সড়ক পরিবহন বিল পাস সর্বোচ্চ সাজা ৫ বছর

পূর্বদেশ ডেস্ক

13

বেপরোয়া মোটরযানের কবলে পড়ে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজার বিধান রেখে বহুল আলোচিত ‘সড়ক পরিবহন বিল’ সংসদে পাস হয়েছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে চালকের সাজা দুই বছর বাড়িয়ে এই আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় সরকার।
গতকাল বুধবার সংসদ অধিবেশনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে তোলা হয়। পরে তা পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। খবর বিডিনিউজের
গত ২৯ জুলাই রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশে সাড়া ফেলার পাশাপাশি বিশ্বেও আলোচিত হয়েছিল।
কয়েক বছর ধরে ঝুলে থাকা আইনের খসড়াটি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত ৬ অগাস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায়।
তবে বিল উত্থাপনের সময় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, অনেকে বলেছেন, ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন করেছে বলে এই বিল এসেছে। এটা ঠিক নয়। এই বিলটি দেড় বছর আগে তৈরি করা। অংশীজনদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনার সোনালী ফসল এই সংসদে এসেছে।
বিলে বলা আছে, এই আইনে যাই থাকুক না কেন, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা নিহত হলে এ সংক্রান্ত অপরাধ দন্ডবিধি-১৮৬০ এর এ সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
তবে দন্ডবিধির ৩০৪বি ধারাতে যাই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।
বিলের ১১৪ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন অপরাধের তদন্ত, বিচার, আপিল ইত্যাদির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮) প্রযোজ্য হবে।
দন্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী হত্যা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে। সেই হিসেবে যে কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হত্যা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পাস হওয়া বিলে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা না হলেও মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেছিলেন, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত বা প্রাণহানি ঘটলে তা ফৌজদারি দন্ডবিধির ৩০২ ও ৩০৪ ধারা অনুযায়ী অপরাধ বলে গণ্য হবে।
তবে দন্ডবিধির কোন ধারায় মামলা হবে- তদন্ত কর্মকর্তা তা সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করবেন বলে জানান তিনি।
সংসদে সড়ক পরিবহনমন্ত্রীও বলেন, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ মারে, তাদের শাস্তি দন্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুতরাং শাস্তি কোনোভাবেই কম নয়।
এই আইনটির খসড়া দেখে রোড সেইফটি ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন দাবি করে, এতে মালিকদের স্বার্থই রক্ষা করা হয়েছে।
বিলটি সংসদে পাসের জন্য উত্থাপনের জনমত যাচাইবাছাইয়ের প্রস্তাবের জবাব দিতে উঠে ওবায়দুল কাদের বলেন, যারা জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করেছেন, তাদের বলব, ২৫ বছর অপেক্ষার পর আর কত অপেক্ষা করব? আপনারাই বলছেন, দুর্ঘটনা ঘটছে, যানজট হচ্ছে।
বিলের মধ্যে সব কিছু আনার প্রয়োজন নেই। বিধিপ্রবিধান করে অনেক কিছু সংযোজন করা যাবে, সংশোধন প্রস্তাবগুলো নাকচ করে বলেন তিনি।
বিলে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি এই ধরনের অপরাধ করলে ওই কোম্পানির মালিক, পরিচালক, নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপক, সচিব বা অন্য কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে।
বিলের ৪ ধারাতে বলা আছে, কোনো ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স ব্যবহার করে পাবলিক প্লেসে গাড়ি চালাতে পারবে না বা চালানোর অনুমতি দেওয়া যাবে না।
৫ ধারায় বলা আছে, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্র ছাড়া কেউ গণপরিবহন চালাতে পারবে না বা চালানোর অনুমতি দেওয়া যাবে না।
কোনো ব্যক্তি আইনের ৪ ও ৫ ধারা লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদÐ বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবে।
বিলে বলা হয়েছে, অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ এবং পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বয়স কমপক্ষে ২১ হতে হবে। আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে। আরও বলা হয়েছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স হস্তান্তর করা যাবে না। এই ধারা কেউ লঙ্ঘন করলে তা দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট চালক, কন্ডাক্টটর বা তাদের প্রতিনিধি নিকটস্থ চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে না গেলে এবং নিকটস্থ থানা, ফায়ার সার্ভিস বা হাসপাতালকে অবহিত না করলে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে বিধান রাখা হয়েছে।
এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১ মাসের কারাদন্ড বা ২০ হাজার বা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একইসাথে চালকের এ পয়েন্ট কাটা যাবে।
বিলে বলা হয়েছে, ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ সনদ ব্যবহার অথবা ইকোনোমিক লাইফ অতিক্রান্ত হওয়া মোটরযান চালালে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড দেওয়া যাবে।
বিলে বলা আছে, কোনো ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে বা লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হয়ে গেলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ওই ব্যক্তিকে চালক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে না বা চালানোর অনুমতি দিতে পারবে না। শ্রম আইন অনুযায়ী লিখিত চুক্তি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তিকে গণপরিবহনের চালক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে না।
সরকার বা সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা এবং প্রয়োজনে নির্ধারিত পদ্ধতিতে স্থানীয়ভাবে প্রচারের মাধ্যমে দেশের সর্বত্র বা নির্দিষ্ট কোনো এলাকা, সড়ক, মহাসড়ক, সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার বা টানেলে যে কোনো মেয়াদের জন্য সকল বা যে কোনো মোটরযান চলাচল নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
সরকার বা সরকারের অনুমতি নিয়ে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে সারা দেশে বা যে কোনো এলাকার জন্য যে কোনো মোটরযানের সংখ্যা নির্ধারিত করতে পারবে। কোনো এলাকায় মোটরযানের সংখ্যা নির্ধারিত সংখ্যা বেশি হলে অতিরিক্ত মোটনযানকে চাহিদা অনুযায়ী অন্য এলাকায় চলাচলের অনুমতি দেওয়া যাবে।
মোটরযানের দুর্ঘটনার কারণে কোনো ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত হলে বা মৃত্যুবরণ করলে তাদের ক্ষতিপুরণ দেওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তা তহবিল নামের একটি তহবিল থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাদের উত্তরাধিকারীদের এই তহবিল হতে ক্ষতিপূরণ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে চিকিৎসা খরচ দেওয়া হবে।
বিলে বলা হয়েছে, ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট বরাদ্দ থাকবে। কেউ এই আইনের অধীন অপরাধ করলে পয়েন্ট কাটা যাবে।
কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত হারে ও পদ্ধতিতে মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে আর্থিক সহায়তা তহবিলের জন্য বাৎসরিক বা এককালীন চাঁদা আদায় করবে। মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠান এই তহবিলের জন্য চাঁদা দিতে বাধ্য থাকবে। তহবিলের টাকা তফসিলি ব্যাংকে জমা রাখতে হবে।