অপরাজেয় সংকল্পের প্রতীক শেখ হাসিনা

12

এমরান চৌধুরী

আগামীকাল শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি মাটি ও মানুষের প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারত থেকে দেশে ফিরে আসেন। সচেতন পাঠকমাত্রই স্বীকার করবেন শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস বাঙালি জাতি তথা আপামরজনতার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পঁচাত্তর পরবর্তী রুদ্ধশ্বাসের কৃষ্ণকাল পেরিয়ে শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে ফিরে না আসতেন তাহলে এদেশ, এদেশের মাটি একের পর এক এক জেনারেলের শাসনে পড়ে গণতন্ত্রের সূর্য সেই তিমিরেই থেকে যেত। গণতন্ত্রের সূর্য কখনও উদয় হতো না। শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরার এক নিখাদ চিত্র এঁকেছেন বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক সনজিত দে তাঁর ‘বঙ্গবন্ধুর কন্যা তুমি’ কবিতায়—

পঁচাত্তরের পরে যখন ওলট-পালট সব
চলছে দেশে সেনার শাসন
মিথ্যে কলরব!
স্বাধীনতার শত্রুগুলো তুলল মাথা ফের
করুণ দশা জাতির পিতার
সোনার স্বদেশের।

সর্বনাশা দৈত্যিগুলোর দাপট ভয়ংকর—
জিন্দাবাদের আওয়াজ তোলে
পাকিস্তানের চর।
ধুলায় লুটায় স্বাধীনতা
কাঁদে জন্মভূমি..
তখন এলে জননেত্রী শেখ হাসিনা তুমি।
তোমায় পেয়ে মাতৃভূমি
সাহস ফিরে পায়
দুর্দিনে এই দেশের মানুষ
তোমায় শুধু চায়।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা তুমি
বাড়িয়ে দুটি হাত—
বললে, আবার আসবে সুদিন
কাটবে আঁধার রাত।

মুক্তিময়ী নেত্রী পেয়ে
দেশের মানুষ সব—
উজাড় করা কণ্ঠে তোলে জয় বাংলা রব।
যোগ্য পিতার যোগ্য মেয়ে
সংগ্রামী অন্তর;
জাতির রায়ে তুমিই হলে
দেশের কর্তধর।

হাতের মুঠোয় মৃত্যু নিয়ে
পেরিয়ে আঁধার রাত-
আনলে দেশে ডিজিটালের
নতুন সুপ্রভাত।
তোমার গুণে হাসলো আবার
দুঃখী স্বদেশভূমি;
জাতির পিতার ধন্যমেয়ে
শেখ হাসিনা তুমি।

উন্নয়নের ফল্গুধারা
বইছে চতুর্দিক..
দিকহারা এই জাতি পেলো বাঁচার নতুন দিক।
হাতের মুঠোয় প্রযুক্তি আজ
নেই কোনো সংশয়..
এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে জাতি
সাহসী নির্ভয়।

মহান পিতার মহান মেয়ে
জাতির অহংকার;
স্বদেশফেরার দিনে জানাই
সালাম হাজার বার।

সেদিন শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে ঢাকা বিমান বন্দরে নেমেছিল জনতার উত্তাল উর্মি। প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ সেদিন মুহূর্মুহু সেøাগানের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যাকে দেশের মাটিতে বরণ করে নিয়েছিলেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির কুলাঙ্গার সন্তানদের হাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্মমভাবে নিহত হন। যে মানুষটিকে পাকিস্তানিরা হত্যা করার এতটুকু দুঃসাহস করেনি আর সেই তিনিই অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে নিজের দেশের মাটিতে মাসুম শিশুসহ হত্যার শিকার হন। ইতিহাসের সবচেয়ে নিন্দনীয় হত্যাকাÐের সময় শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোটবোন শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। পরবর্তীকালে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে ভারতে ছয় বছর অবস্থান করেন।
এদিকে বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটির মধ্যে নেতৃত্বের চরম সংকট দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতা হত্যাকাÐের পর দলটিতে শক্তহাতে হাল ধরার মতো তেমন কেউ ছিল না। ফলে নানামুখি কোন্দলে দলের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হতে থাকে। দলের ভাঙনরোধ, কোন্দল নিরসন ও দলে নতুন রক্তপ্রবাহ সৃষ্টির জন্য বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারের প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় ১৯৮১ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে ঢাকায় আওয়ামী লীগের এক অধিবেশনে শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরে এসে দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দলকে সংগঠিত করার পাশাপাশি তিনি শুরু করেন দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলন। তখন দেশে চেপে বসেছিল এক স্বৈরাচারের পর আরেক স্বৈরাচার। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে সামিল হওয়ার পরপরই তিনি সামরিক সরকারের রোষানলে পড়েন। তাঁর জীবনের ওপর হুমকি আসে, বাড়তে থাকে তাঁর জীবনের ঝুঁকি। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে কমপক্ষে ২২ বার চালানো হয় সশস্ত্র হামলা। ১৯৮৩ সালে ১৫ ফেব্রæয়ারি সামরিক সরকার তাঁকে আটক করে ১৫ দিন অন্তরীণ রাখে। এরপর থেকে তাঁকে একের পর এক গ্রেপ্তার আর অন্তরীণের পালা চলতে থাকে। এরশাদ হটাও আন্দোলনে তিনি মোট ৮ বার গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৮৪ সালের ফেব্রæয়ারি ও নভেম্বর মাসে তাঁকে ২ দফায় গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৮৫ সালের ২ মার্চ তাঁকে ফের গ্রেপ্তার করা হয়। এভাবে তাঁকে ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর,১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর,১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রæয়ারি ও ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর আটক করে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। সর্বশেষ তিনি গ্রেপ্তার হন সেনাসমর্থিত তত্ত¡াবধায়ক সরকারের আমলে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সকাল ৭-৩১ মিনিটে যৌথবাহিনী তাঁকে তাঁর বাসভবন ‘সুধাসদন’ থেকে গ্রেপ্তার করে। সেদিনই তাঁকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়, আদালতে তাঁর জামিন চাওয়া হলে তা না মঞ্জুর হয়। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনকে সাব জেলে ঘোষণা করে সেখানে তাঁকে আটক রাখা হয়। প্রায় ১ বছর অন্তরীণ থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ জুন তিনি মুক্তিলাভ করেন। তাঁর পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে বছরের পর বছর জেলে কাটিয়েছেন। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনাও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নিজের জীবনকে বিপন্ন জেনেও সংগ্রাম করে গেছেন অকুতোভয়ে।
একই সময়ে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় একাধিক হামলা। কোনো হামলাই অপরিকল্পিত ছিল না। ছিল সুপরিকল্পিত। সৌভাগ্যক্রমে প্রতিটি ঘটনায় তিনি রক্ষা পেলেও নেতাকর্মীদের অনেকেই হতাহত হয়েছিলেন এসব হামলায়। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি চলাকালে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। এতে যুবলীগ নেতা নূর হোসেন, বাবুল ও ফাত্তাহ নিহত হন। নূর হোসেন সেদিন উন্মুক্ত বুকে ও পিঠে যে সেøাগান ধারণ করেছিলেন সে সেøাগান স্বৈরাচার নিপাত যাক/ গণতন্ত্র মুক্তি পাক এখনও আমাদের শিরা উপশিরায় টগবগ করে ফোটে। