অনাদৃত ঈদের প্রতিহার্ষে করোনা জয়ের ব্রত

11

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

‘সঙ্কোচের বিহবলতা নিজেরে অপমান,/ সঙ্কটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মাণ।/ মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।/ দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো,/ নিজেরে দীন নিঃসহায় যেন কভু না জানো।/ মুক্ত করো ভয়, নিজের পরে করিতে ভর না রেখো সংশয়।/ ধর্ম যবে শঙ্খ রবে করিবে আহবান/ নীরব হয়ে, নম্র হয়ে, পণ করিয়ো প্রাণ।/ মুক্ত করো ভয়, দুরূহ কাজে নিজেরই দিয়ো কঠিন পরিচয় \’ কী অসাধারণ প্রতীতিহৃদ্য মানবিক জয়গানে বিশ্বকবি রবীঠাকুর রচিত কবিতার উল্লেখ্য পংক্তিগুলো! প্রাণসংহারে ক্ষুভিত অতিমারি করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গের নির্মম ক্রান্তিকালে মহান স্রষ্টা নির্দেশিত আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের অপূর্ব ইবাদতের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে পবিত্র রমজান শেষে নিরন্তর আনন্দের চিত্তোৎকর্ষ উপহার সর্বজনীন ঈদ উৎসব সমাগত।
এই ঈদকে ঘিরে সামগ্রিক অর্থে সকল পণ্য-সামগ্রী, পোশাক-পরিচ্ছদ, আধুনিক ও ঐতিহ্যিক সাজসজ্জা, বিনোদন, নবতর মনোহারি আঙ্গিকে সাজানোর অন্তঃকরণ প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি চলে সারা বছরব্যাপী। সজীব প্রতিক্ষায় প্রহর গুনে সকল ব্যবসায়ী, ধনী-গরিব ক্রেতা-বিক্রেতা, বেতার-টিভি-চলচিত্রসহ বিভিন্ন জমকালো অনুষ্ঠান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও সম্প্রচার কেন্দ্র। নামায, ইফতার, সেহেরী, পবিত্র কোরআন পাঠ, যাকাত প্রদান, নতুন কাপড় কেনা ও পরিধান করা, উপহার বিতরণ ও বিনিময় ইত্যাদি সম্পন্ন করে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টিতে নিজেকে বিলীন করার মাধ্যমে প্রায় সপ্তাহব্যাপী উদ্যাপনে ঈদুল ফিতরের মহৎ উদ্দেশ্য জাগরিত থাকে। সম্প্রীতি-সৌহার্দ-বন্ধুত্বের চিত্ত-বৈজয়িক উপযোজনে সার্থক হয়ে ওঠে ঈদের এ আনন্দ উৎসব। বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রধান উপাদান নানা মাত্রিকতায় সমাজ বিবর্তনের সাম্প্রতিক কালে এই উৎসব শুধু ধার্মিকতায় নয়, ধর্ম-দল-মত নির্বিশেষে এক অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির বাহন হিসেবে বিকশিত। মূলত: মাহে রমজানের শাশ্বত শিক্ষা ও অনুশীলন ন্যায়পরায়নতা, নৈতিকতা, ত্যাগ-সংযম ইত্যাদি বিশ্বজনীনতা ও মানবিকতার নান্দনিক বৈভাষিক রূপকল্প। চলমান করোনা কালের কঠিন বাস্তবতার নিরিখে জনগণের আনন্দ বিসর্জনের এই সঙ্কোচন অধ্যায় সভ্যতার ইতিহাসে ত্যাগের বরণীয় প্রবৃত্তির দৃষ্টান্ত হবে।
দেশবাসী সম্যক অবগত আছেন, প্রাণঘাতী করোনার প্রথম তরঙ্গ এবং সাম্প্রতিককালে দ্বিতীয় তরঙ্গের মহাপ্রলয়ের সংক্রমণ বিস্তার ও প্রাণ সংহারের পরিসংখ্যান পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ প্রায় পুরো বিশ্বে কঠিন সঙ্কট তৈরি করেছে। বৈশ্বিক মহামন্দার প্রভাবে উন্নত-অনুন্নত প্রায় প্রতিটি দেশে মানুষের জীবন-জীবীকা চরম হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। সঙ্কোচিত অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তায় প্রদেয় প্রণোদনার সমীকরণ অনেক ক্ষেত্রেই ভারসাম্যহীন। মুক্তির মহানায়ক জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনার ‘জীবন সর্বাগ্রে’ প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে কঠোর লকডাউনসহ নানামুখি পদক্ষেপ গ্রহণের ফলশ্রুতিতে সনাক্ত ও মৃত্যুহার অতিসম্প্রতি বহুলাংশে সহনীয় দৃশ্যপটে প্রণীত হয়েছে। গণমানুষের দুর্দশা লাঘবে প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণ-সাহসিক নেতৃত্ব উচুমাত্রিকতায় আস্থা ও বিশ্বাসের আশাজাগানিয়া অবস্থান মানুষের মধ্যে করোনা প্রতিরোধে সাহস ও মনোবল সঞ্চার করেছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়ে দারিদ্র্যের অসহায়ত্বকে কৃতাহ্নিক পর্যায়ে উপনীত করার লক্ষ্যে প্রণোদনা-বিশেষ প্রণোদনার বিভিন্ন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন প্রয়োগ ও সংগ্রহের সঙ্কল্প সর্বত্রই সমাদৃত।
আমাদের জানা যে, বিগত ১৪ মাসে করোনার কারণে কর্মহীনতার বিশাল হাহাকারে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার নিদারুন বিপর্যস্ত। আইএলও’র মতানুসারে; এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে ২০২০ সালে ৮.১০ কোটি মানুষ চাকরিচ্যুত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ফোর্বস তথ্য মতে একই সময়ে সম্পদের পরিমাণ বেড়ে বর্তমানে বিশ্বে বিলিয়নিয়ার হয়েছে ২৭৫৫ জন। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৩.১০ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ৮ লাখ কোটি মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক দারিদ্র্যের সাথে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে খাদ্য সঙ্কট এবং পণ্য মূল্যের উর্ধ্বগতি। করোনা সঙ্কট শুরুর পূর্ব থেকে বিশ্বায়ন-প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারে কর্মহারা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি চলমান করোনাকালীন লকডাউন এবং অন্যান্য কারণে অধিকতর দীর্ঘায়িত হয়েছে। দ্রুত নিখুঁতভাবে ঘরে বসেই জরুরী কর্মসম্পাদনে প্রযুক্তির সাফল্য কর্মসসীম নতুন বিরূপ অধ্যায় নির্মাণ করেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম দাবী করছে ২০২৫ সালের মধ্যে যন্ত্রের কাছে পরাভূত হবে ৬০ শতাংশ কর্মক্ষম মানুষ।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক গবেষণা সূত্রমতে, ২০৩০ সাল নাগাদ প্রযুক্তির কারণে ৮০ কোটি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে। ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বিশ্বকে পরিপূর্ণ প্রযুক্তি নির্ভর করে তুলবে এবং এতে শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা প্রচন্ড হ্রাস পাবে। দেশীয় প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদদের মতে শুধু লকডাউনের কারণে মোট কর্মগোষ্ঠীর ৫৯ শতাংশ কর্মহীন হয়েছে যাদের ৪০ শতাংশের কাজ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। উল্লেখ্য যে, কর্মহীনতার এই পরিস্থিতি নারী শ্রমিকদের পর্যুদস্ত করেছে অনেক বেশি। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম জরিপ মতে, করোনার কারণে দেশের ৮০ শতাংশ পরিবার খাবারের পরিমান কমিয়ে দিয়েছে ও ৬০.৫ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়েছে যাদের অধিকাংশই শ্রমিক। দরিদ্রতার হার ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, করোনা মহামহারির এক বছরে ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ১০ হাজার ৫১ জন। বিগত বছর শেষে কোটিপতি ব্যাংক হিসাবের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৮৯০ টি। দেশের ৬৬ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে বলে গবেষণায় প্রকাশ।
উপরোক্ত পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় বলা যায়, করোনা বিস্তার ও প্রাণ সংহারের বিপরীতে আগামী ঈদ আয়োজন কোনভাবেই নাগরিকবৃন্দের কাছে সুখকর কোন বিষয় নয়। ভয়ংকর এই অনুজীবযুদ্ধে জয়ী হওয়ার ব্রত গ্রহণ করে ঈদের আয়োজনকে সীমিত পরিসরে উপভোগ করার মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছে ধর্মপ্রাণ বাঙালি জনগোষ্ঠী। অনাকাক্সিক্ষতভাবে উদ্ভূত সকল নেতিবাচক সঙ্কট উত্তরণে বাঙালির বীরত্ব ও মনোবল সর্বদা শক্তিমানতায় ঋদ্ধ। এই পবিত্র ঈদের আনুষঙ্গিক সকল আনুষ্ঠানিকতাকে সীমিত পরিসরে উপভোগ করার মাধ্যমে করোনা প্রতিরোধে সকল বিধি-নিষেধ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা নির্দেশনা পরিপূর্ণ প্রতিপালনে বদ্ধপরিকর। অতীতের মত সকল দুর্যোগ-দুর্ভোগ এবং দুরাশয় সমস্যার সমধানে দৃঢ়চেতা বাঙালি করোনা জয়ের ব্রত নিয়ে ঈদ উৎসবকেও যথাযোগ্য মর্যাদায় হৃদয়ে ধারণ করবে – নিঃসন্দেহে তা বলা যায়। অতি সম্প্রতি কতিপয় ধর্মের মুখোশধারী হিং¯্র ও বর্বর সভ্যতা বিধ্বংসী অনাদর্শিক চরিত্রের মানুষরূপী দানবগুলো আগুন সন্ত্রাস-উগ্রপন্থায় দেশের সম্পদ লুন্ঠন-ধ্বংস এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের চিরায়ত বিশ্বাসের মূলে চরম কুঠারাঘাত করেছে।
দেশ প্রেমিক সরকার ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তেজোদীপ্ত প্রচেতা দুশ্চরিত্র-পাপাচার-কদাচার-মিথ্যাচার-প্রতারণায় লিপ্ত জঘন্য ব্যক্তিদের প্রকৃত স্বরূপ উম্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে। পবিত্র ইসলামের সর্বজনীন মনুষ্যত্ব-মানবতার সৌকর্যকে কলুষিত করার সকল চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র দেশবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দিয়েছে। প্রাসঙ্গিকতায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘হিন্দু-মুসলমান’ নিবন্ধের বার্তা নিবিড় স্মরণযোগ্য। ‘একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে। গুরুদেব বললেন : দেখ, যে ন্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ন্যাজকে কাটাবে কে ?’ নজরুল আরো বলেছেন ‘ন্যাজ যাদেরই গজায়- তা ভিতরেই হোক আর বাইরেই হোক- তারাই হয়ে ওঠে পশু। যে সব ন্যাজওয়ালা পশুর হিং¯্রতা সরল হয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে- শৃঙ্গরূপে, তাদের তত ভয়ের কারণ নেই, যত ভয় হয় সেই সব পশুদের দেখে- যাদের হিং¯্রতা ভিতরে, যাদের শিং মাথা ফুটে বেরোয় নি।’ ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িক-অন্ধাকারের পূজারীদের কাছে নজরুলের উল্লেখিত বাণীকে নিছক পাঠ্যক্রম মনে হতে পারে কিন্তু এর গভীর অনুধাবন সুদূরপ্রসারী এবং অন্তঃর্নিহিত ধর্মনিরপেক্ষ ন্যায়-নৈতিকতার চর্চাকে কতদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে তা কল্পনাতীত। অন্যের কষ্টে ব্যথিত না হওয়া, অন্যের হৃদয়ের রক্তক্ষরণে নিজের হৃদয়ে বেদনার জন্ম না নেওয়া ইত্যকার অমানবিক, অশুভ ও অসংগতিপূর্ণ সামাজিক আচরণের প্রচলিত অনুশীলনকে কতটুকু বিপর্যস্ত করতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
করোনা প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনা, বিধিনিষেধ যথাযথ প্রতিপালনের মাধ্যমে ঈদ জামাত আয়োজন ও প্রাসঙ্গিক আচার-অনুষ্ঠান সম্পাদন করোনা সংক্রমণ রোধে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারে। যথাযোগ্য মর্যাদায় খোলা ঈদগাহ ময়দানে নয়, বরং মসজিদে গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা মেনে নামায আদায়ের পরামর্শ দেওয়া হলেও অতি সম্প্রতি মুসলিম উম্মাহর প্রধান পুরুষ সৌদি আরবের গ্রান্ড মুফতি সম্ভবত অসমর্থিত প্রাপ্ত সূত্রে করোনা মহামারির কারণে ঈদের জামাত ঘরে আদায় করার জন্য আহবান জানান। সামাজিক বিধিসমূহ নিয়মিত বাস্তবায়নে সমাজ-পরিবেশকে বাসযোগ্য করা এবং নানাবিধ সামাজিক সুসম্পর্ক স্থাপন করে ন্যায্যতা-সাম্যের চেতনা সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠাই পবিত্র ইসলাম ধর্মের মাহাত্মকে প্রকাশ করে।
মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, ঘৃণা, সহানুভূতি ইত্যাদির ব্যক্তিগত ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট মনোভাব সামাজিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সাধারণত মনোভাব তিন ধরনের হতে পারে – প্রথমত: স্নেহ, প্রীতি, কৃতজ্ঞতা, ভদ্রতা মানব সম্পর্ককে সুসংহত, দ্বিতীয়ত: আতঙ্ক, হিংসা, পরাশ্রীকাতরতা, ঘৃণা, ঔদ্ধতা, সন্দেহ, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করার পথে কঠিন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তৃতীয়ত: প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা, আধিপত্যবাদ, অবৈধ-অনৈতিক প্রভাব বিস্তার, নানাবিধ অর্থ সম্পদ ও ক্ষমতার লোভ লালসা সামাজিক বন্ধনকে করে দৃঢ়ভাবে কুলষিত, অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত এবং অগ্রহণযোগ্য। উল্লেখ্য ঘৃণ্য মনোবৃত্তি প্রশমনে পবিত্র ইসলামে ত্যাগের শিক্ষা ও সঙ্গত সংযম এই অতিমারি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার বিশেষ বিকল্প পন্থাও হতে পারে। এই ধরনের উদ্যোগ আনন্দ বিবর্জিত হলেও মানবিক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা রাখার সম্ভাবনাকে অবশ্যই অত্যুজ্জল করবে। প্রসঙ্গত সামাজিক আচার-আচরণকে সমাজযোগ্য করার পন্থাগুলো যেমন শিক্ষা ও ধর্মীয় ব্যবস্থা, যৌক্তিক প্রেষণা, ইতিবাচক মনোভাব ইত্যাদির সহজ প্রবৃত্তির পরিচর্যা সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। পারষ্পারিক মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং আস্থা বৃদ্ধির পথ প্রশস্তকরণ দারুনভাবে যৌক্তিক রোয়েদাদ নিয়ামক হিসেবে সমরূপ বিবেচিত।
ঈদ উৎসব বা পূজা পার্বনে ধর্ম-বর্ণ, জাত-পাত, ধনী-গরীব নির্বিশেষে মানুষকে মানুষের মর্যাদায় আসীন করার মধ্যেই প্রকৃত ধর্মের বাণী উচ্চারিত। বাঙালির ঈদ উৎসব বা সকলকে নিয়ে আনন্দের ভাগাভাগিতে মেতে ওঠা, নাচ, গান, নাটক, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, আনন্দ ভ্রমন ইত্যাদির সমন্বয়ে এটিকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় কাঠামোতে না রেখে কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের সমাহারে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উপস্থাপিত হলেই এর মর্যাদা এবং তাৎপর্য অনেক বেশি মহিমান্বিত হবে – সেটিই স্বাভাবিক। এভাবেই মানব সমাজের বিবর্তন ও পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ক্রমাগত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুশাসন এবং অনুকরণ সামাজিক সম্পর্কের গঠন ও অভিজ্ঞতাকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে আরোপিত করে করোনা ক্রান্তিকালে সম্প্রীতির বৈশ্বিক রূপায়নে অনুভবনীয় কৃতাত্মায় চন্দ্রানন হবে- এটুকু প্রত্যাশা করা মোটেও অযৌক্তিক ও অমূলক হবে না। নিবন্ধের ধারাবাহিকতায় জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ‘ঈদ মোবারক’ কবিতার পংক্তি উচ্চারণে ইতি টানছি ‘ঈদ্-অল্-ফিতর আনিয়াছে, তাই নববিধান/ ওগো সঞ্চয়ী, উদ্বৃত্ত যা করিবে দান, ক্ষুধার অন্ন হোক তোমার!/ ভোগের পেয়ালা উপ্চায়ে পড়ে তব হাতে,/ তৃষাতুরের হিস্সা আছে ও পিয়ালাতে, দিয়া ভোগ কর, বীর, দেদার।
লেখক: শিক্ষাবিদ, সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী
সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।