পাহাড়ের উৎকৃষ্ট ভেষজ ফল

হারিয়ে যাচ্ছে ‘লুকলুকি’

নুরুল করিম আরমান, লামা

42

‘লুকলুকি’ একটি মিষ্টি ও সুস্বাদু দেশীয় ফল। দেখতে আঙ্গুর ফলের মত। এ ফলটিতে রয়েছে প্রচুর পানি। তাই স্থানীয় ভাষায় এর নাম ‘পাইন্ন্যাগুলা’। বৈজ্ঞানিক নাম ঋরধপড়ধৎঃরধ এধৎমড়সধল. ইংরেজিতে ঈড়ভভবব চষধহঃ বলা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া এই ফল অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। পাকা পাইন্ন্যাগুলা ফল লাল টুকটুকে, তবে কিছুটা বেগুনি রঙের ছোপ রয়েছে। কামড় দিলেই বেরিয়ে আসে রস। স্বাদও বেশ। ভেতরে ৫-৬টি ছোট বিচি থাকে। যে একবার এর স্বাদ নিয়েছে, তিনি বার বার খেতে চাইবেন। ছোট ছেলে মেয়ে ও মহিলাদের কাছে পাইন্ন্যাগুলা খুবই প্রিয়। তবে সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ না থাকায় এ ফল গাছ আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, লুকলুকিতে রয়েছে শতকরা ৬০ ভাগ আয়রন। সালফার ফসফেট ছাড়াও ১০ ভাগ রয়েছে ভিটামিন ‘সি’। অন্যান্য উপাদানও রয়েছে সমভাবে। এটি খেলে হজমশক্তি ও লিভারের কার্যকরিতা বৃদ্ধি পায়। হৃদরোগীদের জন্য এটি উপকারী ভেষজ ওষুধের কাজ করে। তাছাড়া এর পাতা ও ফল ডায়রিয়া রোগের প্রতিরোধক। শুকনো পাতা ব্রংকাইটিস রোগের জন্য বিশেষ উপকারী। এর শিকড় দাঁতের ব্যাথা নিরাময়ে কাজ করে।
পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাড়াছড়ি ছাড়াও চট্টগ্রামের পটিয়া, বোয়ালখালী ও চন্দনাইশের পাহাড়ি ভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে এ ফলের গাছ জন্মায়। বছরের মে মাসের শুরুতে গাছে ফুল আসতে শুরু করে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি পাকা শুরু হয়। তখন এখানের বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি হয় এই ফল। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এই ফল চাষে এখনো কেউ এগিয়ে আসেনি।
মৌসুমি ফল ব্যবসায়ীরা বাগান মালিকদের কাছ থেকে ফলগুলো সংগ্রহ করে দেশের সমতল অঞ্চলে নিয়ে বিক্রি করেন। তবে কিছু কিছু বাগান মালিক নিজেরাই হাটবাজারে বিক্রি করেন। বর্তমানে বাজারে এ ফল প্রতি কেজি ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পার্বত্য লামা পৌর এলাকার ফুটেরঝিরি, নয়াপাড়া, মধুঝিরি, সাবেক বিলছড়ি ও চেয়ারম্যানপাড়া বিভিন্ন পাহাড় প্রায় অর্ধশত পাইন্ন্যাগুলা গাছ দেখা যায়। এছাড়া উপজেলার রূপসীপাড়া, গজালিয়া, লামা সদর, ফাঁসিয়াখালী, আজিজনগর ও সরই ইউনিয়নের বিভিন্ন পাহাড়ে সহস্রাধিক গাছে রয়েছে। এসব গাছে প্রচুর লুকলুকি ধরে।
লামা বাজারে লুকলুকি বিক্রেতা মোহাম্মদ শাহীন জানান, গত ৮ বছর আগে পৌর এলাকার মধুঝিরিস্থ তার বাগানের ১টি লুকলুকি গাছ প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। গত মৌসুমে এ গাছে প্রায় দুই মণ লুকলুকি ধরে। প্রতিকেজি ৯০ টাকা হারে ৭ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করেছি।
তিনি বলেন, এ ফলের গাছ দীর্ঘ মেয়াদী হয়ে থাকে আম, জাম ও কাঁঠালের মতো। বীজ থেকে চারা জন্মে। কলমের মাধ্যমেও এর ফলের চারা উৎপাদন করা যায়।
এ বিষয়ে লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূরে আলম বলেন, লুকলুকি অর্থাৎ পাইন্ন্যাগুলা পাহাড়ি অঞ্চলেই জন্মে। এটি একটি উৎকৃষ্ট ভেষজ ফল। এর ওষুধি গুনাগুন রয়েছে। এখানের আবহাওয়া ও মাটি লুকলুকি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। সরকারি বা বেসরকারিভাবে এখানের পতিত পাহাড়গুলোতে বাণিজ্যিকভাবে লুকলুকি চাষ করা গেলে ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ ফল।