স্মৃতিতে অমর আমাদের বাবু মিয়া

আবুল হাসনাত মোহাম্মদ আবদুল্লাহ্

21

আনোয়ারা থানার পূর্ব বারখাইনে আমার নানার বাড়ি। নানার বাড়ি থেকে ক্লাস থ্রী / ফোর পড়েছি পূর্ব বারখাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেই শৈশবে দুই বছর কেটেছে আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক পরিমÐলে। স্বাভাবিকভাবেই সেই রাজনৈতিক ধারার প্রভাব পড়েছে কচি মনে। ১৯৯১ সাল ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আনোয়ারা সংসদীয় আসন থেকে আওয়ামীলীগের প্রার্থী সদ্য প্রয়াত আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। কারো কারো ডাক নামের আড়ালে হারিয়ে যায় আসল পরিচয়। সেই শৈশবেই চিনতাম বাবু মিয়াকে। আখতারুজ্জামান চৌধুরীর কথা জানতাম কিনা খেয়াল নেই।
বাবুমিয়ার বিভিন্ন গুণাবলীর কথা শুনেছি নানুর মুখে। বড় হতে হতে জেনেছি আরো নানা সূত্রে । বিখ্যাতজনকে দেখার কৌতূহল থাকে শিশুমনে। আমারও স্বপ্ন ছিল বাবু মিয়াকে দেখার । নির্বাচনের সময় তাঁকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়।
নির্বাচনী বৈঠক করার জন্য বারখাইনে আসবেন বাবু মিয়া । বৈঠক হবে আমার নানুর বাড়ীতে ।নানুও ছিলেন আনোয়ারা থানা আওয়ামীলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ছিলেন আমৃত্যু নিবেদিত প্রাণ আওয়ামীলীগার। পাড়ায় পাড়ায় সাজ সাজ রব তিনি কখন আসবেন জানা ছিল না কিন্তু সকাল থেকেই রাস্তায় ছিলাম। তাঁকে মন ভরে দেখব এই আশায়। তিনি আসলেন রাত্রে। সারাদিন প্রতীক্ষা শেষে সেই শৈশবে বাবু মিয়াকে প্রথম দেখার স্মৃতি আমার মনের পর্দায় অমলিন। নির্বাচনে বিজয় লাভের পর বাবু মিয়া বারখাইনে একই দিন দু’টি সভায় এসেছিলেন। ঐ দিন সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্যও ঘরে যাইনি। মা বারবার খবর পাঠিয়েছিলেন খাওয়ার সময় ঘরে ফেরার জন্য কিন্তু আবেগ আনন্দে এতই বিভোর ছিলাম যে মার ডাকে সেদিন সাড়া দিইনি, ঘরে যাওয়া হয়নি, খাওয়া হয়নি দুপুরের ভাত।
বিকালে বাবু মিয়া আসলেন। ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় মিটিং হচ্ছে। বাবুমিয়াকে ফুল দেওয়ার জন্য মাইকে আমার নাম ঘোষণা করা হলো পরম আনন্দের ঐ ঘোষণা শুনে মনের মধ্যে ভীতিও সৃষ্টি হয় নার্ভাস হয়ে পড়লেও নিজেকে সামলিয়ে বাবুমিয়াকে ফুল দিলাম। কোন অতিথির হাতে জীবনের প্রথম ফুল দিলাম। ফুল হাতে নিয়ে তিনি নানু ভাইয়ের কাছে আমার পরিচয় জানতে চেয়েছিলন। আমাকে তার দৌহিত্র বলার সময় নানু ভাই বিব্রতবোধ করেন। যার কারণ তিনি আমার আম্মাকে বলেছিলেন। কারণ ছিল ঐ সময় আমার শার্ট প্যান্ট ছিল ময়লা। স্যান্ডেল ছিল ছেঁড়া। আমার ওরকম অবস্থার জন্য আম্মাকে বকাও দিয়েছিলেন নানু। কিন্তু আম্মার তো কিছু করার ছিলনা আমি তো সারাদিন ছিলাম ঘরের বাইরে মিছিলে মিছিলে; ঘুরাঘুরি করি বাবু ভাই’র অপেক্ষায় ।
যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি আমার বড় আন্টির বাসায় বেড়াতে যাই। আন্টিকে সালাম করার পর তিনি আমাকে বললেন ‘বাবু ভাই কেমন আছ’। আন্টি আমাকে বাবু ভাই ডাকার কারণ জানতে চেয়েছিলাম আম্মার কাছে। আম্মা আমাকে বলেন ‘এর আগে যখন আন্টির বাসায় এসেছিলেন, এরুম ওরুম ছুটাছুটি করেছি বাবুভাই বাবুভাই বলে। ঐ কথা স্মরণ করে তোমার আন্টি তোমাকে বাবুভাই বলছে’। হৃদয়ের সঙ্গে মেশা সেই বাবুভাই আর নেই এখবর যখন শুনলাম হৃদয়ের রক্তক্ষরনের তীব্র ব্যথা অনুভব করে অশ্রæ সংবরণ করতে পারিনি।
রাজনীতির এক পর্যায়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সদস্য হয়েছিলাম। প্রিয় নেতা অন্তত একবার আমার বক্তব্য শুনবেন এমন আশা পোষণ করতাম মনে মনে। এই স্বপ্ন পূরণের সুযোগও একবার সৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের একটি সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন চট্রগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, কিন্তুু স্বপ্ন পূরণের সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। কারণ ঐ সভায় প্রধান অতিথি আসার আগেই আমার বক্তব্যের পালা শেষ হয়। বাবু ভাইয়ের সাথে একই গাড়িতে করে বিভিন্ন প্রোগ্রামে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করতাম মনে মনে। সেই সুযোগও সৃষ্টি হয় ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। সেইদিন তত্ত¡াবধায়ক সরকার সংস্কারের দাবিতে জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বাবু ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা চট্টগ্রাম অচল করে দিয়েছিলাম। ঐদিনই কর্ণফুলী ব্রিজ থেকে ট্রাকে করে বাবু ভাইয়ের সাথে আনোয়ারার সমাবেশে যাই। ঐ ট্রাকে আরো ছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মোছলেম উদ্দিন আহমেদ, তৎকালীন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শাকিল ভাই ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সদস্য আহমদুল হক বাবু। বাবু মিয়ার বর্নাঢ্য জীবন বিশ্লেষণ করবেন বিশিষ্টজনরা। তার সম্পর্কে কিছু বলার যোগ্যতা আমার নেই কিন্তু সেই শৈশব থেকে দেখা প্রিয় মানুষটির জীবনের কোন কোন দিক আমাকে বিশেষভাবে অভিভূত করে। তারই পাথরঘাটাস্থ জুপিটার হাউজে বসে চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগের নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করা হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি বাবু ভাইয়ের বাসায় সাইক্লোস্টাইলে কপি করে সমগ্র চট্টগ্রামে প্রচার করা হয়। বাবুমিয়ার এই অবদান যখন বলি ও ভাবি তখন আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই, করি গর্ববোধ।
তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। শুরুতে ছিলেন চট্টগ্রামে। কিন্তু এখানে তিনি থেমে থাকেননি। মুক্তিযুদ্ধকে শানিত করার জন্য তিনি তৎকালীন এম.এন.এ আবু ছালেহ আনোয়ারার ছালেহ আহম্মদ চেয়ারম্যান সহ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে চন্দনাইশের ধোপাছড়ি থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম অতিক্রমকালে স্বাধীনতা বিরোধী মিজু বাহিনী তাদের উপর আক্রমণ করলে তার নেতৃত্বাধীন বাহিনী পাল্টা আক্রমণ করে সেই যুদ্ধে আবদুন নবী শহীদ হন। ভারতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশ সরকারের ত্রান ও পুনর্বাসন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক পরিমÐলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সংগঠনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে নিরলস চেষ্টা চালিয়েছিলেন এই কিংবদন্তী। স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি গণপরিষদের সদস্য হিসেবে সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। আইনপ্রণেতা হিসেবে ’৭২ সালে তিনি যে সংবিধানে স্বাক্ষর করেছিলেন দীর্ঘ ৩৩ বছর সংগ্রাম করে মৃত্যুর পূর্বে আইনপ্রণেতা হিসেবে সে সংবিধানের মূলনীতি ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন। আল্লাহ্ পাকের অশেষ মেহেরবানী, শত কষ্টের মধ্যেও এটি এক প্রশান্তিময় প্রাপ্তি।
বাবুমিয়া ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন তরুণ সৈনিক। সেই স্নেহের সম্মান তিনি রক্ষা করেছেন সমুন্নত রেখেছেন জাতির পিতার আদর্শ। পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের কালো রাত্রের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি চলে যায় খুনিদের নিয়ন্ত্রণে শুরু হয় রাজনীতি কেনাবেচা প্রকাশ্যে- অপ্রকাশ্যে খেলা অনেক নামি দামি রাজনীতিক,উকিল-ব্যারিস্টার সেনা শাসকের ক্রীড়নক রূপে (সু) খ্যাতি ধারন করে পাবলিকের চোখে কৌতুকের পাত্র হয়ে পড়েন। সোনার হরিনের টোপ দেয়া হয়েছিল বাবুমিয়াকেও সেই‘নষ্টে’র ফাঁদে তিনি পা দেননি। অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করেছেন মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব । পঁচাত্তরের পর বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের পুণর্গঠনে তার অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। ছাত্ররাজনীতি থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয়ভাবে অবস্থান আমায়; দেখায় সুযোগ হয়েছে রাজনীতির জন্য বাবুমিয়ার ত্যাগের মাত্রা যে কত বড়। শুধু রাজনীতি নয়, ব্যবসার জগতেও তিনি এক সাহসী কর্মী পুরুষ। তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি ৭৭ জাতির গ্রæপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। এই দেশে তিনিই প্রথম শিল্প গ্রæপ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ৮০’র দশকে বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা বিষয়ে উদ্যোক্তামহলে দোদুাল্যমানতা তখন সেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যার এগিয়ে এসেছিলেন তাদেরই একজন বাবুমিয়া। তিনি দেশে বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অন্যতম পথিকৃৎ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অকুতোভয় যোদ্ধা মরহুম আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আমার শৈশবের স্বপ্ন পুরুষ বাবুমিয়ার বিদেহি আত্মাকে চির শান্তির জান্নাতে জায়গা দান করুন-মহান আল্লাহর দরবারে এই-ই আমার একান্ত প্রার্থনা।
লেখক: ব্যাংকার, প্রাবন্ধিক