অপ্রতিরোধ্য অর্থ পাচার! অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে

1

তথ্য-প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যোগসূত্র প্রবল। বিশেষ করে মানি লন্ডারিং-এর ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রয়েছে প্রযুক্তির। এর ফলে বিশ্বব্যাপী বৈধ আর্থিক লেনদেন বেড়েছে, বেড়েছে দেশে উন্নয়নের গতিপ্রবাহ। কিন্তু এতো ভালো দিকগুলোকে ম্লান করে দিচ্ছে অবৈধ লেনদেন। সম্প্রতি এক তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী অর্থ পাচারকারীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মুদ্রাপাচার করছে। সুইজারল্যান্ড কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মুদ্রাপাচার বেড়েছে ২০ শতাংশ, পাচার হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম প্রকল্পের আওতায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি সেখানে বাড়ি কিনেছে। কানাডার বেগমপাড়ায় অনেক বাংলাদেশির বাড়ি রয়েছে। বাড়ি রয়েছে আমেরিকাসহ অনেক উন্নত দেশে। তাদের কয়জন বৈধ উপার্জন দিয়ে এসব করেছে, কয়জন মুদ্রাপাচারের মাধ্যমে করেছে, তা আমাদের জানা নেই। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, মুদ্রা পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। এজন্য শাস্তির বিধান রেখে আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। তারপরও অর্থ পাচার বন্ধ হচ্ছে না।
ধরা যায়, আইন বা বিধান থাকলেও মুদ্রাপাচার নিয়ন্ত্রণে আমাদের গৃহীত ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। আইনের ফাঁকফোকরে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় মুদ্রাপাচার রোধ করা যাচ্ছে না। সুতরাং কারণ চিহ্নিত করে ফাঁকগুলো বন্ধ করতে হবে। বস্তুত অর্থ পাচারের একটি বড় কারণ হল দুর্নীতি। দুর্নীতি রোধ করা গেলে অর্থ পাচার কমবে। দেশে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় পরিবেশ সৃষ্টি করা হলেও অর্থ পাচারের প্রবণতা কমবে। অনেকে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার কথা ভেবে অর্থ পাচারে উৎসাহী হয়। গত সোমবার জাতীয় সংসদে সম্পূরক বাজেট নিয়ে আলোচনার সময় বিভিন্ন খাতে চলমান অনিয়ম-দুর্নীতি এবং কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার রোধে সরকারের ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করা হয়। জবাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, আন্ডারইনভয়েসিং ও ওভারইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচার হচ্ছে না, তা বলব না। তবে তা আগের চেয়ে কমেছে। তিনি বিরোধী সংসদ সদস্যদের প্রতি সরকারকে সহযোগিতার আহŸান জানান। তিনি আরো বলেন, ‘এগুলো বন্ধের জন্য আগামী ১২ মাসের মধ্যে ১৫টি আইন দেখতে পাবেন। অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, অকার্যকর সিস্টেমের জন্য এগুলো হয়। আমরা সংস্কারমুখী কাজ করব। নতুন নতুন আইন করব। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে দায় নিয়ে কাজ করতে পারে, সে ব্যবস্থা করে দেব। এখানে কোনো টলারেন্স নেই।’
অর্থপাচার রোধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষায়িত শাখা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গোয়েন্দা শাখাসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। এর মধ্যে দুদকের কিছু পদক্ষেপ দৃশ্যমান হলেও অন্যদের বিশেষ কোনো ভূমিকা আছে বলে মনে হয় না। তাদের দক্ষতা নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন। ফলে অর্থপাচারও কমছে না। বিদেশে অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গেøাবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যম বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশে এত নজরদারি প্রতিষ্ঠান থাকা সত্তে¡ও কিভাবে পাচার হয়ে যাচ্ছে অর্থ! আমরা জানতাম দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিলে অর্থ পাচার বেড়ে যায়। এখন কিন্তু সেই ধরনের কোন পরিস্থিতি নেই। এরপরও কেন অর্থ পাচার হচ্ছে, এর থেকে মুক্তির উপায় খোঁজা বের করতে হবে। বস্তুত প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে তার বেশিরভাগই ব্যয় হচ্ছে ব্যক্তিগত বিলাসিতায়। অথচ এই অর্থ যদি পাচার না হয়ে দেশে বিনিয়োগ হতো, তাহলে বিপুলসংখ্যক বেকার জনশক্তির কর্মসংস্থান হতে পারত। দেশের সার্বিক উন্নয়নেও এর প্রভাব পড়ত। কাজেই অর্থ পাচারকারীরা যাতে কোনোভাবে পার না পায়, সরকারের উচিত তা নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে আইনের সংস্কার করে আরো কঠোর বিধান জারি করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী এধরণের আশারবাণী শুনিয়েছেন। আমরা কার্যকর ব্যবস্থা শিগ্গিরই দেখব-এমনটি আশা করতে পারি। আমাদের প্রতিবেশী অনেক দেশই মুদ্রাপাচার রোধে যথেষ্ট সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। ভারতে মাত্র এক বছরে মুদ্রাপাচার অর্ধেকে নেমেছে। নেপালে চার ভাগের এক ভাগে নেমেছে। আমাদের না পারার কারণগুলো নীতিনির্ধারকদের খুঁজে বের করতে হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের তালিকায় একসময় শীর্ষে ছিলেন রাজনীতিবিদরা। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাজনীতিবিদদের ছাড়িয়ে গেছেন ব্যবসায়ীরা, যাঁরা সরকারের দেওয়া প্রচুর সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ব্যবসা করেন। পাচারের তালিকায় এরপরই রয়েছেন দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারা। উন্নয়নকে গতিশীল ও টেকসই করতে অর্থ পাচারকারী যেই হোক- এদের রুখতেই হবে। এর জন্য সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে।