‘শিক্ষক’ যখন ‘লেখক’

লিটন দাশগুপ্ত

131

যেকোন শিক্ষক যেমন লেখক হতে পারে, তেমনি কোন লেখকের পেশাও শিক্ষকতা হতে পারে; যা একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু অস্বাভাবিক বিষয় হচ্ছে, হঠাৎ করে যদি কোন শিক্ষক একদিনের জন্যে কোন একটি লেখা কোন পত্রিকায় ছাপিয়ে লেখক হয়ে যায়, নিজে নিজেই আত্মস্বীকৃত লেখক হিসাবে অন্যের সম্মুখে উপস্থাপন করে, কোন প্রকার সুযোগ গ্রহনের চেষ্টা করে, তখন বিষয়টি কেমন দাঁড়ায়!
আবার যদি কোন একটি নির্দিষ্ট মাসে বা সুনির্দ্দিষ্ট সময়ে হঠাৎ করে দেশের বা জেলা উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক শিক্ষক, দৈনিক পত্রিকায় একসাথে লিখতে শুরু করে, তখন অবস্থা কেমন দেখায়? পত্রিকা পাঠকের ভাবনায় বা মনে কি আসতে পারে! বিষয়টি হাস্যকর ও অবিশ্বাস্য মনে হলেও গত নভেম্বর ডিসেম্বর মাসে তেমনই ঘটেছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকার পাতায় পাতায়। উল্লেখিত মাস দুটিতে পত্রিকা খুলে আমি দেখেছি এবং পাঠককেরাও দেখতে পেয়েছে, বহু সংখ্যক চেনা অচেনা ও তাদের সম্পর্কে জানা অজানা এমন অনেক শিক্ষকের লেখা। তাদের নাম পত্রিকায় দেখে আমি হতবাক হয়েছি এবং পাঠকও বিস্ময় প্রকাশ করেছে। পত্রিকায় দেখা গেছে কেউ পদ পদবী স্কুলের নাম সহ দিয়েছে লেখা, কেউ কেবল নিজের নামটি ব্যবহার করেছে। নিয়মিত পত্রিকা পাঠকের অনেকেই প্রশ্ন রেখেছে এই বিষয়ে, কেন এবং কি কারণে একটি নির্দ্দিষ্ট সময়ে হঠাৎ কিছু সংখ্যক শিক্ষক লেখক হয়ে গেল? অবশ্য পরে বুঝতে দেরী হয়নি, ঘটনার পিছনে ঘটে যাওয়ার রহস্য এবং কারণের কথা।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতি বছর ঐ সময়টাতে পুরো বাংলাদেশে ইউনিয়ন বা ক্লাস্টার থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচন করা হয়ে থাকে। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচন করা হয় ২৯ ক্রাইটেরিয়ার একাধিক স্কেল ভিত্তিতে। এই ২৯ টি উপাদানে মোট ১০০ নম্বরের তথ্য উপাত্তের মধ্যে রয়েছে শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকুরীসময় কাল, দৈনিক ক্লাস সংখ্যা, শিক্ষকের প্রকাশিত সৃজনশীল লেখা, প্রশিক্ষণ ভিত্তিতে পাঠদান প্রক্রিয়া ইত্যাদি।
এখানে ২৯ টি ক্রাইটেরিয়ায় একটিতে আছে শিক্ষকের প্রকাশিত লেখার বিষয়, যাতে নম্বর আছে ৫। আর এই ৫ নম্বর বিভাজন এই ভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে, (ক) কোন শিক্ষক যদি বই প্রকাশ করতে পারে সে পুরো নম্বর অর্থাৎ ৫ নম্বর পাবে। (খ) যে শিক্ষক শিক্ষা সম্পর্কিত প্রবন্ধ লিখেছে সে পাবে ৩। (গ) যে ছড়া বা কবিতা পত্রিকায় প্রকাশ করতে পেরেছে সে পাবে সম্ভবত ১ নম্বর।
এখানে দেখা যায়, বই প্রকাশ করতে পারলে পাঁচ নম্বর। তাই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় অনেক শিক্ষক, অন্য কোন নতুন বা অপরিচিত লেখকের লেখা এবং পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু লেখা নিয়ে কম্পিউটারে টাইপ করে গল্পের বা কবিতার বই আকারে বাইন্ডিং করে, কম্পিউটারের মাধ্যমে ফোর কালার প্রচ্ছদ বানিয়ে সাক্ষাতকার গ্রহণের সময় বোর্ডের সামনে সময়মত উপস্থাপন করে। আবার যেহেতু পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ থাকলে ৩ নম্বর, তাই সহজ পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল থেকে বিষয়বস্তু নিয়ে বা ইন্টানেট থেকে কপি পেস্ট করে অথবা একটু আধটু পরিবর্তনের চেষ্টা করে, ছলে বলে কৌশলে নিজের নাম দিয়ে পত্রিকায় ছাপিয়ে নেয়। আর পত্রিকার কর্তৃপক্ষ এত সব বিবেচনায় না নিয়ে অথবা বিভিন্ন ভাবে বাধ্য হয়ে লেখা দুয়েকটা ছাপিয়ে দেয়। বাঃ বাঃ, এই অবস্থায় ঐ শিক্ষক শ্রেষ্ঠ হবার পথে একধাপ এগিয়ে গেল!
