অন্যের বিশ্বাসের প্রতি আঘাত করে লিখতেন মুশতাক

18

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যখন উন্নতির পথে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য অনেকে অনেক রকম ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। আল-জাজিরা যে নিউজ প্রচার করেছে, বাংলাদেশের মানুষ তা বিশ্বাস করেনি। দেশের মানুষ আল-জাজিরা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সবগুলোই খতিয়ে দেখব। কারা কীভাবে কেন এই মিথ্যা সংবাদ প্রচার করেছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এর সাথে দেশের অভ্যন্তরে কেউ জড়িত কিনা তাও তদন্ত করে দেখা হবে।
নগরীর ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায় নবনির্মিত জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। নামফলক উন্মোচন ও মোনাজাতের মাধ্যমে ভবনের উদ্বোধন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল ভবনের নিচতলায় প্রবেশমুখের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। পাঁচ মিনিট সময়ের এ ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের কয়েকটি প্রশ্নেরও জবাব দেন। পুলিশ সুপার কার্যালয়ের নামফলক উন্মোচন ও মোনাজাতের সময় অন্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী, জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরী, সংসদ সদস্য যথাক্রমে ফজলে করিম চৌধুরী, নজরুল ইসলাম চৌধুরী, মোস্তাফিজুর রহমান ও আবু রেজা মো. নেজামুদ্দিন নদভী, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন, পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক, সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীরসহ জেলা পুুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল বলেন, বাংলাদেশের পুলিশ এখন আইন-শৃংখলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে অনেক বেশি সক্ষম। তারা দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সাথে যে কোনও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবসময় প্রস্তুত রয়েছে। দেশে একটা শান্তির ফয়সালা আমরা করে যাচ্ছি। নবনির্মিত পুলিশ সুপার কার্যালয় উদ্বোধনের মাধ্যমে জেলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নতুন মাত্রা যোগ হল। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশ যেভাবে এগিয়ে চলেছে, তার সমান্তরালভাবে যদি আমরা আইন শৃঙ্খলা রক্ষা না করতে পারি তাহলে সেই উন্নতিটাও থমকে যাবে। দেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমন কিংবা জলদস্যু ও চরমপন্থী স্যারেন্ডার বলুন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনী সাহসী ও উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে বলেই আমরা আজ সেই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হয়ে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে অন্তরীণ থাকাবস্থায় লেখক মুশতাক আহমেদের আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রথম কথা হল, যে লেখকের কথা বললেন, মুশতাক আহমেদ। তিনি আগেও দুই-একবার তার লেখনিতে আইনশৃঙ্খলা কিংবা অন্যের বিশ্বাসের প্রতি আঘাত করেছিলেন। সেজন্য অনেকেই মামলা করেছিলেন। সম্প্রতি ২০২০ সালে যে মামলাটি হয়েছিল, সেই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কাশিমপুর জেলখানায় অন্তরীণ ছিলেন। হঠাৎ করেই আমাদের আইজি প্রিজন থেকে আমি যে সংবাদটা পেয়েছি, তিনি অসুস্থবোধ করলে আমাদের কারাগারে যে হাসপাতাল সেখানে তাকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। তারপরে অবস্থা আরেকটু খারাপ দিকে গেলে গাজীপুর তাজউদ্দিন মেমোরিয়াল হাসপাতালে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এ ঘটনার তদন্ত হবে কিনা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সব মৃত্যুর বিষয়েই তো এনকোয়ারি হয়। সেটা অস্বাভাবিক মৃত্যু বলুন আর স্বাভাবিক মৃত্যু বলুন। মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন আসে। কারাগারের মৃত্যু হোক বা এক্সিডেন্টে মৃত্যু হোক, সেক্ষেত্রে লাশের পোস্টমর্টেম হয়। পোস্টমর্টেম রিপোর্টের পরই আমরা সঠিকভাবে বলতে পারব, কী কারণে মৃত্যুটা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আমরা এনকোয়ারি কমিটি করব। মৃত্যু তো কালকে হল, নিশ্চয় এটার ব্যবস্থা আমরা করতে পারব।
উল্লেখ্য, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এক মামলায় বিচারের মুখে থাকা মুশতাক আহমেদ কারান্তরীণ অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার মারা যান। কী কারণে ৫৩ বছর বয়সী মুশতাক আহমেদের মৃত্যু হয়েছে, সে সম্পর্কে কারও কাছ থেকে স্পষ্ট কোনও বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। দেশে কুমির চাষের অন্যতম উদ্যোক্তা মুশতাকের হাত দিয়েই প্রথম বিদেশে কুমির রপ্তানি শুরু হয়। এ বিষয়ে একটি বইও লিখেছেন তিনি। কুমির চাষের পাশাপাশি মুশতাক অনলাইনে লেখালেখিতে বেশ সক্রিয় ছিলেন। ওই লেখালেখির কয়েকটি আপত্তিজনক অভিযোগ তুলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার আসামি হন তিনি। করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গত বছরের ৬ মে র‌্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে। তার সঙ্গে কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকেও গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ‘সরকারবিরোধী প্রচার ও গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তাদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করা হয়। ওই মামলায় রাষ্ট্রচিন্তার সংগঠন দিদারুল ভূইয়া এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নানকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে পরে এ দুজন জামিনে মুক্তি পান। মুশতাক ও কিশোরের পক্ষে বেশ কয়েকবার জামিনের আবেদন হলেও তা আদালতে নামঞ্জুর হয়। আসামির তালিকায় আরও ছিলেন নেত্র নিউজের সম্পাদক সুইডেন প্রবাসী তাসনিম খলিল, জার্মানিতে থাকা ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক শাহেদ আলম, হাঙ্গেরি প্রবাসী জুলকারনাইন সায়ের খান (আল-জাজিরার প্রতিবেদনের সেই স্যামি), আশিক ইমরান, স্বপন ওয়াহিদ ও ফিলিপ শুমাখারও ছিলেন। তবে তদন্তের পর পুলিশ শুধু মুশতাক, কিশোর ও দিদারকে আসামি করে এই মাসের শুরুতে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। বাকি আট আসামিকে চার্জশিটে অব্যাহতি দেয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। র‌্যাবের করা ওই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ফেসবুক ব্যবহার করে জাতির জনক, মুক্তিযুদ্ধ, করোনাভাইরাস মহামারী সম্পর্কে গুজব, রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অভিপ্রায়ে অপপ্রচার বা বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং অস্থিরতা-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারার অভিযোগ আনা হয়েছিল। মামলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোয়াটস অ্যাপ ও ফেসবুক-মেসেঞ্জারে কিশোর ও মুশতাকের সঙ্গে তাসনিম খলিল, জুলকারনাইন সায়ের খান, শাহেদ আলম, আসিফ মহিউদ্দিনের ‘ষড়যন্ত্রমূলক চ্যাটিংয়ের প্রমাণ’ পাওয়ার দাবিও করেছিল র‌্যাব।