১০০ কিশোরকবিতা

উৎপলকান্তি বড়ুয়া

45

অরুণ শীল। কিশোর কবিতার লেখক। ছড়া লিখেন। গল্প লিখেন। লিখেন প্রবন্ধ-জীবনী ইত্যাদি। মূলত কিশোর কবিতায় সিদ্ধহস্ত তিনি। বাংলাদেশের কিশোর কবিতা চর্চ্চার অগ্রভাগে যাঁরা আছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। কিশোরকবিতার চমৎকার নানান অনুসঙ্গ,বুনন,উপস্থাপনা সর্বোপরি রচনাশৈলী, তাঁর কাছে সহজে ধরা দেয়।
কিশোরকবিতার বরপুত্র, শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক সুজন বড়ুয়া অরুণ শীল সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন-“বাংলা কিশোর কবিতার এক নিষ্ঠাবান কারুকর্মী অরুণ শীল। তার সৃজনশীল মেধার সর্বোচ্চ প্রকাশ তিনি ঘটিয়েছেন কিশোরকবিতা অঙ্গনে। শব্দ ছন্দের সুনিপুণ বুননে কল্পনার মায়াজালে কিশোরকবিতার অন্তরাত্মা স্পর্শ করার কঠোর সাধনায় ব্রতী তিনি। গভীর হৃদয়ানুভূতি আর নিবিড় যত্নের ছাপ স্পষ্ট তার কবিতার চরণে চরণে। কৈশোরের স্বপ্ন-কল্পনা, আনন্দ বেদনা, দুরন্তপনা, আনাড়িপনা, কৌতুহলপ্রিয়তা, অভিযানপ্রিয়তা, দুর্বুদ্ধিতা, নির্বুদ্ধিতা, অপরিণামদর্শিতা, আবেগপ্রবণতা, অপমানবোধ, আত্মসম্মানবোধ সব বৈশিষ্টই তার কবিতায় নতুন মাত্রা পেয়েছে।”
অতি সম্প্রতি প্রকাশিত অরুণ শীলের ‘১০০ কিশোরকবিতা’ গ্রন্থের ভূমিকায় উপরোক্ত মহামূল্যবান কথাগুলো উল্লেখ করেন সুজন বড়ুয়া। সংক্ষিপ্তভাবে হলেও এই গ্রন্থটিই আজ আমাদের আলোচ্য বিষয়।
অরুণ শীলের কবিতা সত্যি চমৎকার ভালোলাগার সুবাস ছড়ায় মনে। ফুলের কুসুম কোমল পাপড়ির সুভাসিত ছোঁয়ায় যেনো প্রাণ ভরে যায়। আর সেই ছোঁয়ার নরোম আলোর সুবাসিত সৌন্দর্যে আচ্ছন্ন করে রাখে যে কাউকেই-
আয়রে রঙিন সকালবেলা, আয়রে সকাল আয়
তোমার ছোঁয়ায় ফুলকলিরা ফোটার অপেক্ষায়।
কখন তুমি ছুঁয়ে দেবে উষ্ণ অনুরাগে
স্নিগ্ধ হাওয়ায় মুগ্ধ মনে ভোরের পাখি জাগে
কত মধুর সুরে ডাকে, আয়রে সকাল আয়
একটুখানি সুড়সুড়ি দাও ঘুমকাতুরের পা’য়।
-আয়রে সকাল আয় / পৃষ্ঠা-১১
সকালকে ডাকার নান্দনিক ভঙ্গিমার পাশাপাশি ঘুমিয়ে থাকাদের সজাগ করার মানসে চমৎকার আহ্বান সত্যি অতুলনীয়।
অরুণ শীল নিজের ভেতরে সবসময় অগ্রগামীতার সুপ্রসন্ন আলো জ্বেলে রাখার মন্ত্র ধারণ করেন খুব যত্নসহকারে। সহজিয়া রূপ-রসে ভেজানো নান্দনিক উপস্থাপনা তাঁর বৈশিষ্টের ধারায় নিমর্জিত। এখানে তাঁর সেই ধারাবাহিকতার উদ্বৃতি করলে সহজে অনুমান করা যায়-
এমন আঁধার মুছে দিয়ে হাসুক না ঘর-দোর
একটা নতুন ভোর চাই মা, একটা নতুন ভোর।
তারার আলো চাঁদের আলো ঢেকে-
ভয় জাগানো এমন আঁধার আসে যে কোত্থেকে?
