সরঞ্জাম নিয়ে নদীর বুকে সহস্রাধিক ডিম সংগ্রহকারী

হালদায় এবার ‘রেকর্ড’ ডিম সংগ্রহের অপেক্ষা

হাটাহাজারী প্রতিনিধি

11

দেশের জোয়ার-ভাটার মিঠা পানির কার্প জাতীয় (রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ) মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে ডিম ছাড়ার অপেক্ষায় মা-মাছ। আজ শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে অমাবস্যা তিথির জো। বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সাথে নদীতে পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে যে কোন মুহূর্তে ডিম ছাড়তে পারে কার্প জাতীয় মা-মাছ। গত কয়েকদিন হালকা বৃষ্টিপাতও হয়েছে। এখন কেবল ভারি বর্ষণ হলেই ডিম সংগ্রহের উৎসবে মেতে উঠবে হালদা পাড়ের ডিম সংগ্রহকারীরা।
এদিকে গত ১৯ মাস হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসনের ব্যাপক অভিযান ও কঠোর নজরদারির কারণে ডিম সংগ্রহকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এবার হালদা নদীতে কার্প জাতীয় মা-মাছ রেকর্ড পরিমাণে ডিম ছাড়তে পারে বলে আশা করেছেন ডিম সংগ্রহকারীরা।
আগে থেকেই কুয়া তৈরি করে ডিম সংগ্রহের জন্য প্রায় তিন শতাধিক নৌকা নিয়ে সহ¯্রাধিক ডিম সংগ্রহকারীরা ডিম ধরার মশারি জাল, বালতিসহ নানা সরঞ্জাম নিয়ে হালদার নদীর বুকে প্রস্তুত রয়েছে।
জানা যায়, প্রতিবছর চৈত্র-বৈশাখ মাসে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হলে হালদা নদীতে কার্প জাতীয় মা-মাছ ডিম ছাড়ে। কিন্তু এ বছর চৈত্র ও বৈশাখ মাসে বৃষ্টি না থাকায় মা-মাছ ডিম ছাড়েনি। চলতি জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম দিকে সম্প্রতি দুদিন মাঝারি ও হালকা বৃষ্টি হয়েছে। আজ থেকে শুরু হওয়া অমাবস্যা তিথিকে সামনে রেখে আকাশে ভারী মেঘের আনাগোনা ও বৃষ্টির আলামত দেখা দেয়ায় হালদা নদীতে কার্প জাতীয় মা-মাছের আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এদিকে আকাশে মেঘের আনাগোনা, বজ্রসহ বৃষ্টির আলামত দেখে ডিম সংগ্রহকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। এ সময়ে নদীতে মা-মাছ ডিম ছাড়লে সে ডিমের পোনা দ্রুত বর্ধনশীল হয়। তাই দূরদূরান্ত থেকে মৎস্য চাষিরা পোনা সংগ্রহ করতে আসেন হালদা নদীর পাড়ে।
গড়দুয়ারা এলাকার ডিম সংগ্রহকারী কামাল সওদাগর জানান, হালদা নদীতে মা মাছের আনোগোনা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনর অভিযানে মা-মাছের নিরাপদ বিচরণের সুযোগ হয়েছে। ফলে নদীতে মাছের মজুদ বৃদ্ধি পেয়েছে। এবার ডিম ভালো পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী তিনি। এছাড়া বৃহস্পতিবার তাদের জালে ৮-১০টি করে নমুনা উঠেছে বলে জানান তিনি।
দক্ষিণ মাদার্শা এলাকার ডিম সংগ্রহকারী আশু বড়ুয়া জানান, হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতার কারণে এবার মা-মাছের মজুদ বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছের আনাগোনা বেশ ভালো। ডিম ছাড়ার পরিমাণও বাড়বে। তাই তারা ডিম সংগ্রহের জন্য আগেভাগে কুয়া তৈরি করে রেখেছেন। সহ¯্রাধিক ডিম সংগ্রহকারী প্রায় তিন শতাধিক নৌকা নিয়ে ডিম ধরার মশারি জাল ও বালতিসহ নানা সরঞ্জাম নিয়ে হালদার পাড়ে প্রস্তুত রয়েছে। এখন কেবল ভারি বর্ষণ হলেই আমরা ডিম সংগ্রহ করবো।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মা মাছের ডিম সংগ্রহের পর রেণু ফোটানোর জন্য উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে হাটহাজারী উপজেলার শাহমাদারি, মাছুনাঘোণা, মদুনাঘাট এবং রাউজান অংশের মোবারকখীল ও পশ্চিম গহিরায় মোট ৫টি সরকারি হ্যাচারি ও ১৬৭টি কুয়া প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয়রা আরও শতাধিক কুয়া তৈরি করেছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ডিম সংগ্রহ ও রেণু ফোটানো, বিক্রিসহ সব বিষয়ে সহায়তা করে থাকে।
সরকারি তথ্য মতে, সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১৫ মে ডিম ছাড়ে হালদায় মা মাছ। আহরণ করা প্রায় ১০ হাজার কেজি ডিম থেকে ২০০ কেজির বেশি রেণু উৎপাদিত হয়েছিল। তবে এবার ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ডিম আহরণের আশা করছে স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারী, প্রশাসন ও হালদা গবেষণা সেন্টারে কর্মরত হালদা বিশ্লেষকরা।
হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মাদ রুহুল আমিন জানান, সরকারি নির্দেশ অনুসারে গত ১৯ মাসেরও বেশি সময় ধরে উপজেলা প্রশাসন হালদা নদীতে কঠোর নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ জাল ও ড্রেজার জব্দ, বালু উত্তোলন ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা বন্ধ রাখার কারণে নদীতে মাছের মজুদ বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীর রক্ষায় প্রশাসন অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তাছাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নদীতে ব্যাপক হারে মাছ অবমুক্ত করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হালদা নদীতে শতাধিক ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তিনি আরও জানান, হালদা রক্ষার জন্য অভিযান চালাতে ৩টি নৌকা নামানো হয়েছে। অভিযানে ১ লাখ ১৫ হাজার ঘনফুট বালু ও ২ লাখ ১৩ হাজার মিটার অবৈধ জাল ধ্বংস করা হয়। বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাইপ, ৯টি ড্রেজার ও ১২টি ইঞ্জিন চালিত নৌকা ধ্বংস করা হয়। জরিমানা আদায় করা হয় ৯০ হাজার টাকা, ৩ জনকে ১ মাস করে কারাদÐ দেওয়া হয়। জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রি করে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকার রাজস্ব আদায় করা হয়। ধারাবাহিক অভিযানের কারণে এবার হালদা নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশাবাদী ইউএনও।
হাটহাজারী সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা রনি জানান, হালদায় এবার বিগত বছরের তুলনায় দূষণ কম থাকায় ডিম বেশি আহরণের আশা করা হচ্ছে। তাই নদীতে প্রতিদিন অভিযান চালানো হচ্ছে। ডিম আহরণের জন্য আমরা সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। পরিবেশ ঠিক থাকলে ঈদের আগেই হালদায় মা মাছ ডিম ছাড়বে বলে আশা করছি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিচার্স ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হালদা গবেষক ড. মো. মঞ্জুরুল কিবরিয়া জানান, এবার হালদা নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার ভালো পরিবেশ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনে কলকারখানা বন্ধ থাকায় দূষণ অনেকটা কমে গেছে। তাছাড়া প্রশাসনের ব্যাপক নজরদারি ও অভিযানের কারণে বালু উত্তোলন, ড্রেজার পরিচালনা বন্ধ রয়েছে। হাটহাজারী পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট ও এশিয়ান পেপার মিল বন্ধ থাকা, ভ‚জপুরে স্থাপিত রাবার ড্যামের কার্যক্রম স্থগিত, মানিকছড়িতে তামাক চাষ বন্ধ থাকায় নদী দূষণ অনেকাংশে কমে গেছে। এ বছর হালদা নদীর পরিবেশ ও পানির অবস্থা ভালো। আজ থেকে অমাবস্যা জো চলছে। যদি এর মধ্যে বজ্রসহ প্রবল বর্ষণ হয়, নদীতে পাহাড়ি ঢলের প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে জো’র মধ্যে কার্প জাতীয় মা-মাছ ডিম ছাড়তে পারে। নানা কারণে এবার হালদা নদীতে ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড পরিমাণ ডিম ছাড়ার ব্যাপারে আশাবাদী আমরা।