হোটেল থেকে যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার

টেকনাফ প্রতিনিধিনিজস্ব প্রতিবেদক

61

রোকসানা আক্তার পপি (২২)। চিকিৎসা বিজ্ঞানে লেখাপড়া করে চীনে। দীর্ঘ বছর প্রেমের পর গোপনে বিয়ে করেন মাঈনুদ্দিন ওরফে শাহরিয়ার শুভকে(২৯)। একপর্যায়ে ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। ফের যোগাযোগ হয় তাদের। শুভ চীনে টাকাও পাঠায় পপির কাছে। সেই টাকায় দেশে এসে খুন করে শুভকে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ফয়’স লেকের লেকভিউ আবাসিক হোটেল থেকে উদ্ধার করা হয় শুভর খণ্ডিত লাশ। তাকে জবাই করে মাথা একস্থানে আর দেহ অন্যস্থানে ফেলে দেয়া হয়। কথিত সাবেক স্ত্রী পপিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও চাপাতিও উদ্ধার করা হয়েছে। পপি শুভকে হত্যা করার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ হত্যাকান্ডে আরো কেউ জড়িত রয়েছে কিনা তাও দেখা হচ্ছে বলে জানান খুলশী থানার ওসি শেখ নাসির উদ্দিন। নিহত শাহরিয়ার শুভ ছাগলনাইয়া উপজেলার ৯নং শুভপুর ইউপির ১নং ওয়ার্ড বালিরচর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের পুত্র। তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।আটক সাবেক স্ত্রী রোকসানা আক্তার পপির বাড়ী জেলার মীরসরাই উপজেলার বারৈয়ারহাট মেহেদী নগর গ্রামে। তার বাবার নাম আবু আহম্মদ।পুলিশ ও হোটেল সূত্রে জানা যায়, রাত দেড়টার দিকে লেকভিউ আবাসিক হোটেলের দ্বিতীয় তলার ২০৩নং কক্ষ ভাড়া নিয়ে উঠে তারা। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী শুভকে ঘুমের কিছু খাইয়ে ঘুমের মধ্যেই ধারালো ছুরি ও চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে খুন করে। এরপর মাথা হোটেল কক্ষের রক্ষিত ডাস্টবিনে এবং দেহ তোষক দিয়ে মুড়িয়ে খাটের উপর ঢেকে রাখে।পুলিশ জানায়, চীনে বসেই সাবেক স্বামী মাঈনউদ্দিন ওরফে শাহরিয়ার শুভকে খুনের পরিকল্পনা করে রোকসানা আক্তার পপি (২২)। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৫ আগস্ট দেশে এসে ১৬ আগস্ট শুভকে হত্যা করা হয়। এরপর ফের চীনে পাড়ি দেয়ার প্রস্তুতি নেয় রোকসানা আক্তার। তবে তার আগেই পুলিশের হাতে আটক হয়।রোকসানা আক্তার পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, ছুরি ও চাপাতি দিয়ে শুভকে গলা কেটে হত্যার পর দেহ থেকে মাথাটি পৃথক করেছে সে।খুলশী থানার ওসি জানান, খুনে ব্যবহৃত একটি ছুরি ও চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। একইসঙ্গে রোকসানার মা নাছিমা আক্তারকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।বৃহস্পতিবার রাত দুইটার দিকে ডা. রোকসানা আক্তারকে আটক করা হয়েছে ২ নম্বর গেইট আল ফালাহ গলির মুখ থেকে। শুক্রবার সকাল আটটার দিকে আটক করা হয় তার মা নাছিমা আক্তারকে।
ফয়’স লেক এলাকার লেকভিউ মোটেল ম্যানেজার মো. ইলিয়াছ জানান, পপি ও মাঈন উদ্দিন ওরফে শাহরিয়ার শুভ ১৫ আগস্ট বুধবার দিনগত রাত দেড়টার সময় হোটেলে আসেন। স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে তারা একটি কক্ষ ভাড়া নেন। বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে রোকসানা একা হোটেল থেকে বের হয়ে ঘণ্টাখানেক পর ফিরে আসেন। এরপর রাত নয়টা থেকে সাড়ে নয়টার দিকে পপি আবার দ্রæত বের হচ্ছিলেন। এসময় কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞাসা করলে রোকসানা তাদের জানান, একটি টেইলার্সে কিছু ড্রেস সেলাই করতে দিয়েছেন, সেগুলো আনতে যাচ্ছেন। কিন্তু রাত ১২টার দিকেও যখন পপি ফিরেনি, তখনই পুলিশকে খবর দেন তারা। পুলিশ এসে বাহির থেকে তালাবদ্ধ কক্ষটি খুলে লাশ উদ্ধার করে।খুলশী থানার ওসি শেখ নাসির উদ্দিন বলেন, রাতে খবর পেয়ে হোটেলে গিয়ে কক্ষটি খোলা হয়। এরপর সিআইডি, পিবিআই, ডিবি ও এসবিকে খবর দেয়া হয়। খবর পেয়ে র‌্যাবও ঘটনাস্থলে আসে। এরপর সকল সংস্থার প্রাথমিক কার্যক্রম শেষে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে তিনটার দিকে লাশ থানায় আনা হয়।তিনি জানান, এই ঘটনায় নিহতের বড় ভাই মো. জাফর উদ্দিন বাদী হয়ে রোকসানা আক্তার পপিকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন।সূত্র জানায়, পপিরা ভাড়া বাসা নিয়ে থাকে নগরের ২ নম্বর গেইট আল ফালাহ গলির রশিদ ভবনে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, স্কুল জীবনেই পপি শুভর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। ২০১২ সালে কাউকে না জানিয়ে তারা কোর্টে গিয়ে বিয়ে করে। বিয়ের খবর জানাজানি হওয়ার পর তা মেনে নিতে পারেনি পপির মা নাছিমা বেগম। এরপর থেকে রোকসানার জীবন থেকে সরে যাওয়ার জন্য শুভকে একের পর এক হুমকি দিতে থাকে। ২০১৪ সালে নাছিমা বেগম রোকসানাকে বাধ্য করে শুভকে তালাক দিতে। এরপর রোকসানাকে ডাক্তারি পড়তে পাঠিয়ে দেয়া হয় চীনে।
গত দেড় থেকে দুই মাস আগে রোকসানা আবার শুভকে ফোন করা শুরু করে। পরে দেশে আসার জন্য টাকা চায়। শুভ দেশে আসা-যাওয়ার বিমান টিকেট ও তার কেনাকাটার জন্য দুই লাখ টাকা পাঠিয়ে দেয়। সে টাকা পেয়ে দেশে এসে মাত্র একদিনের মাথায় খুন করে শুভকে। সূত্র জানায়, গত ১৫ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামে রোকসানা। বিকেল তিনটার দিকে শুভ রোকসানাকে রিসিভ করে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এরপর তারা ফয়’স লেক এসে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে হোটেল ভাড়া নেয়। খুলশী থানায় উপস্থিত নিহত শাহরিয়ার শুভ’র বড় ভাই মো. জাফর পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। তার শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘একটি মেয়ের সাথে আমার ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল। মেয়েটি বৃহস্পতিবার বিকালে চীন থেকে দেশে এসেছে এবং আমার ভাই তাকে ঢাকা বিমান বন্দরে রিসিভ করে তাকে নিয়ে চট্টগ্রামে আসে। মেয়েটি পরিকল্পিতভাবে তার সহযোগীদের নিয়ে আমার ভাইকে খুন করেছে।’