অতিমারি করোনায় দিশেহারা মানুষ

63

ফারুক আবদুল্লাহ

ঈদুল আজহার আগে গত ১৮ জুলাই শহর থেকে পরিবার নিয়ে গ্রামে বাড়ি রাউজানে যান হাজী আবদুর রহমান। কোরবানি শেষে গত ২৩ জুলাই পরিবার নিয়ে শহরে চলে আসেন। এরপর করোনায় আক্রান্ত হন একে একে পরিবারের সকল সদস্য। এই পরিবারের সাতজন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হন। এর মধ্যে আবদুর রহমানের স্ত্রী রিজিয়া বেগম (৫৫) দুই ডোজ টিকা নিয়েও করোনা থেকে রেহাই পাননি। ছেলের বউ শিবলী (৩০), আরেক ছেলের বউ লামিয়া (২১) এবং কন্যা শামীমা (৩০) করোনা আক্রান্ত হন। একইভাবে রহমানের নাতি-নাতনি ওয়ারিসা, ইফতিফা ও উজায়েরও করোনার কবল থেকে রেহাই পায়নি। তাদের একজন আত্মীয় চিকিৎসক। ওই চিকিৎসকের পরামর্শে তারা কেউ হাসপাতালে যাননি। মুঠোফোনে চিকিৎসকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ ব্যবহারের নির্দেশনা পাওয়ায় সবাই বাসায় থেকে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন।
একইভাবে চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সদস্য মাহমুদুর রহমান শাওনের পুরো পরিবার করোনায় আক্রান্ত। গত ২৯ জুলাই প্রথমে আক্রান্ত হন তার স্ত্রী ডা. মাহমুদা সুলতানা আফরোজা। তিনি মা ও শিশু হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৩০ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হন তার মা জাহানারা বেগম (৫৮)। এর আগে শাওনের দেড় বছরের বাচ্চার প্রচন্ড জ্বর হয়ে বেশকিছু দিন পর সেরে উঠে। এরপর নিজেদের বাচ্চাকে নিরাপদে রাখতে নানার বাসায় রেখে আসেন। করোনা আক্রান্ত মাকে বর্তমানে ঘণ্টায় ৪০ লিটার আক্সিজেন দিতে হচ্ছে। করোনা সংক্রমণের তান্ডবে নিজের পরিবারকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন শাওন। কোন দিকে সামলাবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। তার বাবাও বেঁচে নেই। শাওন বাবার একমাত্র ছেলে।
এদিকে দেশে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট আসার পর থেকে নগর ও গ্রামে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘরে ঘরে করোনা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন মানুষ। তবে অনেকেই অসচেতনতার কারণে চিকিৎসা সেবা থেকে বিরত থাকছেন। ততদিনে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে পরিবারের সবাই করোনার কবলে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। কিন্তু করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের সবার বাসায় বসে (গ্রামে) চিকিৎসা সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই। যাদের ব্যক্তিগত পরিচিত চিকিৎসক নেই তাদের একটি বড় অংশ টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কল সেন্টার স্বাস্থ্য বাতায়ন (১৬২৬৩), সরকারি কল সেন্টার (৩৩৩) এবং আইইডিসিআরে (১০৬৫৫) যোগাযোগ করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকে কোথায় ফোন করে চিকিৎসা সেবা নিতে হবে বিষয়টি জানেন না। যাদের বড় অংশ গ্রামে বসবাস করে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৯৫ শতাংশের বেশি কল আসছে আক্রান্ত ব্যক্তি বা করোনার উপসর্গ আছে এমন ব্যক্তির কাছ থেকে। এসব কলে মূলত চিকিৎসার পরামর্শ চাওয়া হচ্ছে। তারপরও অনেক মানুষ এই সুযোগ নিতে পারছেন না। তারা জানেন না কোথায় ফোন করে চিকিৎসা সেবা নিতে হবে।
চিকিৎসারা বলছেন, করোনার উপসর্গ দেখা দিলে সাথে সাথে টেস্ট করে নেওয়া জরুরি। তা না হলে একজনের মাধ্যমে পুরো পরিবার করোনায় আক্রান্ত হতে পারে। কারণ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট একটি পরিবারের শতকরা ৮০ ভাগ সদস্যকে আক্রান্ত করতে পারে।
করোনা প্রতিরোধে স্বাচিপ কর্তৃক গঠিত কমিটির আহব্বায়ক ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান বলেন, করোনায় আক্রান্ত বেশির ভাগ মানুষের হাসপাতালে আসার প্রয়োজন হচ্ছে না। তারা ঘরে বসেই চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন। এ জন্য সরকার টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ চালু করেছে। এর মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চিকিৎসা পাচ্ছেন। গত দেড় বছর ধরে সেন্ট্রাল ও স্থানীয়ভাবে সরকার এ সেবা চালু রেখেছে।
তিনি বলেন, একটি পরিবারের কারো যদি করোনা উপসর্গ দেখা যায় সাথে সাথে যেন টেস্ট করে। তা না হলে একজনের মাধ্যেমে পুরো পরিবার আক্রান্ত হতে পারে। কারণ দেশে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ভয়াবহতা ইতিমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সল ইকবাল জানান, করোনার শুরু থেকে চট্টগ্রাম বিএমএ’র উদ্যোগে ১৩০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে টেলিমেডিসিন চিকিৎসা চালু রাখা হয়েছে। মাঝখানে করোনার প্রকোপ কমে আসায় বন্ধ রাখা হয়েছিল। এখন করোনা সংক্রমণ আবার বেড়ে যাওয়ায় এই সেবাটা পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, করোনা আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষ ঘরে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। যারা প্রয়োজন মনে করছেন তারা টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে সেবা নিতে পারছেন।