অনন্তের অভিসার

2

রুমানা নাওয়ার

আফসান অফিস থেকে ফিরে দেখে জরি মুখ ভার করে শুয়ে আছে।ঘরে আলো না জ্বেলে এ অসময়ে শুয়ে থাকা তেমন কিছুই বুঝতে পারলো না আফসান।
জরিকে কোন প্রশ্ন না করে হঠাৎ দখিনের জানালাটায় দাঁড়ালো। জরি আধ শোয়া হয়ে আছে জানালার কিনার ঘেষে দোল চেয়ারটায়।পর্দা সরিয়ে জরির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো–
জরি চোখ মেলে দেখো এক আকাশ জোছনা কিনে এনেছি গো তোমার জন্য।
পর্দা সরাতেই সব জোছনা যেন হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লো তাদের ঘরে। জরির আধ শোয়া শরীরটায় জোছনার মাখামাখি। আফসানকে টেনে পাশে বসিয়ে খিলখিল করে হাসতে লাগলো জরি। যে হাসির ঝংকারে আফসানের মতো জোছনাও মাতোয়ারা। এত সুন্দর হাসি জরির। আফসান তাকিয়ে দেখে আর দেখে অপার বিষ্ময়ে। কিছুক্ষণ আগেও জরির মুখ ভার ছিলো,থমথমে। এখন কোথাও উধাও হয়ে গেলো সে মন খারাবি মুখ ভার ভাবটা। জরিটা এমনই। শিশুসুলভ সারল্য। কোন কিছু চাওয়ার নেই তার। সাংসারিক কূটচালে মগ্ন থাকা অন্য সব মেয়েদের মতো না জরি। জরির সারল্যপনা সবকিছু তে আফসানকে মুগ্ধ করে। প্রকৃতি র কাছে গেলে মেয়েটা পাগল হয়ে যায় যেন। সোনা রুপা টাকা পয়সা দামি কোন গিফটেও এতটা আকুল হয়না জরি।যতটা প্রকৃতি র কাছে গেলে হয়। এমন শিশু মনের জরিকে তাই আফসান চমকে দিলো । চাঁদের আলোয় আলোকিত তাদের দক্ষিণের এ ঘরটা। কি অপূর্ব জোছনা ঘরের অর্ধেকটা জুড়ে। আফসান বলে বসলো–
জরি চটজলদি তৈরি হয়ে নাও। আজ সারা শহর ঘুরবো তোমায় নিয়ে।
কি? সত্যি বলছো? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না গো।
হুম সত্যি সত্যি তিন সত্যি।
জরি আফসানের এ রূপ আগে দেখেনি কখনো। বিবাহিত জীবনের সাড়ে তিন বছরে আফসান কে প্রয়োজনে র বাইরে কোন কিছু ই করতে দেখেনি জরি।ঘর অফিস বাজার সদাই আর টুকটাক সামাজিক তা। এসব নিয়েই আফসান।জরির যে একটা আলাদা জগৎ আছে সেটা আফসান জানলোই না কোনদিন। আফসানের সাথে চলতে চলতে অনেকটা কমে এসেছে শখ আহলাদ। বিয়ের প্রথম প্রথম খুব ইচ্ছে করতো বরকে নিয়ে এখানে ওখানে টো টো করে ঘুরতে। একটা শিশু মন জরির। দুটো শালিক প্রায়ই প্রতিদিন জরির ব্যালকনির লাগোয়া ছাদটায় এসে বসে। কখনো চুপচাপ বসে থাকে আর কখনো না দুটো তে তুমুল ঝগড়াঝাটি। জরি দাঁড়িয়ে ওদের দেখে। মনটা নেচে উঠে আনন্দে। আহা পাখি জীবন হতো যদি আমার। তাহলে এখান থেকে ওখানে কত জায়গায় না যেতে পারতাম। দুখানা ডানা মেলে আকাশ থেকে আকাশে উড়তাম আর উড়তাম। সাদা সাদা মেঘগুলো ছুঁয়ে দিতাম ডানা মেলে। আবার কখনো বা মেঘ। সুরমা রঙের মেঘ। যেখান থেকে টুপটুপ বৃষ্টি পড়ে। আহা বৃষ্টি আমার ভালোবাসার জলফোটা।এক একটা বৃষ্টির ফোঁটা ঠোঁট ভিজিয়ে মুখে পুড়তাম পাখি জীবনে। কতো রাত যে আমার বৃষ্টি র কান্না দেখে দেখে কেটেছে একা একা।পাশে কেউ নেই। আফসানকেও না। কতো বার যে ইচ্ছে হতো ডাকতে। কাছে এসে ফিরে যেতাম বৃষ্টির কাছে, জোছনার কাছে জোড়া শালিকের কাছে। একা একাই আমার যতো সুন্দরের উদযাপন যত আলোড়ন। এভাবেই মেনে নিয়েছিলাম সব।আফসান কি বুঝেছিলো আমার একার এ দহন যন্ত্রণা। কি জানি? হবে হয়তো। একসাথে দুটো মানুষ দিনের পর দিন একই ছাদের নিচে থাকলে জানে হয়তো। আজ না হয় আফসানের এরূপ কেন? এক আকাশ জোছনা নিয়ে আফসান জরির পাশে দাঁড়িয়ে।
