অগ্নিঝরা মার্চ

6

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একাত্তরের ৩ মার্চ একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক দিন। এদিন বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে পল্টন ময়দানে ছাত্ররা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। একাত্তরের ৩ মার্চ আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের পক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন দেশব্যাপী অর্ধ-দিবস হরতাল আহবান করেন এবং তা শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়। এদিন ছিল জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশনের প্রথম দিন। পরবর্তীতে তা পালিত হয় ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে।
বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে ‘সেনাবাহিনী প্রত্যাহার এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের’ দাবি জানান। বিকেলে পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিরাট রাজনৈতিক সমাবেশের আয়োজন করে। অনির্ধারিতভাবে সমাবেশে যোগ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি উপস্থিত ছাত্র-জনতাকে শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের আহবান জানান। তিনি সাতই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তার সমাবেশ পর্যন্ত জনগণকে অপেক্ষা করতে বলেন। তিনি এও উল্লেখ করেন, ওইদিন সমাবেশে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেবেন। ছাত্ররা সমাবেশে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের ম্যানিফেস্টো’ পড়ে শোনায় এবং বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী নির্দেশ শোনার জন্য অধির আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করতে থাকেন। বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেন, তিনি এক্ষুণি চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তিনি মওলানা ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, আতাউর রহমান খানসহ অন্যান্য নেতার সঙ্গে আলোচনা করবেন। তবে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত তেজোদ্বীপ্ত ভঙ্গিতে বলেন, অধিবেশন স্থগিত হওয়ার বিষয়টি তিনি বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে দিতে পারেন না।
তিনি বলেন, সাতই মার্চ তিনি রেসকোর্স ময়দানে বাংলার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি জনতাকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে এবং যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে বলবো।’
এরই মধ্যে শহরের বিভিন্ন অলিগলি পথ থেকে শত শত মিছিল পল্টন ময়দানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে জমায়েত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে এই জমায়েত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগের সমাবেশে বক্তৃতা করেন সাবেক ছাত্রনেতা ও নবনির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, আর ছয় দফা, ১১ দফা নয়, এবার বাংলার মানুষের এক দফার সংগ্রাম শুরু করবো। আর এই এক দফা হচ্ছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব।
এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মো. ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে টেলিফোন করেন এবং ১০ মার্চ ইসলামাবাদে সর্বদলীয় আলোচনা অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। এদিন রাত আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত আবার কারফিউ জারি করা হয়। প্রতিবাদকারীরা আবারও কারফিউ চ্যালেঞ্জ করে। কিন্তু এসময় ঢাকায় বিক্ষোভকারীদের ওপর কোন গুলিবর্ষণ করা হয়নি। তবে, দেশের অন্যান্য এলাকার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সিলেট, রংপুর, চট্টগ্রাম ও খুলনায় রাস্তায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। সেখানে পাকিস্তানি পতাকা ও অন্যান্য প্রতীক পোড়ানো হয়। প্রশাসন সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত আবারও কারফিউ জারি করে। বিক্ষুব্ধ জনতা তা প্রত্যাখ্যান করে। পাকিস্তানি সৈন্যরা জেলা শহরগুলোতে গুলি চালায় এবং অনেককে হতাহত করে। একাত্তরের পহেলা মার্চ থেকেই বাঙালি পুলিশরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে।