হাফেজ শাহ্ মুহাম্মদ বজলুর রহমান ( রহঃ) সৈয়দ আসলাম উদ্দিন

9

আউলিয়াদের শহর, বার আউলিয়ার পূণ্যভূমি চট্টগ্রাম শরীফে যে অসংখ্য ওলী, পীর-মাশায়েখ তাশরীফ নিয়ে চট্টগ্রাম তথা সারা বাংলাদেশ হেদায়েতের আলো জালিয়েছেন তাদের মধ্যে প্রখ্যাত পীরে দন্তগীর, কুতুবুল আকতাব, গৌছে জমান, হাফেজ হাকিম হযরত মাওলানা শাহ মুহাম্মদ বজলুর রহমান (রা.)’র নাম চির স্মরণীয় হয়ে আছে। একাধারে তিঁনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন, চার তরিকার খেলাফত প্রাপ্ত পীর, সফল রাজনীতিবীদ ও সমাজ সেবক। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের তাঁর অবদান চট্টগ্রাম সূফী মহলে আজও চির ভাস্বর হয়ে আছে। চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া থানার অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী বেতাগীতে ১৮৯২ সালে এক সম্ভ্রান্ত ও বুজুর্গ পরিবারে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হযরত রাহাত আলী (রা.) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.)’র উজ্জ্বল নক্ষত্র হযরত শেখ আহমদ সিরহিন্দ মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রা.) বড় সন্তান হযরত পীর মাসুম শাহ (রা.)’র বংশধর। আর মাতার নাম হযরত কমলজান বিবি (রা.)। তিনি তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।
গ্রামের মক্তবে পবিত্র কুরআন শরীফ শিক্ষা লাভের পর তিনি চট্টগ্রামের কদম মোবারক শাহী মসজিদের হিফজখানা থেকে হিফয শেষ করে মুহসেনিয়া মাদরাসা হতে কৃতিত্বের সাথে ফাজিল পাশ করেন। অতঃপর তিনি ভারতের রামপুর আলীয়া মাদরাসা হতে কুরআন,হাদিস, ফিকহ ও তাফসীরসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে হেকিম আজমল খানের প্রতিষ্ঠিত তিব্বিয়া কলেজ হতে হেকিমী শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ইলমে মা’রিফতের সন্ধানে দাদা হুজুর কেবলা কনৌজ, লখনো, কলকাতা, বার্মা, লাহোর, কানপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুড়ে বেড়িয়েছেন। অবশেষে ঢাকার নারিন্দাস্থ মুশুরীখোলার দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ ফানাফিল্লাহ্ বাকাবিল্লাহ হযরত কেবলা শাহ্ আহছানউল্লা (ক.)’র নিকট ত্বরিকতের দীক্ষা গ্রহণ করেন। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি বেলায়তের উচ্চ মাকামে আরোহন করেন এবং আপন পীর-মুরশিদ তাঁকে কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, মুজাদ্দেদীয়া এ চার তরিকার খেলাফত দানে ধন্য করেন। তাই তিনি মহান আল্লাহর শোকরিয়া আদায়ার্থে বলেন ‘আমার পীর-মুরশীদ হযরত আহছানউল্লাহ (ক.) আমাকে শরীয়ত, তরিকত, হাকিকত, মা’রিফতের সব বিষয়ে পূর্ণ করে আকা মাওলা হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আয়ত্বে এনে তাঁর অনুসারী করে দিয়েছেন। দুনিয়া ও আখিরাতে আমার কোন ভয়ভীতি নেই। আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট।’
আল্লামা হাফেজ হাকিম হযরত মাওলানা শাহ মুহাম্মদ বজলুর রহমান (রা.) ইসলামের সঠিক রূপরেখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা ও আমলকে কোরআন, হাদিস, এজমা, কিয়াসের আলোকে বর্ণনা করতেন। ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা গাজী আজিজুল হক শেরে বাংলা (রা.) কোন বিষয়ে অসুবিধায় পড়লে তাঁর কাছে গিয়েই উহার সমাধান খুঁজে পেতেন। তাই দেওয়ানে আজিজ কিতাবে আমার দাদা হুজুর কেবলা সম্পর্কে এ বলে মন্তব্য করেন যে, ‘তিনি ছিলেন, অতীতকালের অসংখ্য আলেমদের পরিশিষ্ট, পরবর্তীদের দলিল, জ্ঞানীদের অগ্রসেনানী, আরেফদের সরদার, কালের গৌরব, যুগের সর্বোত্তম ব্যক্তি, সমসাময়িকদের ঈর্ষান্বিত জন, সত্যিকার অনলবর্ষী বক্তা, প্রখরবুদ্ধিদীপ্ত মহাজ্ঞানী।’ হাফেজ হাকিম হযরত বজলুর রহমান (রা.) শরীয়তের অত্যন্ত পাবন্দ ছিলেন। যত বড়ই বুজুর্গ হোক না কেন শরীয়তের পাবন্দ না হলে তিনি তাকে পছন্দ করতেন না। তিনি তার মুরিদানদের শরীয়তের বিধি বিধান পালনের প্রতি বিশেষ নির্দেশ দিতেন। বিশেষ করে নামাজের প্রতি তাগাদা দিতেন। নামাজের আরাকান আহকাম, সুন্নাত ইত্যাদি কিভাবে আদায় করতে হয় তা নিজে করে দেখিয়ে দিতেন। হযরত আল্লামা হাফেজ হাকিম বজলুর রহমান (রা.) একজন সফল ও সৎ রাজনীতিবিদ হিসাবেও সুধীমহলে তার বিশেষ পরিচিত ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করায় ১৯২০ সালে গ্রেফতার হন। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, আব্দুর রশীদ চৌধুরী, আল্লামা মাশরেখী প্রমুখ রাজনীতিবিদগণ হুজুরের সঙ্গী ছিলেন।
উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বীর পুরোধা ১৯৪৮ সালে পবিত্র হজ্জ আদায়ের লক্ষে মক্কা মোয়াজ্জমায় গেলে তথায় ১৪ অক্টোবর, ১০ জিলহজ্জ বৃহস্পতিবার বাদে জোহর মিনায় ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই সমাধিস্থ হন। সৌদি আরবের নিয়ম অনুযায়ী দু’বছর পর কবর খনন করতে গেলে তথায় স্বশরীরে সেজদারত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। তৎক্ষনাৎ ঘটনাটি গভর্নরকে অবহিত করা হলে তিনি স্বচক্ষে তা প্রত্যক্ষ করেন এবং পূনরায় মাটি দিয়ে ঢেকে পাথরের উপর তাঁর নাম ও ঠিকানা লিখে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। আজ এই মহান সাধকের পবিত্র ওফাত শরিফ। তাঁর বিশেষ ফয়ুজাত কামনায়।