মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশ

১৫ দিনে সড়কে প্রাণ গেলো ১২ জনের

13

জাহেদুল আনোয়ার চৌধুরী, সীতাকুণ্ড

মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা সড়ক দুর্ঘটনা যেন থামছেই না! প্রতিদিন সড়কের সিটি গেইট থেকে বড় দারোগারহাট পর্যন্ত কোনে না কোনো স্থানে দুর্ঘটনা ঘটছেই। গত ১৫ দিনে মহাসড়কের এই অংশে ১২ নারী-পুরুষ-শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। আর এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ২৫ জন।
গতকাল রবিবার দুপুর সাড়ে ১২ টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উপজেলাস্থ বাঁশবাড়িয়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় তসলিম উদ্দিন মনছা (৩২) নামে এক পথচারী যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এতে যুবলীগ নেতাসহ আরো ২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। নিহত তসলিম একই এলাকার মিয়াধন বাড়ির বশর ড্রাইভারের ছেলে। তিনি একজন গার্মেন্ট শ্রমিক বলে জানা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের তথ্য মতে, চট্টগ্রামমুখি একটি পিকআপ ভ্যান মহাসড়কের বাঁশবাড়িয়া এলাকা অতিক্রমকালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পথচারী তসলিম উদ্দিন মনছাকে চাপা দেয়। এতে চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। একই সময় নিয়ন্ত্রণহীন গাড়িটি বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন ও সাকিব নামে আরো দুই পথচারীকে গুরুতর আহত করে। তারা এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সীতাকুণ্ডের কুমিরা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. সাইদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা দুর্ঘটনাস্থল থেকে নিহত যুবকের লাশটি উদ্ধার করি এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করি’।
জানা যায়, ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুÐের কয়েকটি স্থান মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মহাসড়কের ওভারব্রিজ ফকিরহাট কালুশাহ নগর, ওভারব্রিজের উত্তর পাশে পোর্টলিংক বন্দর সড়কের রাস্তার মাথা, রয়েল গেইট, গুল আহাম্মদ জুট মিলস্, বাঁশবাড়িয়া এবং সীতাকুণ্ড উত্তর ও দক্ষিণ বাইপাস। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের ফকিরহাট, কালু শাহ নগর ও ফৌজদারহাট বন্দর সড়ক পোর্ট লিংক রাস্তার মাথা এলাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক সাইফুজ্জামান মিন্টুর দুই কন্যাসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছে কমপক্ষে ২৫ জন।
উপজেলার কালুশাহ নগর, ফকিরহাট ও পোর্টলিংক এলাকায় প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ স্থানীয়দের শঙ্কিত করে তুলছে। এ জন্য স্থানীয় বিক্ষুব্ধরা গত বৃহস্পতিবার সকালে এক ঘন্টা ধরে ওই এলাকায় মানববন্ধন করেছে। এতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। মানববন্ধনে বক্তারা দুর্ঘটনা রোধে প্রতিকার চেয়ে বলেন, ‘সিটি গেইট থেকে বড় দারোগারহাট সীতাকুÐ সংসদীয় আসনের মহাসড়ক। আর এই সড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় কেউ হারাচ্ছে পিতা, কেউ হারাচ্ছে স্বজন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন কারখানার কন্টেইনার ডিপো, ট্রাক ডিপো ও লরির ডিপোর গাড়ি এবং বিভিন্ন ধরণের পণ্যবাহী গাড়িগুলোর চালকেরা খুবই বেপোরোয়া। এসব এলাকায় তারা শৃঙ্খলাও মানে না। ফলে এসব দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। আমরা এর প্রতিকার চাই।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, গত ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা স্বপরিবারে ঢাকায় ফেরার পথে কালুশাহ নগর বাইপাস এলাকায় কাগোলরির চাপায় তাঁর দুই মেয়ে মারা যায়। আহত হওয়া সাইফুজ্জামানও মারা যান। আহত হন তার স্ত্রী ও ছেলে। পরের দিন ২৯ ডিসেম্বর রাত ৮ টায় লরি চাপায় আম্বিয়া খাতুন (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ নারী ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ৭ জানুয়ারি গভীর রাতে উপজেলার সলিমপুর ফৌজদারহাট পোর্টলিংক রোড এলাকায় মিল্ক ভিটার মিনি কাভার্ডভ্যানকে পেছন থেকে একটি লরি ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই কাভার্ডভ্যান চালক বাবলু ফকির (৩২) মৃত্যুবরণ করেন।
এরপর ৮ জানুয়ারি কালুশাহ নগরের ফকিরহাট এলাকায় রাত ১১ টার সময় এক ভিক্ষুক নারী তার ছেলেকে নিয়ে মহাসড়ক পারাপারের সময় একটি কাভার্ডভ্যান চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই নারীর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় আহত হয় তার ছেলে সাইফুল। একই রাতে মহাসড়ক পার হতে গিয়ে লরীর চাপায় মো. আবদুল্লাহ (৩৩) নামে এক যুবক মৃত্যুবরণ করেন। তিনি সলিমপুরের জঙ্গল লতিফপুর ৯নং ওয়ার্ডের মো. রফিক আহাম্মদের ছেলে। একইদিন বুধবার রাত সাড়ে আটটার সময় উপজেলার গুল আহম্মদ জুট মিল্স এলাকায় একটি প্রাইভেটকার একটি ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে মহাসড়কের ঢাকামুখি লেইন থেকে চট্টগ্রামমুখি লেইনে গিয়ে দ্রুত গতির একটি ট্রাকের সাথে সংঘর্ষে জড়ায়। এতে প্রাইভেটকারে থাকা তিন আরোহিসহ চালক গুরুতর আহত হন। পরে হাইওয়ে পুলিশ আহতদের উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে মিরসরাই সমিতির বাজার এলাকার প্রবাসী আবু নাছেরের ছেলে মেজবাহ উদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। একই ঘটনায় প্রাইভেটকার চালকও গভীর রাতে মৃত্যুবরণ করেন।
গত ১১ জানুয়ারি ভোরে উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়ন ফৌজদারহাট পোর্ট লিংক বন্দর সড়কের মাথায় মো. আলমগীর হোসেন (২৪) নামে এক পুলিশ সদস্য ও তার বন্ধু গ্যাস ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম (২৮) কে দ্রæত গতির অজ্ঞাত গাড়ি চাপা দিলে মোটরসাইকেল আরোহী আলমগীর ঘটনাস্থলে এবং শহিদুল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। নিহত আলমগীর চট্টগ্রাম রেঞ্জের পুলিশ সদস্য ও চট্টগ্রাম ডিআইজির গানম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি কুমিল্লা জেলার বুড়িরচং থানার পারোয়া গ্রামের আবদুল রশিদের ছেলে। তার বন্ধু নিহত শহিদুল একই এলাকার জাফর আলীর ছেলে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার ওসি আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘একটা দুর্ঘটনা একটা পরিবারের জন্য কান্না ছাড়া কিছুই বয়ে আনে না। এখানে চালকরা আরো সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাতে হবে। পাশাপাশি পথচারীরাও যেখানে ফুট ওভারব্রিজ রয়েছে সেখানে ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করতে হবে। আর আমরা তো মহাসড়কে সারাক্ষণ কাজ করছি, কিভাবে দুর্ঘটনার মাত্রা কমানো যায়’।