনীর অবস্থানের ওপর মুক্তিসেনারা মর্টার আটিলারী আক্রমণ চালিয়ে শেষ রাতের দিকে তাদের আত্মসমর্পণ করাতে সক্ষম হয়। সারারাত ব্যাপী পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পাকিস্তান বাহিনীর একদল সেনা বিমান বন্দরের ঘাঁটি ত্যাগ করে শেষ রাতে বরুড়ার দিকে এবং সেনানিবাসে ফিরে যায়। বিমানবন্দরের ঘাঁটিতে ধরা পড়া কতিপয় পাকিস্তানী সেনা আত্মসমর্পণ করে। রাতে মিত্রবাহিনীর ১১ গুর্খা রেজিমেন্টের কমান্ডার আর কে মজুমদারের নেতৃত্বে কুমিল্লা বিমান বন্দরের তিনদিকে আক্রমণ চালানো হয়। সীমান্তবর্তী বিবির বাজার দিয়ে লে. দিদারুল আলমের নেতৃত্বে একটি দল এবং অপর দুটি দল গোমতি নদী অতিক্রম করে ভাটপাড়া দিয়ে এবং চৌদ্দগ্রামের বাঘের চর দিয়ে এসে বিমান বন্দরের পাকিস্তানী সেনাদের ঘাঁটিতে আক্রমণ করে। রাতে মিত্রবাহিনীর ১১ গুর্খা রেজিমেন্টের আর কে মজুমদারের নেতৃত্বে কুমিল্লা বিমানবন্দরের তিনদিকে আক্রমণ চালানো হয়। সীমান্তবর্তী বিবির বাজার দিয়ে লে. দিদারুল আলমের নেতৃত্বে একটি দল এবং অপর দুটি দল গোমতী নদীর অতিক্রম করে ভাটপাড়া দিয়ে এবং চৌদ্দগ্রামের বাঘের চর দিয়ে এসে বিমান বন্দরের পাকিস্তানী সেনাদের ঘাঁটিতে আক্রমণ করে।

কুমিল্লা শত্রুমুক্ত : বিজয়ের পতাকা তুললেন জহুর আহমদ চৌধুরী-
রাতের মধ্যে বিমান বন্দরের ঘাঁটিতে অবস্থানরত পাকিস্তানী সেনাদের সাথে মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর যৌথ বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাদের প্রধান ঘাঁটি পতনের মধ্য দিয়ে পরদিন ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা মুক্ত হয়। এদিন ভোরে মুক্তিসেনারা শহরের চকবাজার টমছব্রিজ ও গোমতী পাড়ের ভাটপাড়া দিয়ে আনন্দ উল্লাস করে শহরে প্রবেশ করে। তখন রাস্তায় নেমে আসে জনতার ঢল। কুমিল্লার আপামর জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে মুক্তির উল্লাসে বরণ করে নেয়। পরে এদিন বিকালে কুমিল্লা টাউন হল মাঠে বীর মুক্তিযোদ্ধা মিত্রবাহিনী জনতার উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। তৎকালীন পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক কাউন্সিলের চেয়াারম্যান মরহুম জহুর আহমেদ চৌধুরী, দলীয় পতাকা এবং কুমিল্লার প্রথম প্রশাসক অ্যাডভোকেট আহমদ আলী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
এদিকে ডিসেম্বরের শেষ দিকে চাঁদপুরের মুক্তিযোদ্ধা দামাল ছেলেরা দেশমাতৃকাকে শত্রæমুক্ত করার জন্য গর্জে উঠে। হাজীগঞ্জে পাকবাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়। একটানা যুদ্ধ চলে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা। দুর্বল হয়ে পড়ে শত্রæপক্ষ। অবশেষে ওই পক্ষের ৩৯ অস্থায়ী ডিভিশন অফিসার প্রফেসর মেজর কমান্ডিং জেনারেল রহিম খান হাজীগঞ্জ হামিদা জুটমিলসহ তাদের সবগুলো ক্যাম্প ছেড়ে পালাতে শুরু করে। ৭ ডিসেম্বর রাতে চাঁদপুর শহরে এসে তারা যখন নদীপথে গানবোট, লঞ্চ ও স্টিমাযোগে নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য জায়গায় রওয়ানা দিতে চায় তখন চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকা শত্রæমুক্ত করে আসা মুক্তিযোদ্ধারা তাদের নৌযানের উপর আক্রমণ চালায়। এতে বহু পাক সেনা হতাহত হয়। মেজর জেনারেল রহিম খানও এসময় আহত হন। তবে তার ভাগ্য ভালো ঢাকার দিক থেকে উড়ে আসা একটি হ্যালিকপ্টার তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। বলা বাহুল্য হাজীগঞ্জ থেকে শত্রু বাহিনী পালিয়ে আসার পর যাবার প্রাক্কালে দুর্বল হয়ে পড়ায় কোন প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়নি। তাই বলতে গেলে বিনা বাধায় ৮ ডিসেম্বর চাঁদপুর মুক্তি হয়। এদিকে ওই সকাল থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা মহকুমা শহরে জড়ো হতে থাকে। ১০টার দিকে মিত্রবাহিনীর ট্যাংক বহর লে. কর্নেল সুট্টির নেতৃত্বে মহকুমা শহরটিতে প্রবেশ করে। তার বিএলএফ বাহিনীর চাঁদপুর মহকুমা কমান্ডার রবিউল ইসলাম কয়েক হাজার জনতাকে সাথে নিয়ে চাঁদপুর থানার সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে উড়িয়ে দেয় বাংলাদেশের পতাকা।
এদিকে একটি দল এগুচ্ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত করে ঢাকার দিকে। অপর একটি বাহিনী আশুগঞ্জের সেতুর দিকে এগুচ্ছিল। ৫৭তম ভারতীয় মাউন্টেন ডিভিশন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছায়। পাকিস্তানি বাহিনী এর আগেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছেড়ে চলে যায়। এভাবে ‘এস’ ফোর্সও বিনা বাধায় সরাইলে পৌঁছায়। সন্ধ্যার মধ্যে একাদশ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট আশুগঞ্জের পূর্বপাশে আজমপুর এবং দুর্গাপুরে সমাবেশ করে। সরাইল এবং শাহবাজপুরের মধ্যে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল এবং সেক্টরভুক্ত এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য পেছন দিক থেকে অগ্রসর হতে থাকে। ভারতীয় ৩১১তম মাউন্টেন ব্রিগেডের দশম বিহার রেজিমেন্ট দুর্গাপুরের দক্ষিণে সমবেত হয়। যৌথবাহিনীর এই অগ্রগতির ফলে পাকিস্তান সরকার ও তাদের মিত্র দেশগুলোর বুঝতে বাকি থাকে না যে, যুদ্ধে তাদের হার নিশ্চিত।

জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব:
এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অবিলম্বে যুদ্ধ বিরতি পালন এবং সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি আহব্বান জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করে। এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ পরিষদে ভারতীয় প্রতিনিধি সমর সেন বলেন, পাকিস্তানকে অবশ্যই বাংলাদেশকে স্বীকার করে নিতে হবে। উপমহাদেশে শান্তি পুনপ্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে হবে। এসব প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য না হলে জাতিসংঘের কোন প্রস্তাবই বাস্তবায়ন করা যাবে না।

কুষ্টিয়া হানাদার মুক্ত:
এদিকে ৮ ডিসেম্বর ভোরে কমান্ডার আফতাব উদ্দিন খান ১৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে কুষ্টিয়ার মিরপুর থানায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা গান স্যালুটের মাধ্যমে উত্তোলন করেন। এরপর ৬৫ জন পাক হানাদার বাহিনীর দোসর ও রাজাকার পাহাড়পুর মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে আত্মসমর্পণ করে। এদিনে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরকে শত্রæমুক্ত করে থানা চত্বরে বিজয় পতাকা উড়ানোর মধ্য দিয়ে মুক্তিকামী বীর সূর্য সন্তানেরা দৌলতপুরকে হানাদার মুক্ত করেন।

তিনশত পাকিস্তানী সেনা নিহত:
দৌলতপুরকে হানাদার মুক্ত করতে ৩৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ কয়েক’শ নারী-পুরুষ শহীদ হন। সবচেয়ে বড় যুদ্ধ সংঘঠিত হয় উপজেলার ধর্মদহ ব্যাংগাড়ির মাঠে। এ যুদ্ধে প্রায় সাড়ে ৩’শ পাকিস্তানী সেনা নিহত হয়। শহীদ হন ৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ৩ জন ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সদস্য। ৮ ডিসেম্বর সকালে আল্লারদর্গায় পাকিস্তানী সেনারা দৌলতপুর ত্যাগ করার সময় তাদের গুলিতে মুক্তিযোদ্ধা রফিক শহীদ হোন। এদিনে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা পাকিস্তানী হানাদার মুক্ত হয়।

পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারতীয় সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি ভয়াবহ:
এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের মূল ভরসার স্থল ছম্বে উপর্যুপরি চেষ্টা সত্তে¡ও পাকিস্তানের অগ্রগতি প্রায় থেমে যায়। অন্যত্রও অবস্থা বেশ খারাপ। রাজস্থান-সিন্দু সীমান্তে বরং ভারতের প্রাধান্যই পরিলক্ষিত হয়, করাচীর উপর ভারতীয় নৌ ও বিমান আক্রমণ অব্যাহত থাকে। সংক্ষেপে, পশ্চিম-পাকিস্তানে তাদের কোন অগ্রগতি নেই; আর পূর্বে কেবল পশ্চাৎগতি। পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ডের সম্যক বিপর্যয় দৃষ্টে রাওয়ালপিন্ডির সামরিক কর্তারা নিয়াজীর মনোবল ফিরিয়ে আনার জন্য ‘চীনের তৎপরতা শুরু হয়েছে’ বলে তাকে জানায়।

পাকিস্তানে ক্ষমতার রদবদল:
এহেন শোচনীয় সামরিক পরিস্থিতির মাঝে ইয়াহিয়া খান বেসামরিক প্রতিনিধিদের হাতে তার শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের দীর্ঘ দিনের ‘ওয়াদা’ বাস্তবায়িত করতে শুরু করেন এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান’ থেকে নুরুল আমিন ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী ও উপ প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। অন্যত্র ভারতে একই দিন অর্থাৎ ৮ই ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় সর্বশেষ সামরিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থতির আলোকে ভারতের সরকারি মুখপাত্র ঘোষণা করেন, পাকিস্তান যদি পূর্ব বাংলায় তাদের পরাজয় স্বীকার করে নেয়, তবে অন্যান্য সকল অঞ্চলেই ভারত যুদ্ধ বন্ধ করবে। বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের কোন অঞ্চলেই কোন ভূখন্ড দখল করার অভিপ্রায় ভারতের নেই।

জামাল উদ্দিন : মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, লেখক ও প্রকাশক