স্বাগত ১৪২৬ এসো হে বৈশাখ এসো এসো…

রতন কান্তি দেবাশীষ

49

‘জাগো ফুলে ফলে নব তৃণদলে/তাপস, লোচন মেলো হে।/জাগো মানবের আশায় ভাষায়,/নাচের চরণ ফেলো হে।/জাগো ধনে ধানে, জাগো গানে গানে,/জাগো সংগ্রামে, জাগো সন্ধানে,/আশ্বাসহারা উদাস পরানে/জাগাও উদার নৃত্য।’ রবিঠাকুর এভাবেই আবাহন করেছেন বাংলা নতুন বর্ষকে। বাঙালির জীবনে আজ এক নতুন দিন, নতুন বারতা।
আজ রবিবার পহেলা বৈশাখ, ১৪২৫ সনকে বিদায় জানিয়ে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে যুক্ত হল নতুন বছর ১৪২৬ সন।
জীর্ণ-পুরাতনকে পেছনে ফেলে সম্ভাবনার নতুন বছরে প্রবেশ করেছে বাঙালি জাতি। আজ পহেলা বৈশাখে বর্ণিল উৎসবে মাতবে দেশ। সকালে ভোরের প্রথম আলো রাঙিয়ে দেবে নতুন স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর সম্ভাবনাকে। নগরী জুড়ে রয়েছে বর্ষবরণের নানা আয়োজন।
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে দেশবাসীসহ বাঙালিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন গণনার শুরু মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌর সনের ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয় নতুন এই বাংলা সন।
১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে।
পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। আর ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমে।
দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসা¤প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। উৎসবের পাশাপাশি স্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। যা ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়।
বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে নববর্ষ উদযাপন পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের সার্বজনীন উৎসবে। পহেলা বৈশাখের ভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে ওঠে সারাদেশ। আজ বর্ষবরণের এ উৎসব আমেজে মুখরিত থাকবে বাংলার চারদিক। গ্রীষ্মের খরতাপ উপেক্ষা করে বাঙালি মিলিত হবে তার সর্বজনীন এই অসা¤প্রদায়িক উৎসবে। দেশের পথে-ঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্য, আর উৎসব মুখরতার বিহবলতা।
ধুলোপড়া অতীত পেছনে ফেলে আবহমান কাল ধরেই চলছে বৈশাখ বরণের আনুষ্ঠানিকতা। এর প্রকৃত রূপটি দৃশ্যমান হয় গ্রামে। এক সময় গ্রামবাংলায় চৈত্রসংক্রান্তি ছিল প্রধান উৎসব। বছরের শেষ দিনে তেতো খাবার খেয়ে শরীর শুদ্ধ করতেন কৃষাণ-কৃষাণিরা। নির্মল চিত্তে প্রস্তুত হতেন নতুন বছরে প্রবেশ করার জন্য। তবে রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে বিশেষভাবে দৃশ্যমান হতে থাকে পহেলা বৈশাখ। ষাটের দশকে বাঙালি চেতনাবিরোধী অবস্থানের প্রতিবাদে রমনার বটমূলে শুরু হয় বৈশাখ উদযাপন। এর মাধ্যমে বাঙালি আপন পরিচয়ে সামনে আসার সুযোগ পায়। পরবর্তী সময়ে বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উত্থান ঘটে পহেলা বৈশাখের। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিবসটি বর্তমানে বাঙালির জাতিসত্তায়, চেতনায় ও অনুভবের জগতে গভীরভাবে বিরাজ করছে।
বৈশাখের একটি প্রচন্ড শক্তি আছে। আর বাঙালি এই শক্তিকে ধারণ করে বিদায় করে সব অশুভকে। গড়ে তোলে সত্য আর সুন্দর এক সামাজিক জীবন। শক্তিকে ধারণ করে এগিয়ে যায় প্রগতির পথে।
আজকের উৎসবে থাকবে নানা রং। গ্রাম থেকে শহর, নগর থেকে বন্দর সব জায়গায় আজ দোলা দেবে বৈশাখ। মুড়ি মুড়কি, মন্ডা মিঠাইয়ের সঙ্গে নাচে-গানে, ঢাকে-ঢোলে, শোভাযাত্রায় পুরো জাতি বরণ করবে নতুন বছরকে। বাংলা নববর্ষের উৎসবের কথা এক শিরোনামহীন কবিতায় জীবনের শেষ শয্যায়ও লিখে গিয়েছিলেন কবি সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক। তিনি লিখেছেন ‘আর কিছু নয়/একটুখানি/ওতেই আছে সব/একটি বাঁশির সুরে/আমার বাংলার উৎসব/গ্রামের ঘরে ঢুলি যাচ্ছে/ বের করছে ঢোল/ ঢোলের বুকে বাড়ি পড়ছে/চক্ষু মেলে তোল/এই তো আমার দেশের বাড়ি/এই তো উৎসব।’
আজ বৈশাখে যেসব জায়গায় এখনও হালখাতার ঐতিহ্য রয়েছে সেখানে খোলা হবে বছরের নতুন খাতা। চলবে মিষ্টিমুখ। আর নববর্ষের নাগরিক ঐতিহ্যের দান পান্তা-ইলিশ খাওয়ার উৎসবে মাতবেন অনেকে।
আমাদের পহেলা বৈশাখ পালনের হাজার বছরের ঐতিহ্য রয়েছে। এটি সারা দেশে ছড়িয়ে গেলেও এই উৎসব মূলত এসেছে গ্রামবাংলার মাটির কোল থেকে। সেখানে পহেলা বৈশাখে এখনও নানা আয়োজন হয়। তবে সংস্কৃতির আলো আরও ছড়িয়ে দিতে হলে বারবার ফিরে যেতে হবে সেই গ্রামেই।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলো এ উপলক্ষে প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে ক্রোড়পত্র ও বিশেষ নিবন্ধ। অন্যান্য বছরের মতো এবারও সরকারিভাবে পালন করা হবে পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ উদযাপন চট্টগ্রাম মহানগরীসহ সব উপজেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনসহ আলোচনা সভা ও গ্রামীণ মেলার আয়োজন করবে স্থানীয় প্রশাসন।