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনে শেখ হাসিনা ও তাঁর সফরসঙ্গীদের ওপর চালানো হয় ভয়াবহ হামলা। ঐদিন এরশাদ সরকারের পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে শেখ হাসিনা অক্ষত থাকলেও প্রাণ হারান ৩০ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। লালদিঘি ময়দানে জনসভায় ভাষণদানকালে তাঁকে লক্ষ্য করে ২ বার গুলি চালানো হয়। জনসভা শেষে ফেরার পথে আবারও তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার গঠন করলে তাঁর জীবনের ওপর হুমকির মাত্রা বেড়ে যায়। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন চলাকালে তাঁকে লক্ষ করে গুলিবর্ষণ করা হয়।১৯৯৪ সালে ঈশ্বরদী রেল স্টেশনে তাঁর কামরা লক্ষ করে গুলিবর্ষণ করা হয়। ২০০০ সালে কোটালিপাড়ায় হেলিপ্যাডে ৭৬ কেজি ওজনের এবং জনসভাস্থলে ৮৪ কেজি ওজনের পুঁতে রাখা বোমা পাওয়া যায়। বোমা দুটো যে শেখ হাসিনাকে হত্যা উদ্দেশ্যে পুঁতে রাখা হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শেখ হাসিনা জনসভাস্থলে পৌঁছার আগেই বোমা দুটো শনাক্ত হওয়ায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর জীবনের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে চার দলীয় জোট সরকারের আমলে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভেন্যুয়ে জনসভা শেষ করার পর পরই তাঁকে লক্ষ করে এক ডজনেরও বেশি আর্জেস গ্রেনেড ছোঁড়া হয়। এই হামলায় তিনি অল্পের জন্যে প্রাণে বেঁচে গেলেও আইভি রহমানসহ তাঁর দলের ২২ জন নেতাকর্মী নিহত হন। ৫ শতেরও বেশি মানুষ আহত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনকে সপরিবারে হত্যার পর এটাই ছিল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার একটি জঘন্য প্রয়াস। সেদিন যদি আর্জেস গ্রেনেডগুলো ঠিকমতো ব্যবহার হতো তাহলে আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত না।
১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে তিনি তিনটি সংসদীয় আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে এই সংসদ বেশিদিন টিকেনি। পরবর্তীকালে তিনি ও তাঁর দল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল গণ-আন্দোলন শুরু করেন। ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তিনি যে ভূমিকা রাখেন তা যুগ যুগ ধরে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন প্রেরণা যোগাবে। এই আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৯১ সালের স্বৈরাচারমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের মতো আসন না পেলেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যে অবদান রেখেছেন তা দেশপ্রেমিক ও সচেতন মানুষ কখনো ভুলে যাবেন না। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৮৮টি সংসদীয় আসন লাভ করে এবং প্রধান বিরোধীদল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০.১% ভোট লাভ করে। আর সরকার গঠনকারী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) লাভ করে আওয়ামী লীগের তুলনায় মাত্র ০.৭% বেশি ভােট। এই নির্বাচনে তিনি বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তিনি তত্ত¡াবধায়ক সরকারের রূপরেখা তুলে ধরেন এবং তা বাস্তবায়নের দাবিতে বামপন্থী দলগুলোকে সংগঠিত করেন। এই দাবিতে নানা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালিত হয়। দূর্বার গণ-আন্দোলনের মুখে তখনকার খালেদা জিয়া সরকার তত্ত¡াবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশে স্বৈরশাসক তাড়াতে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে, তত্ত¡াবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে সর্বোপরি সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে শেখ হাসিনার লড়াকু ভূমিকার কোনো তুলনা হয় না। বার বার গুলির মুখ থেকে পরম করুণাময়ের অশেষ রহমতে ফিরে এসেছেন মৃত্যুর মুখ থেকে। শেখ হাসিনার লড়াকু নেতৃত্বে দেশে আজ যা কিছু উন্নয়ন হয়েছে আওয়ামী লীগ বিহীন সরকারগুলোর আমলে তার সিকিভাগও হয়নি। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পূর্ব অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে ড. আতিউর রহমান তাই যথার্থই লিখেছেন, সামাজিকভীরুতা, আস্থাহীনতা, দৈন্য, ধর্মান্ধতা, অমানবিকতা ও নীতিহীনতা স্বাধীন বাংলাদেশের টুটি চেপে ধরেছে। পরনির্ভরতা, পরাভবতা, পরদাসত্বের বন্ধনে বাঁধা পড়েছে বাংলাদেশ। এমনি এক দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধুর মতো সহজাত সাহস, সৌম্য ও অপরাজেয় সংকল্প শক্তির প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হলেন তাঁরই সুযোগ্যা কন্যা। —————স্বকীয় প্রতিভাগুণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের মহানায়কের আদর্শকে প্রবলভাবে পুরো জাতির মনে আবার জাগিয়ে তুললেন। হঠাৎ করেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ যেন আবার সম্বিত ফিরে পেল। সেই যে তার যাত্রা শুরু আর পেছনে তাকাননি। (দেশরতœ শেখ হাসিনা/ সম্পাদনাঃ বেবী মওদুদ / অনিন্দ্য প্রকাশ / এপ্রিল ২০২১/ পৃষ্ঠা -১৯)।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক