অনন্য অবিস্মরণীয় অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

180

পাকিস্তানে ৯ মাস কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিবুর রহমান সোজা লন্ডন চলে যান। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তিনি দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করে ঢাকা আগমন করেন। সকাল থেকে অসংখ্য মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। এয়ারপোর্ট থেকে রেসকোর্স (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে তিল ধারনের ঠাই নেই। রাজপথ লোকে লোকারণ্য। ঢাকার নারী-পুরুষ তথা আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই রাস্তায় রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। ঢাকার বাইরে থেকেও অনেক লোক এসেছে। শেখ মুজিব আসছেন। তাকে এক নজর দেখবেন তারা। সবার দৃষ্টি আকাশের দিকে। কখন নেতাকে বহনকারী প্লেনটি দেখা যাবে। বহু কষ্টে জনতার কয়েকটি স্তর পেরিয়ে ঢাকা ক্লাবের সামনের রাস্তার দক্ষিণ পাশের সামনের সারিতে একটু জায়গা করে নিলাম। যারা রাস্তায় জায়গা পেলেন না তারা আগে থেকেই রেসকোর্স ময়দানে সমবেত। সে বিশাল মাঠও লোকে লোকারণ্য। শেখ মুজিব সেখানে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। দুপুর গড়িয়ে গেছে। অনেক প্রতীক্ষার পর ব্রিটিশ প্লেনটি ঢাকার আকাশে দেখা গেল। জনতা গর্জে উঠল ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে।
এয়ারপোর্টে প্লেন থেকে নামার পর জনাকীর্ণ র্দীঘ রাজপথ পেরিয়ে ঢাকা ক্লাবের সামনের রাস্তায় খোলা ট্রাকে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে দিয়ে নেতাকর্মীসহ শেখ মুজিবুর রহমান যখন রেসকোর্সের দিকে যাচ্ছেন, তখন নিজের অজান্তেই সবার সাথে গর্জে উঠলঅম। ‘জয় বাংলা’। আসলে স্লোগান দেয়া আমার ধাতে নেই। জীবনে কোনো দিন রাজনীতি করিনি। যা হোক, শেখ মুজিবুর রহমানকে কাছে থেকে দেখলাম, এর আগেও বহুবার চট্টগ্রাম হোটেল শাহজাহানে শেখ মুজিবের দেখা ও কথা হয়েছিল। তাঁর অটোগ্রাফ নিয়েছিলাম। দুঃখের বিষয় সেটি হারিয়ে গেছে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে তাকে কাছে থেকে দেখেছি। আজ মনে হলো জীবনবাজি রাখা এবং জবরদস্তিমূলক কারাভোগের পর শেখ মুজিবুর রহমান ক্লান্ত হলেও দমে যাননি। ডান হাতে কালো ফ্রেমের চশমাটি ধরে জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ মুজিবের উত্থান পাকিস্তানের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ঘটন- দেশটির রাজনৈতিক মাঠে বিচরণকারী প্রবল প্রতাপশালী নবাব, জমিদার, শিল্পপতি আর সেনাবাহিনীর প্রবল বাঘা বাঘা জেনারেলদের সাথে পাল্লা দিয়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ একটি জেলা ফরিদপুরের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন পাকিস্তানের দারিদ্র্যক্লিষ্ট একটি প্রদেশের জনগণকে সাংগঠনিক প্রতিভার দীপ্তিতে আলোকিত করে। অচিন্তনীয় জাদুবলে স্বতন্ত্র স্বাধীন একটি দেশের দ্বারপ্রান্তে এনে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। এটা মোটেও সহজ কথা নয়, আজ তিনি তার রাজনৈতিক সংগ্রামে বিজয়ের শীর্ষে আরোহন করলেন। ক’জনার ভাগ্যে এমনটি ঘটে। একজন রাজনীতিকের জীবনে এটা এক পরম পাওয়া।
