অনিশ্চিত গন্তব্যে ২৩০০ পরিবার

44

দীর্ঘদিনের পুরনো বসতভিটা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে গেলেন নগরীর পতেঙ্গা থানার লালদিয়ার চরের ২৩০০ পরিবার। অনিশ্চিত গন্তব্যের এ যাত্রা বেদনার ও কান্নার। দীর্ঘদিনের আবাস ছেড়ে পরিবার নিয়ে চলে যাওয়ার সময় অশ্রুসজল ছিল লালদিয়াবাসী হিসেবে পরিচিত মানুষগুলো।
এদিকে উচ্ছেদ উপলক্ষে সকাল থেকে শান্তিপ‚র্ণভাবে নিজ উদ্যোগে বাসিন্দারা চলে যেতে থাকায় সেখানে কাঁটাতারের বেড়া দিচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
পতেঙ্গার ১৩ নম্বর খালের উত্তর ও ১৪ নম্বর খালের দক্ষিণ পাশে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। দু’খালের মাঝখানের ইনকনট্রেড ডিপো ছাড়া লালদিয়া চরের ৫২ একর জায়গা উচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া। এতে কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাসায় উঠলেও বেশিরভাগ মানুষ এখনো গৃহহীন। কোথায় যাবে আচমকা ঠিকানাবিহীন হওয়া এসব মানুষ? কে দেবে আশ্রয়? কে দেবে খাবার?
গতকাল সোমবার (১ মার্চ) সকাল থেকে মূল সড়কের পাশের এলাকায় বাঁশের বেড়া তৈরির কাজ শুরু করেন বন্দরের কয়েক’শ শ্রমিক। দেখা গেছে, নিজ উদ্যোগে বসতভিটা ছেড়ে চলে যাওয়াদের অনেকে ভাঙাবাড়ি, আসবাব বিক্রি করে দেন নামমাত্র মূল্যে। কেউ কেউ রিকশা, ভ্যান ও ট্রাকের অভাবে মালপত্র নিয়ে অসহায় বসে ছিলেন।
এর আগে, গত ২৭ ফেব্রূয়ারি লালদিয়ার চরে চূড়ান্ত উচ্ছেদের বিষয়টি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও লালদিয়ার চর পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটি সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক গতকাল সকাল চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনা করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। লালদিয়ার চরের পৃথক দুটি ব্লকে বসবাস করা ২৩০০ পরিবার প্রশাসনের অভিযান চালানোর আগেই সকাল থেকে নিজ উদ্যোগে জিনিসপত্র ও মালামাল নিয়ে চলে যাচ্ছেন।
এনিয়ে গতকাল সকাল ৯টায় বোটক্লাব এলাকায় জায়গা উচ্ছেদকালীন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, চট্টগ্রামের লালদিয়া চরের জায়গাটির মালিক বন্দর কর্তৃপক্ষ। এখন জায়গাটা আমাদের প্রয়োজন। পিসিটির (পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল) ব্যাকআপের জন্য। এর আগে ২৬ একর উচ্ছেদ করেছি। ৫২ একর জায়গা আজ পুনরুদ্ধার করতে পারবো। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৯০ ভাগ চলে গেছেন। তারা গরিব হলেও আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
দেখা গেছে, অনেকে ভাঙাবাড়ি, আসবাব বিক্রি করে দেন নামমাত্র মূল্যে। কেউ কেউ বাসস্থান নিশ্চিত করতে না পেরে ভ্যানে ও নৌকায় মালামাল তুলে রাখেন। বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটসহ বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা লালদিয়ার চর এলাকা সকালে পরিদর্শন করেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্য।
বসতবাড়ি উচ্ছেদ হলেও লালদিয়ায় থাকছে একটি মসজিদ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসা, যা ১৯৭২ সালে তৎকালীন সরকার নির্মাণ করে। মানুষ না থাকলে মসজিদে কে আসবে- উল্লেখ করে লালদিয়া চর মসজিদ কমিটির সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, আমাদের এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। যারা কিছুটা সলভেন্ট (সচ্ছল) তারা বিভিন্ন জায়গায় বাসা-বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এখনো গৃহহীন। কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের ঘরে উঠছেন। আত্মীয়-স্বজন মেহমানদের কতদিন রাখবেন?