তোমার মুখে মলিন ছায়া দুশ্চিন্তা মাখা
তখন কি আর যায় ঘুমিয়ে থাকা?
আলোর রেখা মুছে দেবে আঁধার ঘনঘোর
একটা নতুন ভোর চাই মা, একটা নতুন ভোর।
-একটা নতুন ভোর / পৃষ্ঠা-১২
সচেতন সন্তান মাত্রেই সুসন্তান। সঙ্গতভাবেই এমন সন্তান দেশমাতার দুঃসময়ে চুপ করে থাকতে পারে না। সকল আঁধার প্রতিহত করে নিশ্চিন্ন করার প্রত্যয়ে সোচ্ছার। এখানে প্রতিকী মা, অর্থাৎ দেশমাতার প্রতি প্রসন্ন আলোর নতুন ভোরের প্রত্যাশা করার আকুতি ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে।
দুষ্টু ছেলের স্বভাবের ধরন সকলের জানা। লেখাপড়া-স্কুল বাদ দিয়ে খেলা, টইটই করে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানো, হই হুল্লোড় করা, পুকুর-নদীতে ভর দুপুরে ঝাঁপিয়ে পড়া ইত্যাদি নিত্যদিনের কাজ। কিন্তু লেখক অরুণ শীল এই অতি চেনা-জানা চিরপ্রথা থেকে বেরিয়ে এসে সেই কিশোরের চরিত্র- ভাবনাকে অনেকটা ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার প্রয়াস পেয়েছেন।
পাখি বলল, গান শুনবি? / আয় চলে আয় মাঠে
যেখানে ওই গঙ্গাফড়িং / ভূতের বেগার খাটে।
মেঘ বলল, একটু দাঁড়াও / তুলছি তোমার ফটো
তোমার চলন বলন কেমন / একটু কটোমটো।
রোদ বলল, জানিস না তো / তুই কী হতচ্ছাড়া!
গুগোল ইমো ফেসবুক কি / করছে তোকেও তাড়া?
…………………………………….
বাদাম তলায় কাঠবিড়ালি / পথ আগলে বলে
খেলতে এসো খেলতে এসো / যাচ্ছো কোথায় চলে?
আহা বাপু! সবুর করো / যাচ্ছি স্যারের বাড়ি;
সামনে আমার পরীক্ষা তো / পড়াটা দরকারি।
-সামনে আমার পরীক্ষা / পৃষ্ঠা-১৩
ছোটোরাও একসময় বড় হয়। আর সেই বড় হয়ে যাওয়ার কিছুটা আগেই হয়তো তারা ঠিক একসময় নিজেদেরকে বড় ভাবতে ভালোবাসে। উপস্থিত সময়ের নিদ্দিষ্ট কিছু কার্যকারণের মাধ্যমে নিজেদেরকে আর ছোটো মনে করে না তারা। তখন তারাও হয়ে যায় বড়। বড়দের মতো। বড় হয়ে যাওয়ার ভারী অহংকারীত্বে ভোগে তারা এ সময়।
খুকু খুকু ডাকবে না, নাম বুঝি নেই?
উত্তর দেবো নাম ধরে ডাকলেই।
আমি আর ছোট নই, যাও কেন ভুলে?
ভর্তি হয়েছি আজ কে.জি ইশ্কুলে।
খুক খুকু ডাকো কেন? ডেকো নাম ধরে;
খুকুরা কি কোনোদিন ইশ্কুলে পড়ে?
ছোট কাকা কাল রাতে বলে দিয়েছেন
আজ থেকে আমি হই বনলতা সেন।
– বনলতা সেন / পৃষ্টা-১৯
লেখক অরুণ শীল নিজেকে শিশুদের চরিত্রের কাতারে সামিল করেই কিন্তু মিশে গেছেন অবর্ণনীয় বাস্তব সৌন্দর্যে। ছোটোদের সাথে মিশে গিয়ে ছোটো হয়ে তিনিও ছোটোদের কথা ছোটদের মতো করে বলেছেন। আর সেই ছোটো শিশুদের মনের একান্ত সংলাপও তিনি সেই কারণে অবলীলায় বলতে পেরেছেন পরম সাহসে। ছোটোদের এই নিষ্পাপ অহংকারমিশ্রিত অভিযোগ সঙ্গতভাবেই সার্বজনীন।
মেঘ’এর কবি নামে খ্যাত অরুণ শীল-এর ইতোপূর্বে চারটি কিশোর কবিতাগ্রন্থই প্রকাশিত হয়েছে মেঘ বিষয়ক লেখার সংখ্যাধিক্যে। সঙ্গতকারণেই আলোচ্য ‘১০০ কিশোরকবিতা’ এই গ্রন্থেও তাঁর মেঘ বিষয়ক লেখার সংখ্যাধিকক্যতা লক্ষণীয়। মেঘ ও কবি, মেঘ জমে রোদ হচ্ছে ফিকে, মেঘের কবিতা, আয় বৃষ্টি আয়, সেই মেঘটা, ওগো মেঘ বৃষ্টি মেয়ে, মেঘের সাথে, সাদা মেঘের সাঁকো, মেঘতাড়–য়া, মেঘেরা উড়ে যায়, মেঘ নামছে বনে ইত্যাদি কবিতাগুলি গ্রন্থিত হয়েছে এই গ্রন্থে।
অরুণ শীলের আলোচ্য গ্রন্থটিতে এছাড়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুখ, ঢেউভাঙ্গা রোদ্দুরে, আপন করে রাখতে চাই, ছুটির সকাল, স্বপ্নলোকের ছকিবক, ছোট্ট নদীও ছেলেবেলার গান, লিখে রাখি নাম, প্রিয় হাশেম খান, বিদ্যাসাগর, বাবা আমার বন্ধু, বাউন্ডুলে, প্রিয় পতাকা, আজ ছুটি, বান্দরবান, কাকতাড়–য়া, দুপুরবেলা, পাহাড়ে নেমেছে রাত, আরো বড় হতে চাই, আকাশ ভরা রবীন্দ্রনাথ, হচ্ছি কেন বড়, কথার সমুদ্দুরে, হারিয়ে ফেলেছি, খুশির ইশকুলসহ মোট একশত কিশোর কবিতা স্থান পেয়েছে ‘১০০ কিশোরকবিতা’ এই গ্রন্থে।
অরুণ শীলের এই গ্রন্থের কিশোরকবিতাগুলোতে স্বরবৃত্ত ছন্দের পাশাপাশি মাত্রাবৃত্তের সংখ্যাধিক্যতা লক্ষণীয়। তবে তিনি যে কোনো ছন্দেই সাবলীল। নিখুঁত ছন্দমাত্রাজ্ঞান সমৃদ্ধ প্রতিটা কিশোরকবিতাটাই বলতে গেলে সুখপাঠ্য।
কিশোরকবিতার লেখক, তথা বৃহত্তর পাঠকসমাজ ‘১০০ কিশোরকবিতা’ গ্রন্থটি পাঠে যথেষ্ট উপকৃতই এবং আনন্দিত হবেন দারুণভাবে এ কথা নিদ্বিধায় বলতে পারি। স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শৈলী প্রকাশন থেকে ২০২০ বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত এই গ্রন্থটির নান্দনিক প্রচ্ছদ ও ভেতরের অলংকরণ করেছেন দেশের খ্যাতিমান অংকনশিল্পী উত্তম সেন। ঝরঝরে তকতকে নির্ভুল একরঙা ছাপা সর্বমোট ১১২ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটির মূল্য ৩০০ টাকা মাত্র।