২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় জাতি আরো একবার দায়মুক্ত হল

12

দীর্ঘ ১৪ বছর পর ইতিহাসের আরো একটি বর্বরতম ঘটনা তথা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে গতকাল বুধবার। গ্রেনেড হামলা মামলার মামলায় অভিযুক্ত ৪৯ জন আসামির মধ্যে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে। বাকি ১১জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। ১০ অক্টোবর দুপুরে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন এ রায় ঘোষণা করেন। বিভীষিকাময় সে ঘটনার পর বিচারের রায়ের অপেক্ষায় থাকা ঘটনারদিন আহত এবং নিহতদের স্বজনদের অপেক্ষার দিন শেষ হল। দীর্ঘদিন পর হলেও ইতিহাসের জঘন্যতম হামলার বিচার আলোর মুখ দেখলো। এ রায়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় সন্তুষ্ট ও অসন্তুষ্টের বিষয় আসলেও বাস্তবে আমরা মনে করি, একবিংশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া জঘন্যতম রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের বিচার জাতিকে আরো একবার দায়মুক্ত করেছে। এর আগে মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের বিচার জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছিল। এ রায় রাজনীতিকদের জন্যও একটি সতর্কবাণী হিসাবে বিবেচিত হবে। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যেকোন হত্যাকান্ড বা মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠনের পরিণাম আইনি ধারায় কত কঠোর হওয়া যায়-এর একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এ রায়।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানী ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউ দলীয় কার্যালয়ের সামনে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে উপস্থিত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা ও দলীয় নেতাদের হত্যার উদ্দ্যেশ্যে বর্বর গ্রেনেড হামলা করা হলে এতে মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইভি রহমানসহ ২২জনের মৃত্যু হয়। অপরিচিত আরো ২জনসহ মোট ২৪ জন ঘটনায় নিহত হন। আহত হন কয়েকশত দলীয় কর্মী ও সাধারণ মানুষ। নৃশংস এ হত্যাকান্ডের পরদিন অর্থাৎ ২২ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার মতিঝিল থানায় এসআই ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আরো দুটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। একই দিনে সরকার বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে । এক মাস দশ দিন পর অর্থাৎ ২ অক্টোবর সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় এ কমিশন। এরপর তদন্ত শুরু করে থানা পুলিশ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হয়ে তদন্তের দায়দায়িত্ব যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হাতে। পরে সব মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। বিচার বিভাগীয তদন্ত, পুলিশ তদন্ত যাই হোক না কেন, সেই সময় সব তদন্তকে ¤øান করে দিয়েছিল কথিত জজমিয়া নাটক। এ নাটকের মুখোশ উন্মোচনের পর মূলত জনগণ বুঝতে পেরেছিল ২১ আগস্ট ট্র্যাজেডির পেছনে রাষ্ট্রযন্ত্রের ষড়যন্ত্রই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। গতকালের রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত তাই বলেছেন। মূলত তত্ত¡াবধায়ক সরকারের আমলে এ মামলাগুলোর নতুন মোড় ঘুরে যায়। ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের আসামি করে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ওই অভিযোগপত্রে মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত মামলার বর্ধিত তদন্তের আদেশ দেন। ১৩ দফা সময় বাড়িয়ে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেয়ার মধ্য দিয়ে গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্ত শেষ হয়। ২০১২ সালের ২৮ মার্চ মামলার বিচার শুরু হয়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ৫২ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচার কাজ শুরু হয় ২০১২ সালের ২৮ মার্চ। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল একই বছর ৯ এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়। এর আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে বিশেষ ট্রাইবুন্যালে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার শুরু হয়েছিল। বহুল আলোচিত এ মামলায় ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আরও ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেয়া হয়।