হাছিনা আক্তার (৩৫) নামে এক প্রতিবন্ধী বলেন, আমার এক পা নেই। ভিক্ষা করে চলি। সন্তানদের মানুষ করার চেষ্টা করছি। আমার স্বামী দিনমজুর। আমি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। আমার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা মুরাদনগর নবীনগর। আমরা তিন বোন, দুই ভাই। এক ভাই মারা গেছে। এখন কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। কোথায় যাব? আমার থাকার জায়গা নেই। আমি মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই।
সরকারি জায়গায় বসতি গড়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জায়গাটা আমি কারও কাছ থেকে কিনিনি। নিজে খুঁটি পুঁতে, মাটি ভরাট করে বাবুই পাখির মত একটি একটি জিনিস জোগাড় করে বাসাটি বানিয়েছি। আমি জানতাম সরকারি জায়গা। তিন-চার যুগ ধরে এ এলাকায় এত মানুষ থাকছেন দেখে আশ্রয় গড়েছিলাম। ১২ বছর দুঃখ-কষ্টে ছিলাম। এখন পথের মানুষ পথের দিকে তাকাতে হবে। সরকারের কাছে আকুল আবেদন আমাকে একটা ঘর দিন, সন্তানদের বুকে নিয়ে যাতে ঘুমাতে পারি।
লালদিয়াচর পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির আহব্বায়ক আলমগীর হাসান বলেন, ২৩’শ পরিবারের ১৪ হাজার মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে বিমানবাহিনীর ঘাঁটি জহুরুল হক তৈরির সময় সরকার আমাদের নিষ্কণ্টক জমি নিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। তখন বঙ্গবন্ধু সরকার আমাদের ১৯৭২ সালে এ জায়গা দিয়েছে।
ডিসি অফিসে আমরা ২ বছর খাজনা দিয়েছি। কিন্তু আমাদের দুঃখ হলো- আমাদের এখন উচ্ছেদ করার পাশাপাশি দখলদার বলা হচ্ছে। অথচ ২০০৫ সালে ইনকনট্রেড ডিপো তৈরির জন্য আমি পরিবারসহ উচ্ছেদ হয়েছি। আমাদের পারিবারিক কবর এখন ইনকনট্রেড ডিপোর টয়লেট। এরপরও যে মন্ত্রীর বাড়ি দিনাজপুর, উনি আমাদের দখলদার বলছেন।
লালাদিয়া চর এলাকাবাসীর শান্তিপূর্ণ প্রস্থানের কথা উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, আমরা বলেছি, প্রয়োজনে লেবার ও ইক্যুইপমেন্ট সহায়তা দেব। শান্তিপূর্ণ প্রস্থানের ব্যবস্থা করছি। এটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। আমাদের লক্ষ্য অর্জন হয়ে গেছে। বুলডোজার বা স্ক্যাভেটর দিয়ে ভাঙার প্রয়োজন নেই। তারা গরিব হলেও আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তারা ঢিল পর্যন্ত ছুঁড়েনি। এখন আমাদের কয়েক’শ কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। তারা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে লালদিয়া চর এলাকা ঘেরা দিচ্ছে।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, আমরা উদ্বুদ্ধ করেছি, যাতে বাসিন্দারা স্বেচ্ছায় চলে যায়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৯০ ভাগ চলেও গেছে। বল প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। আমাদের এলাকায় বেড়া দিয়ে দেব, যাতে কেউ দখল করতে না পারে। আনসাররা এলাকাটি পাহারা দেবে।
তাদের পূনর্বাসন করা প্রসঙ্গে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ হলে সরকার তৃণমূলদের জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে থাকে। তাদের সহায়তা করার জন্য আমরা তালিকা পাঠিয়েছি।