অনিশ্চয়তার দোলাচলে ব্যবসায়ীরা

25

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অর্থনীতিতে আবার অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য যখন করোনার প্রথম ধাক্কা সামলে উঠতে শুরু করেছে, তখনই আবার সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সরকার নতুন করে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করছে।
এবারের বিধিনিষেধে কলকারখানা, অফিস-আদালত ও ব্যাংক খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হলেও মার্কেট ও শপিংমল বন্ধ রাখার কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে নগরীসহ পুরো চট্টগ্রামে ৪০ হাজার কোটি টাকার ঈদ বাজার নিয়ে চরম শঙ্কায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এবারও ঈদ বাজার মাটি হলে আশা-নিরাশার দোলাচলে থাকা ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার কোনও পথ নেই সামনে। ইতিমধ্যে দোকানপাট খোলা রাখার দাবিতে চট্টগ্রামসহ রাজধানী ও ঢাকার বাইরে ব্যবসায়ীরা মাঠে নেমে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ দেখিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনায় প্রথম টেউয়ের ‘লকডাউনে’ অর্থনৈতিকভাবে মার্কেট ও শপিংমলের ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় দ্বিতীয় ঢেউয়ে শিল্প-কারখানা, ব্যাংক, শেয়ারবাজার এবং বইমেলা সবকিছু খোলা রয়েছে। নতুন করে গণপরিবহনও চালু হয়েছে। কিন্তু দোকান, মার্কেট ও শপিংমল বন্ধ রাখা হয়েছে। গত বছর আমাদের বিশাল ক্ষতি হয়েছে। এবার তা কাটিয়ে উঠার ঠিক সময়ে আবারও লকডাউন। এবার দুই ঈদ ও বৈশাখকে সামনে রেখে ব্যবসা বন্ধ থাকলে পথে বসার উপক্রম হবে শত শত ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের।
এদিকে গত বছরের শুরুতে দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করলে সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে, যা কয়েক দফায় বাড়ানোর পর ৩০ মে শেষ হয়। এই সময়ে জরুরি সেবা ছাড়া সরকারি সব অফিস বন্ধ ছিল। সীমিত আকারে চালু ছিল পোশাক কারখানার পাশাপাশি ব্যাংকের সেবা। এর ফলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে অর্থনীতি। এর মধ্যে করোনার সংক্রমণ আবার বেড়ে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার (৫ এপ্রিল) থেকে সাত দিনের লকডাউনের কথা জানিয়েছে সরকার।
ব্যবসায়ীরা জানান, করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য মার্কেট, শপিংমল বন্ধ রাখা হচ্ছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খোলা রাখার দাবিতে সারদেশে বিক্ষোভ মিছিল করছে। এতে উল্টো করোনা বেশি ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে মার্কেট ও শপিংমল খুলে দেওয়া উচিত।
তারা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য সরকার প্রশাসনিকভাবে সব ধরনের কঠোরতা আরোপ করতে পারে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধির জন্য মার্কেটের ভিতরেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা যেতে পারে। তবুও মার্কেট, শপিংমল বন্ধ করে মানুষের আয়-রোজগার বন্ধ করা যাবে না।
চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, চট্টগ্রামে ঈদ বাজারে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। করোনার কারণে ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এবারও একই অবস্থা বিরাজ করলে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ হিসেবে করার নয়। আগামী একসপ্তাহের দেশের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে কি হবে না হবে। তবে যাই হোক, জীবন-জীবিকা পাশাপাশি রেখে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে।
তামাকুমন্ডি লেন : নগরীর ঐতিহ্যবাহী তামাকুমন্ডি লেন বণিক সমিতির অধীনে রয়েছে ১১০টি মার্কেট। এখানে ১৪ হাজার দোকানের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার ব্যবসায়ী ও কর্মচারি রয়েছে। এর মধ্যে ২০০ থেকে ২৫০ ব্যবসায়ী নিত্যপণ্য ও ঈদ সমাগ্রী আমদানি করে। তারা উৎসবকে ঘিরে এবার ২ হাজার কোটি টাকা পুঁজি খাটান।
ব্যবসায়ীরা জানান, লকডাউনের কারণে প্রতিদিন দোকান প্রতি আনুমানিক ২৫০০ টাকা হিসেবে মোট ৫ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। তবে এই সময়ে ক্ষতির পরিমাণ হিসেব করা যাবে না। এছাড়া দোকান বন্ধ থাকলেও ভাড়া, কর্মচারির বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও দারোয়ান-সিকিউরিটির বেতন ঠিকই দিতে হচ্ছে।
তামাকুমন্ডি লেন বণিক সমিতির সভাপতি বলেন, ঈদ ও পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ, ক্ষুদ্রঋণ, জমিবন্ধক অথবা ধারদেনা করে বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু মার্কেট বন্ধ থাকায় চরম বিপদে পড়েছেন। গতবারেও লকডাউনের কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য সরকার প্রশাসনিকভাবে সব ধরনের কঠোরতা আরোপ করে আমাদের ব্যবসা করার সুযোগ করে দেন। অন্যথায় ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা গতবারে কেউ প্রণোদনা পায়নি। সরকারের কোনও ধরনের সুযোগ সুবিধাও পায়নি। এমনকি কর্মচারিদের তালিকা করে কোনও ধরনের সহযোগিতায় আওতায় আনা হয়নি।
বণিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক মোজাম্মেল হক বলেন, এটি নগরীর বৃহৎ পাইকারি বাজার। এখানে ২০০ থেকে ২৫০ ব্যবসায়ী নিত্যপণ্য ও ঈদ সমাগ্রী আমদানি করে থাকে। এখানকার মাল সারাদেশে যায়। উৎসবকে ঘিরে ব্যবসায়ীরা ধারদেনা করে মালামাল তুলেছেন দোকানে। এ সময়ে লকডাউনের মত পরিস্থিতির কারণে চরম ক্ষতির মুখে ব্যবসায়ীরা। এর আগে গত লকডাউনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ব্যবসায়ীরা।
বিনিময় টাওয়ারের সাধারণ সম্পাদক আবদুল আউয়াল বলেন, গতবছর একদিনের জন্যও দোকান খুলতে পারিনি। এবারও ধারদেনা করে ব্যবসায়ীরা মালামাল তুলেছেন। সেই মুহূর্তে লকডাউনে চরম ক্ষতির মুখে পড়বে ব্যবসায়ীরা।
আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী নেতা মো. সেলিম বলেন, গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারও ক্ষতির মধ্যে পড়েছি আমরা। সরকার আমাদেরকে ব্যবসা করার পরিবেশ সৃষ্টি করে না দিলে আমরা দেউলিয়া হয়ে যাবো। তাই সরকারের কাছে অনরোধ স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খোলার ব্যবস্থা করা হোক।
টেরিবাজার : নগরীর সবচেয়ে বড় পাইকারি কাপড়ের বিক্রয়কেন্দ্র টেরিবাজার। এখানকার ব্যবসায়ীরা ঈদ উপলক্ষ্যে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার পোশাক এনে চরম বিপাকে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ঈদের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ব্যবসায়ীদের কপালের ভাঁজ ততই বাড়ছে। এইভাবে চলতে থাকলে পুঁজি হারিয়ে দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। তাই তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট সীমিত আকারে খোলা রাখার কথা বলছেন।
পরশমণির কর্ণধার ও সমিতির উপদেষ্টা মো. ইসমাঈল বলেন, ফেব্রæয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে ব্যবসায়ীরা মালামাল সংগ্রহ শুরু করেন। মার্চের ১৫ তারিখের মধ্যে উৎসবমুখী সবধরনের বাজার স্টক করেন। এরপর ব্যবসায়ীরা এসব মালামাল বিক্রি করে বাকি পরিশোধ করে থাকেন। ঠিক সেই সময়ে লকডাউনে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবো আমরা। গতবছর কষ্ট করে কর্মচারিদের ৩ মাসের বেতন দিতে পারলেও বোনাস দিতে পারিনি। এবার জানি না কোন অবস্থায় পড়ি।
টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান বলেন, প্রতিবছর টেরিবাজারে ঈদের দুই মাস আগে থেকেই কেনাবেচা শুরু হয়। সেজন্য ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ও সমিতি থেকে লোন নিয়ে কয়েক মাস আগে থেকে দেশ ও বিদেশ থেকে মালামাল কালেকশন করে গোডাউনে স্টক করেছেন। শুধু ঈদ কেন্দ্রিক টেরিবাজারে লেনদেন হয় হাজার কোটি টাকা। বলতে গেলে সারাবছর যে পরিমাণ বেচাকেনা হয় ঈদ মৌসুমে তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি বেচাকেনা হয়। কিন্তু লকডাউনের কারণে সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে গেছে। এর আগে দীর্ঘ ৪৫ দিন ধরে এসব দোকানপাট বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তিনি বলেন, এবারও যদি রমজানে দোকান বন্ধ থাকে তাহলে আরও এক হাজার কোটি টাকা ক্ষতি যোগ হবে। ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে রবিবার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
নিউ মার্কেট : আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত নিউ মার্কেটের আবেদন যেন সবার কাছেই অন্য রকম। এখানে ৫০০ দোকানে প্রায় ৫ হাজার কর্মচারি রয়েছে। এখানকার ব্যবসায়ীরা ঈদ উপলক্ষ্যে প্রায় ২শ কোটি টাকার উপরে বিনিয়োগ করেছেন।
নিউ মার্কেট মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. ছাগীর বলেন, গতবছর ব্যবসা করতে পারিনি। তবুও ভ্যাট-টেক্স দিয়েছি। শ্রমিকদের ৩ মাসের বেতন দিয়েছি। অনেকেই পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছে। এবারও ধারদেনা করে রমজান উপলক্ষ্যে মালামাল তুলেছে। এই অবস্থায় লকডাউনের কারণে আমরা দেউলিয়া হয়ে যাবো। তাই স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করে যেন একটি নিদিষ্ট সময়ে জন্য মার্কেট খোলা রাখার অনুমতি দিতে হবে।
একইভাবে উৎসবকে ঘিরে বিনিয়োগ করে চরম বিপাকে পড়েছেন নগরীর ৫৬টি অভিজাত মার্কেট। এর মধ্যে রয়েছে স্যানমার ওশান সিটি, আমীন সেন্টার, মিমি সুপার, সেন্ট্রাল প্লাজা, ইউনেস্কো সেন্টার, বিপণিবিতান, ফিনলে স্কয়ার, মিমি সুপার মার্কেট, চকবাজারে মতি টাওয়ার, গুলজার টাওয়ার, চকসুপার, চকভিউ, আগ্রাবাদে আখতারুজ্জামান সেন্টার, লাকি প্লাজা, সিঙ্গাপুর মার্কেট ও পতেঙ্গার বে-শপিং মার্কেটে ইত্যাদি। এসব মার্কেটের ব্যবসায়ীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খোলার জন্য দাবি জানিয়েছেন।