হাইব্রিডে উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ, হারিয়েছে স্বাদ

ওয়াসিম আহমেদ

66

বেঁচে থাকার জন্য হাইব্রিড, স্বাদ নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য নয়। চাহিদার সাথে তাল মিলাতে গিয়ে হাইব্রিড এসেছে। আমরা খাচ্ছি সেটা ঠিক। তবে তা কোনভাবে বেঁচে থাকার জন্য।’ হাইব্রিড সম্পর্কে এমন মন্তব্যটি করেন মোহাম্মদ আলমগীর চৌধুরী নামের এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী। তিনি আরো বলেন, ‘হাইব্রিড দখল করেছে সবকিছু। সেই স্বাদের খাবার এখন কোথাও খুঁজলেও পাবেন না। মাছে-ভাতে বাঙালি এখন হাইব্রিডে বাঙালি হয়ে গেছে।’
হাইব্রিড বীজ অধিক উৎপাদনশীল হওয়ায় কৃষকরা চাষ করছেন। কিন্তু খাবারে আগের মতো সেই স্বাদ বিলুপ্তির পথে। স্বাদ-গন্ধহীন হাইব্রিড ফসল মানুষ গ্রহণ করছে ঠিক, কিন্তু অনেকটা নিরুপায় হয়ে। এছাড়াও হাইব্রিড চাষে মারাত্মকভাবে সার-কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। যার কারণে মানুষ অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। তথ্য মতে, অধিক উৎপাদন ধরে রাখতে জমিতে যে সার-কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, তা ক্যান্সারসহ নানা মরণব্যাধির অন্যতম কারণ।
দেশে হাইব্রিডের চাষ হওয়ার পর থেকে উৎপাদন অনেকগুণ বেড়েছে। হঠাৎ লোভনীয় উৎপাদন দেখা দেওয়ায় কৃষকরা চরমভাবে ঝুঁকছে হাইব্রিডে। ফলে তাদের আয়ও বেড়েছে অনেক। আগে যে জমিতে ৬০ আরি (৬০০ কেজি) ধান হতো। সেখানে হাইব্রিড চাষের পর থেকে ১২০ আরি থেকে ১৬০ আরি পর্যন্ত (১২০ কেজি থেকে ১৬০ কেজি) ধান হচ্ছে। কিন্তু স্বয়ং কৃষকরাও স্বীকার করেন, উৎপাদন যতটুকু বেড়েছে তারচেয়ে বেশিগুণ কমেছে স্বাদের মাত্রা। দেশিয় খাবারে যে স্বাদ বিদ্যমান ছিলো তা মূলত হাইব্রিডে নেই বললেই চলে। তারপরও খাদ্যসংকট নিয়ন্ত্রণে হাইব্রিডের বিকল্প নেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কৃষিবিদদের মতে, এভাবে হাইব্রিডের মতো বন্ধ্যাবীজ দেশের মাটিতে চাষ করাটা অনেকটা তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্তের মতো। কেননা হাইব্রিড শুধু স্বাদ কমায়নি। কেড়ে নিয়েছে কৃষির উপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ। এভাবে একচেটিয়া হাইব্রিড চাষ করতে না দিয়ে একটা দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষামূলক চাষ করা উচিত ছিলো। এছাড়াও তারা মনে করছেন, হাইব্রিড চাষকে দেশিয় চাষে প্রতিস্থাপন নয়, প্রয়োজন ছিলো বিকল্প হিসেবে প্রচলন করা। হাইব্রিডের পাশাপাশি দেশিয় জাতকে কিভাবে অধিক উৎপাদনশীল করে খাবারে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করা যায় সেভাবে দেশের কৃষি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের আগানো উচিত বলে মন্তব্য করেন তারা।
নগরীর বাজারে অনেক হাইব্রিডের ফসল দেখা যায়। তার মধ্যে একটি হলো পেয়ারা। আজিম অনন নামের সরকারি সিটি কলেজের এক ছাত্র এ সম্পর্কে বলেন, ‘দেশিয় পেয়ারা আমরা গাছে উঠে খেতাম। অনেকসময় গাছেই খেয়ে নিতাম। কেননা পেয়ারার স্বাদ ঐ পেয়ারাতেই রয়েছে। কিন্তু আমরা এখন শহরের মোড়ে মোড়ে দেখি ভ্যানে পেয়ারা বিক্রি করছে। তবে তা বিভিন্ন মসলা ছাড়া খাওয়া সম্ভব না। কেননা এই পেয়ারাগুলোর মধ্যে স্বাদ বলতে কোনো কিছুই নেই। দুটোই পেয়ারা একটি মানুষ গাছে উঠে বা নিজের ইচ্ছায় খায়। আরেকটি মানুষ দেখলে ভিন্ন পরিবেশনায় খেয়ে হয়তো মনকে সান্ত¦না দেয়া ছাড়া আর কিছু নয়।’
২নং গেট এলাকার কর্ণফুলী কমপ্লেক্সে বাজার করতে এসেছেন হোসনে আরা। তিনি বারবার বাজার করার সময় হাইব্রিড না দেশি জিজ্ঞেস করছেন। তার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেশিয় শরীরে বিদেশি খাবার হজম হয় না। খাবারের মূল কথা হলো স্বাদ থাকতে হবে। কিন্তু হাইব্রিডের ফসলে স্বাদ তো দূরের কথা অস্বাদও নেই। সেটা আবার খাবার হতে পারে?’বিএডিসি চট্টগ্রাম বিভাগের যুগ্ম পরিচালক আনন্দ চন্দ্র দাস (বীবি) পূর্বদেশকে বলেন, প্রচলিত উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের ফসলের তুলনায় হাইব্রিড বীজের দ্বারা আবাদী জমিতে শতকরা ২৫-৩০% ফলন বেশি হয়। বর্তমানে কিন্তু দিন দিনই হাইব্রিড চাষের ফলে চাষাবাদের এরিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই হাইব্রিড বীজের মাধ্যমে চাষাবাদে জাতীয়ভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে জাতি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে অতিরিক্ত ফসল রপ্তানি করছে। তাছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হাইব্রিডের কোনো বিকল্প নেই বলেও জানান তিনি।
এছাড়াও চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আমিনুল হক বলেন, স্বাদটা অনেকটা আপেক্ষিক। হয়তো আগের প্রজন্মের কাছে দেশিয় জাতের সব খাবার প্রিয়। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম হাইব্রিডে অভ্যস্ত। সময়ের সাথে হাইব্রিডও মানিয়ে নিবে। এছাড়া বর্তমানে চাহিদারা সাথে উৎপাদনের ভারসাম্য বজায় রাখতে হাইব্রিডের কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।