হাম্বা আ আ… হৃদয় হাসান বাবু

30

হাম্বা-হাম্বা ডাক শুনে রামিছা, মাহমুদ, আবরারের মাত্রই লেগে আসা কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তারা ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে। আম্মুওও গরু এসেছে বলে খাট থেকে এক লাফে নেমে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। দেখে ইয়া বড় এক গরু তাদের বাসার সামনে নারিকেল গাছের সাথে বাঁধা। গরুর ইয়া বড় সাইজ দেখে তারা খুশীতে আটকানা। গত দু’দিন তাদের মনটা খুব ছোট হয়েছিলো। সামনের বিল্ডিংয়ের রাইসা মাইসাদের গরু এসেছে, কিন্তু তাদের গরু তখনো আনেনি। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ায় সারাদিন গরু নিয়ে রাইসা মাইসাদের খুশি দেখে মুরসালিন, রামিছা, মাহমুদ, আবরার চুপসে থাকতো। এখন দোরগোড়ায় তাদের গরু এসে গেছে দেখে খুশিতে আটকানা। বিশেষ করে তাদের খুশির মাত্রাটা বেশী হওয়ার অন্য কারণও আছে। তাদের গরুটা ইতোমধ্যেই নিয়ে আসা পাড়ার অন্যান্য গরুর তুলনায় বেশ বড় সাইজ। এটাই তাদের মাত্রারিক্ত খুশির কারণ।
এলাকায় বেশ গরু এসে গেছে। শতের কাছাকাছি প্রায়। কোনটি দেশী, কোনটি প্রতি বছরের ন্যায় পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়া থেকে এসেছে। গত কয়েক বছর থেকে সুদূর নেপাল ও মায়ানমার থেকেও গরু আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে। নেপালি গরু তুলনামূলকভাবে একটু সস্তা পাওয়া যাচ্ছে। তাই নেপালি গরুর দিকে এবার মানুষের ঝোঁকটা দেখা যাচ্ছে বেশী। শিংগুলো মোটাসোটা বাঁকানো। মাথার কপালের দিকটা একটু ফোলা ফোলা। এবার গরু সরবরাহের অপ্রতুলতায় কিছু পাকিস্তানি গরুও বাজারে এসেছে।
মুরসালিনদের ছোট চাচ্চু কচি, পেশায় ব্যাংকার। প্রায় এক যুগ ব্যাংকিং জীবনে হাতের উপর দিয়ে কোটি কোটি টাকা গুনেছেন কিন্তু এর সবটাই গ্রাহকের টাকা। স¤প্রতি প্রমোশন পাওয়ায় মাসে লক্ষাধিক টাকা বেতন। এবছর তিনি এলাকার সবার থেকে বড় গরুটাই কেনার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। তাই একান্নবর্ত্তী ফ্যামেলীর বড় ভাইদের ভাগে যা আসে তা নিয়ে মনে মনে কাউকে কিছু না জানিয়ে গরুর হাটে একাই চলে যান। সেই বিকেলে গরু আনতে গিয়েছেন কিন্তু পছন্দমত গরু খুঁজে পাচ্ছে না। যাও কয়েকটি পেয়েছে তা যেন আকাশ ছোঁয়া দাম হাঁকাচ্ছে বেপরীরা। বেপারীদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন মৌসুমী বেপারী। যারা নাকী শুধু কোরবান এলেই এদিক ওদিক থেকে গরু এনে ব্যবসায় নেমে পড়ে। তাদের অতি মুনাফা করার লোভের কারণে অন্যান্য বেপারীরাও দাম হাকানো শুরু করেছে। তবে এবার গরুর দাম তাও কিছুটা নাগালের মধ্যে আছে। কিন্তু কচির স্মরণ আছে গতবার গরু ব্যবসায়ীদের কারসাজির ফলে ঈদের দু’একদিন আগে গরুর হাটগুলোতে গরুই পাওয়া যায়নি। আর যা ও কিছু গরু ছিলো তা দামে আকাশ ছুঁয়েছে। কেউ গরু কিনেছে কেউ আবার যেন গরুর রশি কিনে এনেছে, এমন বিতিকিচ্ছিরী অবস্থা হয়েছে সেবার। সেই অভিজ্ঞতায় পরিপুষ্ট হয়ে তাই এবার ঈদের তিনদিন আগেই গরু কেনার তোড় জোড় শুরু করেছেন তিনি।