জগতে চলছে নিয়ম ভাঙগা-গড়ার খেলা। ভারতবর্ষ এক দেশ ছিল। কত সংঘাতের ভেতর দিয়ে ভেঙে গেল। পাকিস্তানও সে পরিণতি বরণ করেছে। এই তো সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল, মোট কথা পৃথিবীর মানচিত্র নিয়ত পরিবর্তনশীল। সবাইকে তা মানতেই হবে। ১০ জানুয়ারি ভাষণ শুনছি, শেখ মুজিবুর বাংলাদেশের স্থপতি ও বঙ্গবন্ধু আবেগাপ্লুত। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুমালে চোখ মুছতে মুছতে অনেক কথার মধ্যে বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, সাত কোটি সন্তানের, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে- মানুষ করনি।’ রবীন্দ্রনাথ সত্য বলেননি। দেখে যাও, আমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে’। তিনি আরো বললেন- ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ। আমি মুসলমান। একবার মরি, দুইবার মরিনা, আমাকে যদি তোমরা মেরে ফেল, আমার লাশটা আমার বাঙালির হাতে ফিরিয়ে দিও’। পশ্চিম দিকে শূন্যে ডান হাতের তর্জনী আন্দোলিত করে বললেন, ‘ভুট্টো সাহেব, সুখে থাকো’। এরপর বিশাল জনতাকে শুধালেন। মুসলমানরা বুঝি রেপ করে ? এ বক্তৃতার কিছুদিন পর কলকাতার ‘দেশ’ সাপ্তাহিকীর একটি প্রচ্ছদ কার্টুন চিত্রে দেখা গেল, দন্ডায়মান রবীন্দ্রনাথ অবনত মস্তকে মুজিবকে বলছেন- ‘ভুল বলেছিলুম, শুধরে দিলে’ বলা যায়। শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি মুসলমান সহ সব ধর্মের নবজন্মের নায়ক।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শেখ মুজিবের বড় কৃতিত্ব হচ্ছে, ১৩ মার্চ ১৯৭২ সালের মধ্যে ভারতীয় স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের তাদের নিজ দেশ ভারতে ফেরত পাঠানো। এ দুঃসাধ্য সাধন করা একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব ছিল। তিনি তার এ দায়িত্ব পালন করতে দ্বিধা করেননি কিংবা চাহিয়া সময় নেননি। সে সময় আমাদের মনে এই প্রতীত জন্মেছিল যে, সমসাময়িক বিশ্বে মাত্র দু’জন নেতা নিজ দেশে নিরংকুশ জনসমর্থন লাভ করছেন। একজন চীনের মাও সে তুং, আরেকজন বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান। তারা বিশ্বের যে কোনো দুর্বৃত্তের কাছে আতংক। কেন না, নিজ দেশের জনগণ তাদের দু’জনেরই হাতের মুঠোয়। শেখ মুজিব এটা বুঝতে ভুল করেননি। এ শক্তি তিনি যথাশিগ্গির সম্ভব কাজে লাগিয়েছিলেন বলেই ১৯৭২ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীর শেষ ফলটির বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম পূর্ণতাপ্রাপ্তি ঘটে।
কিন্তু বেদনাদায়ক এই যে, সেদিন শেখ মুজিবকে যেমন দেখেছি এবং জনসমাগম যা হয়েছিল দেখেছি। তাতে এত বড় মাপের একজন নেতার অবদানকে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। বস্তুত তিনি বিশ্বের সব দেশের মুসলমানের সাথে একাত্ম হয়ে পথ চলবেন বলেই ১৮৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে লাহোর গিয়েছিলেন। কিন্তু আজ মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ হয়েও মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের প্রভাব মনে হয় ততটা দেখা যায় না।
তিনি নন্দিত হয়েছিলেন একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় একক জাতীয় বীর হিসেবে। তিনি আজ যেন খন্ডিত এবং তার ভাবমর্যাদা শুধু একটি দলের কান্ডারী পর্যায়ে। একদিন যার ডাকে দেশবাসী এক হয়েছিল, তিনিতো আমাদের সকলের শেখ মুজিব।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট