অনিশ্চয়তায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

7

প্রায় দুই সপ্তাহ জুড়ে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিপি)’র সাথে সংঘাত চলছে। তীব্র সংঘাতের জের বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়িতে এসে পড়েছে। গোলাগুলির শব্দে এলাকার মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদানও বন্ধ রাখা হয়েছে। যানবাহন ও সাধারণ মানুষের জলাচল সীমিত করা হয়েছে বলে জানা যায়। দুপক্ষের তীব্র সংঘাতের সময় কোন কোন গুলি বাংলাদেশ সীমান্ত জনপদে এসে পড়ছে। গতকাল দুজনের মৃত্যুর খবরসহ চলন্ত অটোরিকশা ও ঘরবাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। বিষয়টি চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন ও বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ(বিজিবি)সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। গতকাল দৈনিক পূর্বদেশসহ স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বিদ্রোহীদের প্রচন্ড আক্রমণে টিকতে না পেরে দেশটির সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) শতাধিক সদস্য পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। জানা যায়, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের ক্ষমতা দখলের তৃতীয় বার্ষিকী সামনে রেখে আরাকান আর্মির (এএ) বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী।
অভিযানকালে দুপক্ষের সংঘর্ষের ফলে বাংলাদেশের ঘুমধুম সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে থাকা বিজিপির প্রায় সব কয়টি ক্যাম্প বিদ্রোহী গোষ্ঠী দখল করে নিয়েছে। এ সীমান্তের কাছাকাছি বিজিপি ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলছে তুমুল লড়াই।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তের ওপার থেকে গোলাবারুদ এসে পড়ায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদও জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের কোনো প্রভাব বাংলাদেশে যেন না পড়ে সেজন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিজিবি সদস্যরা সীমান্ত এলাকাজুড়ে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। অবশ্য মিয়ানমারের জান্তা সরকার বা বিদ্রোহী, কারও পক্ষে অবস্থান নেয়নি বাংলাদেশ। এ ইস্যুতে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ ভূমিকায় আছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মিয়ানমার বর্তমানে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে থাকা বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের অন্তত ৬০ শতাংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে বলে খবরে জানা গেছে। শুধু রাখাইন কেন, মিয়ানমারের একটি বড় অংশ এরই মধ্যে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এএ’র হামলার তীব্রতায় টিকতে না পেরে দেশটির সেনারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। তবে রাখাইন হাতছাড়া করার কোনো সুযোগ দেশটির সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত জান্তা সরকার দেবেনা , তার ইঙ্গিত মেলে সেখানে সেনাবাহিনীর হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পৌঁছে দিতে সাগরপথের ব্যবহার। এতে স্বভাবতই দুপক্ষের সংঘর্ষ আরও দীর্ঘ হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের নিজভূমে কূটনৈতিক তৎপরতায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও অনির্দিষ্টিকালের জন্য বাধাগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকসহ কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরা বাধাগ্রস্ত করার জন্য দেশটির জান্তা সরকার সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে। তাদের মূল এজেন্ডা হচ্ছে রাখাইনকে দ্রুত রোহিঙ্গাশূন্য করা। এ লক্ষে ২০১৭ কিংবা তারও আগের ধারাবাহিকতায় রাখাইনের রোহিঙ্গা বসতিতে হামলা চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। তারা আগের সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের উপর বর্বর আক্রমণ চালাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমরা মনে করি, রাখাইনের পরিস্থিতি যাই হোক, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজভূমে ফিরিয়ে দিতে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। এছাড়া রোহিঙ্গাদেরও নিজেদেরই উদ্যোগী হতে হবে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিজেদের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে অনুকূলে আনা যায় কিনা, তাও তাদেরই ভেবে দেখতে হবে। সম্প্রতি রোহিঙ্গারা তাদের ক্যাম্পে সমাবেশ করে নিজ দেশে ফেরার জন্য আকুলতা ব্যক্ত করেছেন। আমরা মনে করি, বাংলাদেশ সরকার জান্তা সরকার কিংবা আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনা করে সমঝোতার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলে তা অনেকটা ফলপ্রসু হতে পারে। বলার অবকাশ নেই যে, জনবহুল বাংলাদেশ শুধু মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। সাধ্যের বাইরে হলেও তাদের জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় রসদের জোগান দিচ্ছে। কিন্তু তা অনন্তকাল অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক নানা কারণে বিদেশি দাতাসংস্থাগুলোও সাহায্যের পরিমাণ ক্রমেই সংকোচিত করছে। এ অবস্থায় প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টির আগেই আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উচিত নিজভূমে ফিরতে সচেষ্ট হওয়া। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণপূর্বক সরকারও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে আরো কৌশলী হবে, কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার করবে-এমনটি প্রত্যশা সকলের।