হলি আর্টিজানে জঙ্গি আক্রমণের মামলার রায় জঙ্গিবাদ নিমূলে দৃষ্টান্ত হোক

11

বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানী ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয়। ওই বর্বর হামলায় ১৭ জন বিদেশিসহ ২২ জন নিহত হন। দেশ কাঁপিয়ে দেওয়া সেই জঙ্গি হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে গতকাল বুধবার। রায়ে সাতজন জঙ্গিকে ফঁসির রায় দেয়া হয়েছে। মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান নামক একজনকে খালাস দেয়া হয়। ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান বুধবার জনাকীর্ণ আদালতে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। বিচারক তাঁর রায়ে বলেছেন, হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মধ্য দিয়ে আসামিরা ‘জঙ্গিবাদের উন্মুত্ততা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার জঘন্য বহিঃপ্রকাশ’ ঘটিয়েছে। সাজার ক্ষেত্রে তারা কোনো অনুকম্পা বা সহানুভূতি পেতে পারে না। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সাত আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রেখে মৃত্যুদÐ কার্যকর করার আদেশ দেওয়া হয় রায়ে। এ রায়ের মাধ্যমে হলি আর্টিজেনের বর্বরতার খলনায়কদের শুধু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি, বরং এ রায় জঙ্গিবাদের আস্ফালন বন্ধে আইনের কঠোরতার প্রতিফলন ঘটেছে। এতে ক্রমান্বয়ে স্তমিত হয়ে যাওয়া জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ একেবারেই বিলুপ্ত হবে বলে আমরা মনে করি। যারা ধর্মের নামে অধর্মের চর্চা করে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে তারাও সংশোধন হয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে-এমনটি প্রত্যাশা করা যায়। একইসাথে আমরা সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, সরকারের কঠোর পদক্ষেপ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আন্তরিকতায় হলি আর্টিজেনের ঘটনার পর থেকে জঙ্গিবাদিরা আর তেমন বড় কোন ঘটনা সংঘটিত করার সাহস পায় নি। সর্বশেষ হলি আর্টিজেনের ঘটনার নায়কদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূরক শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভুমিকা ছিল প্রশংসনীয়। একইসাথে গতকাল রায়ের দিন জঙ্গি আসামীদের মাথায় কথিত আইএস টুপি পরিধানের খবর আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা ও চেকআপের মধ্যেই এ টুপি আসামীদের মাথায় আসা-আমাদের জন্য অশনি সংকেত তো বটেই। সুতরাং আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলে নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো আমাদের আইন-শৃঙাখলা বাহিনীর পক্ষে বা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়, বরং তীক্ষè নজরদারী ও সতর্কতা অবলম্বন করে চিরতরে জঙ্গিবাদের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে।
আমরা জানি, বিশ্বজুড়ে উগ্রপন্থার প্রসারের মধ্যে ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে একদল তরুণের ওই আত্মঘাতী হামলা বাংলাদেশকে বদলে দেয় অনেকখানি। জানা যায়, কেবল মাদ্রাসাপড়ুয়া গরিব ঘরের ছেলেরা নয়, নামিদামি ইংরেজি মাধ্যম কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ধনী পরিবারের সন্তানরাও বাড়ি পালিয়ে নিরুদ্দেশ হচ্ছে; জড়াচ্ছে জঙ্গিবাদের ভয়ঙ্কর পথে। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন “কলঙ্কজনক এ হামলার মাধ্যমে অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশের চরিত্র হরণের চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এর ফলে শান্তি ও স¤প্রীতির জন্য পরিচিত বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুন্ন হয়। বিচারক এ রায়ের মাধ্যমে ভাগ্যহত পরিবারগুলো কিছুটা হলেও স্বস্তি ও শান্তি পাবেন বলে মন্তব্য করেন। আমরা মনে করি, এ রায় দেশকে অনেকখানি জঙ্গিবাদের কলঙ্কমুক্ত করবে। বিদেশেও দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। আইনের সব প্রক্রিয়া শেষ করে এ রায় শিগগির কার্যকর হবে-এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।
দেশে জঙ্গিবাদের চর্চা দৃশ্যমান হয়েছে প্রায় দেড় যুগ আগে আত্মঘাতী বোমা হামলার মধ্য দিয়ে। জঙ্গিরা সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটায় ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে। এরপর কিছুদিন তাদের কর্মকান্ড স্থিমিত ছিল। আবার তারা সক্রিয় হয় ২০১৩ সালে, একটু ভিন্নভাবে। ব্যক্তি বিশেষকে টার্গেট করে চাপাতি হামলা চালাতে শুরু করে তারা। বøগার রাজীব হায়দারকে হত্যার মধ্য দিয়ে এ পর্বের শুরু। এরপর বছর দুয়েকের মধ্যে প্রায় ৫২ জন খুন হন। কোথাও কোথাও আত্মঘাতী বোমা হামলার কৌশলও প্রয়োগ করা হয়।