যাক বিকেল থেকে গরুর বাজারের এ মাথা থেকে ও মাথা চষে ফেরে। হাটে আসা হাজার হাজার গরুর মধ্যে পছন্দনীয় গরু মেলাতে পারেনা। গরু পছন্দ হয়তো দাম মেলেনা, দাম নাগালের মধ্যে আছে তো গরুর সৌন্দর্য পছন্দ হয়না। সুন্দর মোটাতাজা পশু দিয়ে কোরবানি দেয়ার নির্দেশনা। তাই পছন্দের নাদুস নুদুস গরু কিনতে এতো তোড়জোড়। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে হয়রান পেরেশান হয়ে যেই গরু কিনার হাল ছেড়ে দিয়ে ঘরে ফিরে যাবে ভাবছে তখন হঠাৎ এক গরুর বেপারির হাঁকডাক শুনে কাছে এগিয়ে যায়। বেচারা জাত বেপারি। সেই যশোর থেকে ২০টি বড় বড় সাইজের গরু এনেছে, এর মধ্যেই ১৭টি বিক্রি হয়ে গেছে। লাভও মুটামুটি হয়ে গেছে। আর মাত্র ৩টি আছে তাই তিনি কিছুটা দাম ছেড়ে দিয়ে বিক্রি করে বাড়ী ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোনায় সোহাগা মিলে গেল। গরু আর দাম দুটোই মনঃপুত হওয়ায় কচির মনে খুশীর ঢেউ খেলে যায়। কালবিলম্ব না করে ব্যাপারির টাকা ও বাজারের হাসিল পরিশোধ করে বাসার পথে রওয়ানা দেয়। ইতোমধ্যেই রাত প্রায় ১০টার কাটা ছুঁই ছঁুঁই। বেপারির পক্ষ থেকে এক লোক গরু নিয়ে আগে আগে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে, আর কচি ও তার বন্ধু পিছন পিছন আসে। গরুকে সাজানোর জন্য হাটে থাকাবস্থায় বড় শিং জোড়ায় সুন্দর একটি মালা পরিয়ে দেয়। পথে চলতে চলতে কত পথচারি গরুর দাম জিজ্ঞেস করেছে তার ইয়ত্তা নেই। একবার কয়েকটি ইচড়েপাকা ছেলে, কাছে এসে বলে, -ও ভাই গরু, গরুর দাম কত?’ দাম বলার আগে তারাই তাদের এমন রসিকতায় দল বেধে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। ঈদের সময় বাজার থেকে গরু কিনে নিয়ে যাওয়ার সময় এমন মজার মজার অনেক ঘটনাই ঘটতে দেখা যায়। গরু নিয়ে বাসার দিকে যাওয়ার সময় ছোট্ট দু’টি কিশোর গরুর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে গরুকে আদর করছে তাদের সুবিধাজনক এলাকায় আসতেই হঠাৎ একটানে গরুর শিং থেকে মালা খুলে ভৌঁ দৌঁড়। কচি’রা কিছু বুঝে উঠার আগেই দুরন্ত দুই কিশোর পগারপাড়। বাসার পিচ্চিরা গরুর শিংয়ে মালা দেখতে পাবেনা এমনটা ভেবে বিছুটা মন খারাপ করে হাঁটছে। অন্যমনস্কভাব এমন সময় রাস্তার বড় গাড়ির হর্ণ শুনে কি এক অজানা ভীতিতে গরুটি এক লাফে রশি টানদিয়ে ছুটতে থাকে রাজপথে। গরু ছুটছে, পিছন পিছন কচিরাও ছুটছে। রাস্তায় মানুষজন অবাক হয়ে তাকিয়ে মজা লুটছে। এর মধ্যে যখন কোন ভাবেই গরুটিকে আয়ত্বে আনা সম্ভব হচ্ছেনা তখন কিছু পথচারি এগিয়ে আসেন। অনেক কসরৎ করে দশাসই শরীরের গরুটিকে পুনরায় বাগে আনা হয়। সতর্ক থাকায় এবার আর কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি।
ঈদের আগে বাকি দিনগুলি মুরসালিন, রাফি, রাহি, রিমি, সিমি, মাহি, রামিছা, মাহমুদ, ছহি আর আবরার খুব যত্ন নেয় গরুর। তারাতো আর কিছু করে না। গরু দেখার জন্য ও ঈদের দিনের বিভিন্ন কাজ করার জন্য স্প্যাশালি দুই জন লোক থাকে। খড়, ভুসি, মাড়, পানি খাওয়ানো থেকে শুরু করে সবকিছু তারাই দেখাশুনা করে। কিন্তু স্কুল বন্ধ হওয়ায় রামিছাদের আর পায় কে। রাতে ঘুমের অংশটুকু ছাড়া প্রায় সারাক্ষণই গরু গরু আর গরু। এই নিয়েই মহাব্যস্ত। যথারীতি ঈদ এলে গরু জবাই করা হয়। জবাই করার জন্য যখন কসাইরা গরুও পা বাঁধতে চাচ্ছে, প্রথম প্রথম ছোটরা খুশি হলেও যখন হুজুর আল্লাহু আকবর বলে গরুর গলায় ছুরি চালিয়ে দেয় আর সাথে সাথে ফিনকি দিয়ে গরম গরম রক্ত বের হয় তখন ছোট্ট রামিছাদের মনটা বিষাদে ভরে যায়। ছোট্ট আদুরে রামিছা বাবার বুকে মুখ লুকায়। ঈদের দিন রাতে ঘুমের ঘোরে ছোট্ট রামিছা কান্না করে উঠে। ওর আম্মু কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে রামিছা বলে, আম্মু আমাদের গরুটা হাম্বা হাম্বা ডাকছে…।