এই দিকে নির্দিষ্ট সময়ে বা তারিখে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ছাপাতে হচ্ছে ঐ সব মেকি লেখকের লেখা, তাই আমার বা আমার মত নিয়মিত অনেক লেখকের চিন্তাপ্রসূত সৃজনশীল লেখা পত্রিকা হতে বাদ পড়ে গেল। এই অবস্থায় পুরানো লেখকের পুরাতন লেখা নতুন লেখকের নামে নতুন বিষয় হিসাবে পড়তে হচ্ছে সাধারণ পাঠককে। আর এইভাবে গত নভেম্বর ডিসেম্বর মাসের বেশীর ভাগ পত্র পত্রিকায় কিছু সংখ্যক শিক্ষক হয়ে গেল লেখক। গত ১১ জুন ’১৯ ইং তারিখে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় ‘লেখক হবার সহজ পদ্ধতি’ শিরোনামে লিখেছিলাম-
আমি মনেকরি সৃজনশীল কিছু লিখতে গেলে বা লেখক হতে হলে (লে+খ+ক) বর্ণগুলোর বিশ্লেষণ করে প্রাপ্ত ভাবাবেগ বা উপাত্তের সাথে সম্পর্কযুক্ত হতে হবে। যেমন- “লে” মানে ‘লেখা’ এখানে লেখার মত ভাষা ও বৈকারণিক রীতিনীতি জানতে হবে। “খ” মানে ‘খবর’। অর্থাৎ দুনিয়ার সকল রকম খবর জানা থাকা বাঞ্চনীয়, এই ধরণের খবরকে জ্ঞান বলা যেতে পারে। আর “ক” মানে ‘কল্পনা’ অর্থাৎ কল্পনা শক্তির মাধ্যমে বিষয়বস্তু ফুটিয়ে তুলতে হবে, যাকে বলা হয় সৃজনী প্রতিভা। অনেকে যেটাকে ‘গিফ্ট অফ গড’ বলে। এই রকম আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলাম যা ঐ সময় পাঠক সমাজ গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করে প্রশংসা করেছিল। তাই বলা যেতে পারে চাইলে কেউ লেখক হওয়া যায়না।
এবার আসি আমার শৈশব সময়ের কিছু স্মৃতি কথায়। ছোট বেলায় সব সময় একটি প্রশ্ন শোনা যেত, বৈজ্ঞানিক বড় নাকি সাহিত্যিক বড়? আরো একটু বড় হলে বন্ধু বান্ধবদের আলোচনায় শুনতাম, বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন এর জ্ঞান বুদ্ধি বেশী, নাকি সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়ার এর জ্ঞান বুদ্ধি বেশী! ঐ সময় এই সব যৌক্তিক বা অযৌক্তিক তর্কে ‘সাহিত্যিক-বৈজ্ঞানিক’ শিরোনামে স্বরবৃত্ত ছন্দের নি¤েœাক্ত ছড়াটি লিখে ফেলি-
লোকের মাথা খারাপ হলে
পাগল বলে দেয় যে ধিক,
তা শতকরা শত ঠিক;
পাগল মাথা খারাপ হলে
হয় যে কবি সাহিত্যিক।
অজ্ঞানীর জ্ঞান অভাব হলে
নাম বোকা হয় চারিদিক,
সেতো সত্যি সত্যিই ঠিক;
অজ্ঞানতার প্রভাবে সে
হয় যে বড় বৈজ্ঞানিক।
অন্যদিকে বিজ্ঞানী সাহিত্যিক এমন দ্ব›েদ্বর মধ্যে ঘরে দেখতাম, আমার মা-বাবার মধ্যে আমার জীবনের লক্ষ্য নিয়ে দ্ব›দ্ব! অর্থাৎ মা বাবা স্বপ্ন দেখতো, আমি বড় হলে কি হব, বা কি হতে হবে। মা বলতো আমার ছেলে বড় হলে ডাক্তার কিংবা শিক্ষক হবে। আর বাবা বলতো ইঞ্জিনিয়ার, রেলওয়ে’তে চাকুরী করতে হবে। এই দ্ব›েদ্বর মাঝে আমিও ঐ সময় অনেক ছড়া রচনা করে ফেলি, যার মধ্যে ‘শাকের করাত’ নামে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের একটি ছড়া মনে পড়ে গেল, যা এই রকম-
মা বলে, ‘সে হবে এক সাহিত্যিক কবি
এত খ্যাতি হোক যাতে নজরুল রবি;’
বাবা বলে, ‘বৈজ্ঞানিক মোর সাধ যবে
নিউটন বা ডাল্টন ওকে হতে হবে;’
তাঁদের কথায় আমি আছি অনিমিখে
পায়না ভেবে উপায় যাবো কোন দিকে!
যাই হোক, ঐ সব আমার শৈশব-কৈশোর সময়ের স্মৃতি কথা। এখনকার সময়ে কথা হচ্ছে, শিক্ষক বড় না সাহিত্যিক বড়, উপরের লেখার প্রেক্ষাপটে এখন এমন প্রশ্নই আসে। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচনে বা বাছাই প্রক্রিয়ায় সৃজনী প্রতিভা সম্পর্কে জানার জন্যে শিক্ষকের লেখার দক্ষতা বুঝার জন্যে, সাহিত্যজ্ঞান সম্পর্কে জানতে চাওয়া খারাপ কিছু নয়। আর সবার সাহিত্য বা লেখার মত জ্ঞান থাকবে তাও কিন্তু নয়। জোর করে কেউ চাইলে লেখক হতে পারেনা। কিন্তু যেভাবে একটি নির্দ্দিষ্ট সময়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচনে পরস্পর প্রতিদ্ব›িদ্ব প্রত্যেক শিক্ষক হঠাৎ লেখক হয়ে যাচ্ছে, আগামীতে সকল লেখক আবার শিক্ষক হয়ে যাবে কিনা সেই প্রশ্নই থেকে গেলো! যেমনটি বৈজ্ঞানিক বড় নাকি সাহিত্যিক বড়; অর্থাৎ শিক্ষক না লেখক!

লেখক : শিক্ষক ও সাহিত্যি।