হেমন্ত উৎসব

মোস্তফা কামাল গাজী

15

শরৎ শেষে হেমন্তের ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতিতে। মাঠে মাঠে আমন ধানের মৌ মৌ গন্ধ। কুয়াশাঘেরা ভোরে শিরশিরে বাতাস শিহরণ জাগিয়ে যায়। সকালের মিঠা রোদে সোনালী ধান আরও চকচক করে ওঠে। দূর্বাঘাসে শিশিরকণা জমে মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করে। হেমন্তের এমন এক সকালে জানালা গলে আসা কোমল রোদে ঘুম ভাঙ্গে শাহেদের। আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে বসে। বাইরের দেয়ালঘেঁষা জামগাছে হাজারো পাখির মেলা বসেছে। তাদের কলকাকলিতে মুখরিত সুন্দর সকালটা। জানালাটা পুরোপুরি খুলে বাইরে তাকায় শাহেদ। দিগন্তজোড়া সোনালী ধানের ক্ষেত। সারি সারি তালগাছ। মজিদ নানা মাঠে যাচ্ছেন কাজ করতে। গরুর পাল নিয়ে যাচ্ছেন কেউ। সকাল সকাল হেমন্তের এমন সৌন্দর্য দেখে মুহূর্তে মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠলো শাহেদের। ওদের বাড়ি পাশের গ্রামে হলেও নানাবাড়িতেই থাকে সারাক্ষণ। বড্ডো দুষ্টুমি করে। দুষ্ট হলে কী হবে, পড়ালেখায় বেশ পাকা। তাই দুষ্টামি করলেও কেউ তেমন কিছু বলে না। নানার বড্ডো আদুরে নাতিটা। যা চায়, তাই এনে দেন। কোনো বায়না আজ পর্যন্ত অপূর্ণ রাখেন নি।
বিছানা ছেড়ে বাইরে এসে হাতমুখ ধোয় শাহেদ। রান্নাঘরে গিয়ে দেখে নানু ওর জন্য মুড়ি আর নাড়– নিয়ে বসে আছেন। খাওয়ার মাঝে নানা এসে জানালেন আজ বিলে যাবেন মাছ ধরতে। শাহেদ তো মহাখুশি! অনেকদিন পর মাছ ধরতে যাওয়া হবে। মাছ ধরায় কী যে আনন্দ!
নানাবাড়ি থেকে একটু দূরেই বড় বিলটা। বর্ষার পানি কমে যাওয়ায় সেখানে প্রতিদিন জমে ওঠে মাছ ধরার মহোৎসব। বেলা বাড়তেই নানার সঙ্গে চললো সেখানে। সঙ্গে নিলো মাছ ধরার নানা সরঞ্জাম। পুরো বিলে ছোট-বড় মাছে কিলবিল করছে। এতো এতো মাছ দেখে শাহেদ খুশিতে আটখানা। গ্রামের আরো অনেকেই এসেছেন মাছ ধরতে। সবার সঙ্গে শাহেদও মাছ ধরতে নামলো। দুপুর পর্যন্ত অনেক মাছ ধরা হলো। কাদায় জুবুথুবু হয়ে একসময় ফিরলো বাড়ি। দুপুরে নিজ হাতে ধরা মাছ দিয়ে গরম ভাত খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর ফেললো শাহেদ।
কয়েকদিন পর শুরু হলো ধান কাটার ব্যস্ততা। পাড়া জুড়ে নতুন ধানের মিষ্টি ঘ্রাণ। এখানে-সেখানে ছড়িয়ে আছে নাড়া থেকে ঝরে যাওয়া ধানের শীষ। শাহেদও নানার সঙ্গে যোগ দিলো ধান কাটার কাজে। কাটা ধান মাথায় করে বাড়ি ফেরে। গরু দিয়ে মাড়ানো শেষে নানু ঢেঁকির সাহায্যে ধান থেকে চাল বের করেন। প্রতিটি বাড়ি থেকে ভেসে আসে ঢেঁকির ধুমুর ধুমুর আওয়াজ। পাড়াজুড়ে শুরু হয়ে যায় নবান্নের আমেজ। শাহেদের এ সময়টা খুব ভালো লাগে। চারদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ। বড়রা ব্যস্ত থাকে ধানের কাজে। আর ছোটরা হেমন্তের বিকেলটা কাটায় খড়ের স্তুপে লুকোচুরি খেলে। চাল থেকে কড়া ঝেড়ে শাহেদের নানু পিঠা তৈরির কাজ শুরু করলেন। হরেক রকমের পিঠা বানাতে নানু বেশ পারদর্শী। চিতই, দুধপুলি, পুলি, পাটিসাপ্টা, ভাঁপা আরো কতো ধরনের পিঠা! এর সঙ্গে নানা পদের ফিরনি তো আছেই। পেটপুরে খেলেও যেনো ক্ষিধে রয়ে যায়। কেবল শাহেদের নানুবাড়িতেই নয়, পাড়ার সকল বাড়িতেই পিঠা তৈরির আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। চারদিকে পিঠা-ফিরনির মিষ্টি ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে। শাহেদের মা-বাবা আর খালা-খালুরা নানাবাড়ি এসেছেন বেড়াতে। সবাই একসঙ্গে হয়ে কী যে মজা হয়! খালাতো আর মামাতো ভাই-বোনেরা মিলে জম্পেশ আড্ডা আর খেলাধুলা হয়। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে গল্প করলেও কেউ কিছু বলেন না। চারদিকে কেবল আনন্দই আনন্দ। শাহেদ চায়, হেমন্তকাল বার বার আসুক এমন আনন্দ নিয়ে। মন চায় হাসিখুশি আর আনন্দে মিশে থাকতে জীবনভর।