রিকশায় করে সারা শহর ঘুরলো দুজন। এত সুন্দর শহরের রূপ আগে কখনো দেখেনি জরি। রাত যতো বাড়তে লাগলো জোছনার আকুল করা রূপ বাড়তে লাগলো হু হু করে। মানুষ জনের আনাগোনা ও কমতে শুরু করলো পথে পথে। আফসান রিকশাওয়ালা কে বলে রাখলো সেভাবে। নির্জন শহরের রাস্তায় তারা দুজন মানব মানবী।মাথার উপরে চাঁদ। আহা কত সুন্দর জীবন। এই এক জীবনে এমন পাওয়া হয় ক’জনের। আফসানকে নিবিড় করে আঁকড়ে ধরলো জরি। আফসান বুঝতে পারলো ব্যাপারটা। গুন গুন গাইতে লাগলো — চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলো ও রজনী গন্ধা তোমার গন্ধ সুধা ঢালো।জরি মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগলো।আফসানের গলা ভারী সুন্দর। কিন্তু গায় খুব কম। আজ গলা ছেড়ে গাইতে লাগলো প্রিয় এ গানটা।
কখন যে কর্ণফুলির কিনারে চলে আসলো বুঝতেই পারলো না জরি।ব্রিজের উপর উঠতেই রিকশা ছেড়ে দিলো আফসান। তারপর হাত ধরে দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো। জরির মনে হলো- এ হাঁ তাদের অনন্তের। অনন্তকাল ধরে যেন তারা হাঁটছে তো হাঁটছে। দুপাশে নদীতে ছোট বড়ো নৌকা, জাহাজ সারি সারি। জোনাক পোকার মতো লাইটের আলো। কি অদ্ভুত সুন্দর। রাতের আঁধার ছুয়ে অদ্ভুত থোকা থোকা আলো। উপরে নীল আসমানে রুপালি চাঁদ। হঠাৎ আফসান বলে বসলো–
চলো জরি নৌকায় চড়ি। দারুণ লাগছে চারিদিক।
জরির মন আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। আরও জোরে আফসানের হাতটা চেপে ধরলো। নৌকার মাঝি কম বয়সী। নৌকার আরোহী দেখে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে গেলো তার।বৈঠা চালানো র সাথে সাথে গান সাধলো — যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম মহেশখালীর পান র খিলি বানাই খাওয়াইতাম। আফসান জরি চুপচাপ বসে আছে হাতে হাত রেখে। দখিন বাতাসে জরির চুল এলেমেলো। সেদিকে খেয়াল নেই তার। সারা মুখে চুলের দাপাদাপি। এত সুন্দর এত স্বর্গীয় মুহূর্ত মানুষের জীবনে। বেঁচে থাকাটা আসলেই সুন্দর। মায়ার এ জীবন ছেড়ে যেতে কে চায়। এমন জীবনের আস্বাদে জরির মাতাল মাতাল অবস্থা। উপরে জোছনা নিচে নৌকায় চড়ে জড়ি।মাঝি আস্তে ধীরে বৈঠা ফেলে ফেলে চালাতে লাগলো নৌকা। যেন রূপকথার কোন গল্প ছুঁয়ে স্বর্গের দিকে আফসান জরির এ অনন্ত যাত্রা। ফুরোবার নয় কখনো। নদীর ঢেউ ভেঙে ভেঙে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয় প্রেমিক যুগলের। কর্ণফুলির বুকে তাদের অনন্তের অভিসার। ঢেউয়ের দোলায় দুলতে দুলতে হয়তো পৌঁছে যাবে কোনো স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে।