অনলাইন জন্মনিবন্ধন ডিজিটাল বিড়ম্বনা দূর করতে হবে

25

 

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পদক্ষেপ হিসেবে ২০১০ সাল থেকে অনলাইন জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়। সারাদেশে সরাসরি জন্মনিবন্ধনের পাশাপাশি অনলাইনেও নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে। অথচ সেখানেই বেড়েছে জটিলতা। ডিজিটাল জন্ম ও মৃত্যুসনদ নিতে পদে পদে ‘ডিজিটাল বিড়ম্বনায়’ পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা। অনলাইন জন্মনিবন্ধন হয়ে উঠেছে অসহায়, খেটে খাওয়া কিংবা শিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত সব শ্রেণীর মানুষের ভোগান্তির এক নতুন নাম। ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা কিংবা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ জনগণ।
গতকাল দৈনিক পূর্বদেশে জন্মনিবন্ধনে ‘জন্মের যন্ত্রণা’ শীর্ষক তিনটি প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। একটিমাত্র অনলাইন জন্মনিবন্ধনকে কেন্দ্র করে পুরো একটি পরিবারকে দীর্ঘ ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আবার একজন কোমলমতি শিক্ষার্থীকে দৌড়াতে হচ্ছে ওয়ার্ড অফিস থেকে ডিসি অফিস পর্যন্ত। শিক্ষার্থীর ইউনিক আইডি ফরম পূরণে নানা জটিলতার একটির নাম জন্মনিবন্ধন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পিতা-মাতার নামের ভুল থাকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকার ফলে অনেক শিক্ষার্থী ভোগান্তিতে পড়েছেন। এ ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি ও সংশোধন করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়েছে অভিভাবকরা। অন্যদিকে টিকাগ্রহণেও জন্মনিবন্ধন সনদ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী বিপাকে পড়েছেন। জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করতে কিংবা সংশোধন করতে গিয়েও মাসের পর মাস ঘুরে কোন সমাধান পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় জন্মনিবন্ধন সনদ করতে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকা পড়েন অভিভাবকরা। দিনের পর দিন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড অফিস ঘুরেও জন্ম নিবন্ধন হাতে পাচ্ছেন না তারা। এ জাতীয় সমস্যা, ভুল ও দীর্ঘসূত্রতার কারণ সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্তাদের খেয়ালিপনা, দায়িত্বের প্রতি অসচেতনতা ও অস্বচ্ছতা। এ অবস্থার দ্রুত অবসান হওয়া জরুরি।
আমরা জানি, জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে একটি শিশু প্রথম নাগরিকত্ব লাভ করে। জন্মসনদ অত্যাবশ্যকীয় করার লক্ষ্যে সরকার নতুন করে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন ২০০৪ প্রণয়ন করে। জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, শিশু অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে আইনটি ৩ জুলাই ২০০৬ থেকে কার্যকর করা হয়েছে। জন্মনিবন্ধন আইনে বলা হয়েছে, বয়স, জাতি-গোষ্ঠী, ধর্ম-কিংবা জাতীয়তা সব নির্বিশেষে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেকটি মানুষের জন্য জন্মনিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষে জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষ নিবন্ধনকারীকে একটি সার্টিফিকেট দেবেন। এ বছরের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে স্কুলে ভর্তি, এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন, পাসপোর্টের জন্য আবেদনসহ আরও কিছু ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু উপজেলার জনসাধারণ বলছেন, অনলাইনে আবেদন করার প্রক্রিয়ায় সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ২০০১ সালের পর যাদের জন্ম, তাদের জন্মনিবন্ধনের জন্য বাবা-মায়ের জন্মসনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করায় সন্তানের জন্মসনদ নিতে গিয়েও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে অভিভাবকদের। একই সঙ্গে কারও মৃত্যুসনদ নিতে হলে প্রয়োজন হচ্ছে ডিজিটাল জন্মসনদের। সব মিলিয়ে চরম জটিলতায় পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা।
ঊলার অপেক্ষা রাখেনা যে, তথ্য প্রযুক্তি এমন এক সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য শিক্ষা যন্ত্র, যা শিক্ষা ব্যবস্থায় কার্যকারিতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। স্কুল ব্যবস্থায় শিক্ষা দানের জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় কাজকর্ম দ্রæত ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য এবং শিক্ষার্থীদের আধুনিক টেকনোলজিতে দক্ষ করার লক্ষে সারা বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, যতই সুবিধা ও সহজ হোক না কেন প্রযুক্তি ব্যবহারে কিছু ক্ষেত্রে বিড়ম্বনাও বেড়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারই হচ্ছে না, কেবল অজ্ঞতার কারণে। দেশের অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের পর্যাপ্ততা ও সহজলভ্যতা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশ এদিক দিয়ে এখনো নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে। এ নাজুক পরিস্থিতির শিকার হয়ে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর অভিভাবক তাঁদের নিজেদের এবং তাঁদের সন্তানদের অনলাইনে জন্মনিবন্ধন করা নিয়ে।
বলা হয়েছে, অনলাইন জন্মনিবন্ধনে মানুষের দুর্ভোগ কমবে, বাস্তব চিত্র পুরোপুরি উল্টো। সরকার বিভিন্নভাবে দেশকে ডিজিটালাইজড করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের মানস এখনো কার্যত ডিজিটাল হতে পারে নি। জন্মনিবন্ধন ব্যাপারটি সহজ করার সুযোগ থাকলেও তা না করে জটিল করা হয়েছে। এত বেশি কাগজপত্র চাওয়া হয় যে, তা যোগাড় করতে গিয়ে পিতা-মাতার অনেক ভোগান্তি সহ্য করতে হচ্ছে। দুর্ভোগ থেকে বাঁচার জন্য সহজ পন্থা বের করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন অভিভাবকরা। আমরা মনে করি, বিষয়টি সহজ করা জরুরি, কাগজের বহর না চেয়ে আরো সংক্ষেপে কোন প্রমাণিক ডকুমেন্ট নিয়ে জন্মনিবন্ধনের কাজটি সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, মানুষের ভোগান্তি কমাতে সংশ্লিষ্টরা দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।