ভয়ঙ্কর বিমান মহড়া, ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের আশঙ্কা

191

গত বৃহস্পতিবার কাশ্মীরের পুলওয়ামা শহরে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়িবহরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৪৪ জন জোয়ান নিহত হয়েছেন। জম্মু-কাশ্মীরে জঙ্গি হামলার এ ঘটনায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে ভারত ও পাকিস্তানে। নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরই মধ্যেদুই দেশের সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিরা যত হামলা চালিয়েছে বৃহস্পতিবারের হামলাটিই তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী। এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ভারত।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, যারা একের পর এক এই ধরণের ভুল করে চলেছেন, তাদের এই জন্য উপযুক্ত মূল্য দিতে হবে। জঙ্গিরা বিরাট ভুল করে ফেলেছে। এই হামলার জন্য যাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, আমি তাদের কথা দিচ্ছি তারা উপযুক্ত বিচার পাবে।
এ হামলার জন্য পাকিস্তানকে ইঙ্গিত করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশ যে রাস্তা দিয়ে চলছে তা তাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। সারা ভারতবাসী এই হিংসাত্মক ঘটনার উপযুক্ত জবাব দেবে। ভারতীয় বিমানবাহিনী এরই মধ্যে জোরদার মহড়ায় নেমে গেছে। এই মহড়াতেই বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধাভ্যাস দেখছেন। এই মহড়ায় লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে বোমা নিক্ষেপ, রকেট লঞ্চারের ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি মিগ-২১, মিগ-২৭, মিগ-২৯, মিরাজ ২০০০-সহ ১৪০টি ফাইটার জেট, বেশ কিছু হেলিকপ্টার শক্তি প্রদর্শন করে এই মহড়ায়।
এলসিএ তেজস, অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার, আকাশ (সারফেস টু এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র), অ্যাস্ট্রা (এয়ার টু এয়ার মিসাইল)-সহ সুখোই-৩০-এর মতো বিমানও রণকৌশল দেখিয়েছে।
সামরিক অনুশীলনে প্রথম বার অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার, আকাশ (সারফেস টু এয়ার মিসাইল) অংশ নিল। জাগুয়ার, মিগ ২১ বাইসন, আইএল ৭৮, হারকিউলিস,এএন-৩২ বিমানও অংশ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পুলওয়ামার হামলার পরে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সেনাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত কি সামরিক পদক্ষেপ নেবে?
ভারত শাসিত কাশ্মিরের পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলায় ৪০ জনেরও বেশি সিআরপিএফ জওয়ান নিহত হওয়ার পরে ভারত এজন্য পাকিস্তানকে সরাসরি দায়ী করেছে। পাকিস্তানকে কীভাবে মোক্ষম জবাব দেওয়া যেতে পারে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সেই সঙ্গে রয়েছে জনমতের চাপ আর রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কূটনৈতিকভাবে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ভারতীয় উদ্যোগ এরই মধ্যে আটকে গেছে। অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তানকে দেওয়া বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহার করেছে ভারত। সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে। এক্ষেত্রে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যে সব সামরিক বিকল্প আছে, তার কোনোটাই খুব সহজ হবে না ভারতের পক্ষে।
হামলার ঘটনায় পাকিস্তানকে উচিত জবাব দিতে নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে সমর্থকদের চাপের মুখে রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবারের হামলার পর মোদি হুঁশিয়ারি জানিয়ে বলেছেন, যারা জড়িত তাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হবে। পাল্টা পদক্ষেপ নিতে সেনাবাহিনীকে যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।
২০১৬ সালে উরিতে একটি সেনাঘাঁটিতে হামলায় ১৯ সেনা নিহতের ঘটনায় পাকিস্তানে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নামে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে ভারত। এই অভিযানে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সামরিক কর্মকান্ড চালানো হয়। তবে পাকিস্তান ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে।
শনিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সম্ভাব্য দুটি সামরিক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছে। এই দুটি পদক্ষেপই পারমাণবিক শক্তিধর দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধই বলা যায়। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ছোট আকারের হামলা এবং দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ রেখায় কিছু পাহাড় বা অঞ্চল দখল করা। উভয় অভিযানেই পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে সীমিত বেসরকারি স্থাপনায় বিমান হামলা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
পাকিস্তানে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার জি পার্থসারথি জানান, সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের কথা প্রকাশ্যে আলোচনা করা যায় না। তিনি বলেন, আমরা বলেছি পাকিস্তানকে চড়া মূল্য দিতে হবে। যৌক্তিক কারণে আমরা অবশ্যই কিভাবে এটা করা হবে তা প্রকাশ করব না।
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী বলেছেন, পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর কোনও দেশের বিরুদ্ধে চরম কোনও পথ নেওয়া কঠিন সিদ্ধাস্ত। তিনি বলেন, শাসক পক্ষের ওপরে যথেষ্ট চাপ আছে বিরোধী পক্ষর থেকে যেমন, তেমনই জনমতও তৈরি হয়েছে যে এই হামলার প্রত্যাঘাত করা দরকার। সেদিক থেকে মনে হয় সামরিক বিকল্পের দিকেই ভারত ঝুঁকবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেরকম প্রত্যাঘাত আবারও পাল্টা আঘাত টেনে আনবে কিনা। কারণ দুটোই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।
অবসরপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী মনে করেন, যেভাবে আত্মঘাতী হামলা হয়েছে, সেই একই পথে প্রত্যাঘাত করা যায় কিনা, তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত ভারত সরকারের। তিনি বলেন, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সামরিক- এই চারটে বিকল্পই আছে, যেগুলো নিয়ে চর্চা হচ্ছে। কিন্তু এর বাইরে আরও একটা পদ্ধতি আছে, যেটাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে উচিৎ পথ বলে মনে করি- নন স্টেট অ্যাক্টর্সদের ব্যবহার করা হোক। যেভাবে পাকিস্তান থেকে আত্মঘাতী হামলা হচ্ছে, সেই একই ভাবে এদিক থেকেও প্রত্যাঘাত করা হোক। বাংলাট্রিবিউন
দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গীবাদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্ত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অফ কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের পরিচালক অজয় সাহনীর মতে তাৎক্ষণিক প্রত্যাঘাত কোনও কাজে আসবে না। দীর্ঘমেয়াদী কৌশল ছাড়া কোনও বিকল্প ভারতের নেই। তিনি বলেন, যেসব বিকল্প নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেগুলো সবই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা। একটা হামলার প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবা হচ্ছে। কৌশলগত পদ্ধতি নিয়ে কারও ভাবনা নেই। সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা এভাবে করা যায় না। যখনই একটা বড়ধরণের হামলা হয়, তখনই এসব চিন্তাভাবনা শুরু হয়। কিন্তু প্রশ্নটা হলো- এর আগের হামলা আর এই হামলার মাঝের সময়টাতে কী করা হলো? সামরিক ব্যবস্থাপনা বা গোয়েন্দা ব্যবস্থায় কি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
সাহনী জানান, গতবছর মার্চে প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি রিপোর্ট দিয়েছিল যে সামরিক বাহিনীর ৬৮ শতাংশ সরঞ্জাম বহু পুরনো ও সেকেলে। এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে ১০ দিন পর্যন্ত লড়াই করার গুলো বারুদ মজুদ রয়েছে ভারতের। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করে সাহনী বলেন, যদি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা না নেওয়া হয়, তাহলে এভাবেই একেকটা হামলা হবে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মারা যাবে আর সবাই ভাবতে বসবে কীভাবে প্রত্যাঘাত করা যায়।
ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড জানান, পাকিস্তান আশঙ্কা করছে তারা হামলার শিকার হতে পারে এবং ভারতীয় সেনারা যে কোনও অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাংলাট্রিবিউন