বিদায় ২০১৭ : স্বাগত ২০১৮

স্বপ্ন আর সণ্ভাবনার বছর

নিজস্ব সংবাদদাতা

41

জীর্ণ-পুরনো অতীতকে পেছনে ফেলে আজ প্রভাতে শীতের কুয়াশার চাদর ভেদ করে পূর্বদিগন্তে সূর্যোদয় ঘটেছে নতুন আরেকটি বর্ষপরিক্রমায়। বিশ্বজুড়ে অস্থির এক সময়ের মধ্যেই নতুন বছরের আগমন ঘটলো-স্বাগত ২০১৮। শুভ ইংরেজি নববর্ষ। নতুন স্বপ্ন আর সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু হল নতুন বছরের। অপরদিকে, সাফল্য-ব্যর্থতা আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোলাচলে কালের পাতায় ঠাঁই করে আরও একটি বছর-২০১৭ সাল।
বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে এবারের নতুন বছর সম্ভাবনার পাশাপাশি কঠিন চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখেই পথ চলা শুরু করল। কেননা, বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) দায়িত্ব নেয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের যে খসড়া রোডম্যাপ ঘোষণা করেছিল, তাতে নতুন বছরের ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। সেই হিসেবে এ বছরই দলমত ও শ্রেণিপেশা নির্বিশেষে দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে সকলের অংশগ্রহণমূলক শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে ইসিকে। তার মানে, নতুন বছরকে বাংলাদেশের ‘নির্বাচনের বছরও’ বলা চলে! অপরদিকে, বিশ্বায়নের নানামাত্রিক প্রভাব এবং ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা দেশের অর্থনৈতিক খাতেও বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে দেশ ও জনগণকে। অবকাঠামো ও শিল্পখাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিশ্চিতে সরকারের নেয়া নতুন চ্যালেঞ্জ অনুযায়ী মহাকর্মযজ্ঞের দ্বার উন্মোচিত হবে এ বছরেই। কেননা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা না থাকায় শিল্প ও আবাসন খাতের মতই থমকে আছে বিদেশি বিনিয়োগ। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন বছরের শেষদিকে দেশে পৌঁছবে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি। যা প্রতিবছর দ্বিগুণ হারে আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এলএনজি পৌঁছানোমাত্রই শিল্পখাতে শুরু হবে নতুন বিপ্লব। যার বড় প্রভাব পড়বে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ খাতসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে। দেশের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সংস্কৃতিতে অর্জন আর বর্জন, প্রতিরোধ আর প্রতিহত কিংবা সহিংসতা আর দমনের যে ধারাবাহিকতা বিগত সময়ে চেপে বসতে চেয়েছিল, বছর শেষে রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আমাদের সেই রুগ্ন-অসুস্থ পরিস্থিতি থেকে গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে এগিয়ে যাওয়ার দরজা খুলে দিয়েছে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ আশায় বুক বেঁধেছে এই ভেবে যে, দেশে পুনরায় সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের ধারায় ফিরে এলো। সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ এ নির্বাচন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছে। রংপুর সিটি নির্বাচন জাতির প্রত্যাশার পালে আরেক দফা ইতিবাচক হাওয়া লাগিয়েছে বৈকি! সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো সবাই আন্তরিকভাবে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার ভরসা রাখতে পারবে।
বাঙালিসহ বিশ্ববাসীর জীবনে গতকাল বিদায় নিয়েছে ঘটনাবহুল ২০১৭ সাল। বিদায়ী বছরে ব্যক্তি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে অনেক সাফল্য যেমন অর্জিত হয়েছে তেমনি ‘অ-এর সমাহার’ অর্থাৎ অস্থিরতা-অপরাধ-অপ্রাপ্তি-অশান্তির কৃষ্ণমেঘও কম ছায়া ফেলেনি মানুষের জীবনে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর দেশে দেশে সংঘাত-সহিংসতা ও যুদ্ধের নামে মানবসভ্যতা ধ্বংসের দামামা বেজেছে বছরজুড়ে। পেছন ফিরে তাকিয়ে কেবল ইতিবাচক অর্জনের প্রশান্তি আর নেতিবাচক কর্মকা- থেকে শিক্ষাই তো নেয়ার থাকে মানবজাতির। মায়ের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা আর স্বাধীনতা-সর্বভৌমত্বের জন্য বুলেটের সামনে অবলীয়ায় বুক পেতে দেয়ার জন্য বিশ্ব পরিমন্ডলে তাক লাগানো বীরের জাতি বাঙালি বিগত বছরেও অবাক করে দেয়ার মত কয়েকটি অর্জনও নিজেদের করে নিতে সমর্থ হয়েছে। জাতির জনকের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণ ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে বিগত বছরেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, আত্মবিশ্বাস, অসীম সাহস ও দক্ষতা প্রদর্শন এবং বিশ্বব্যাংকের খবরদারিকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের যে স্বপ্ন জাতিকে দেখিয়েছিলেন, ২০১৭ সালের শেষে এসে সেতুর ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর আমরা আজ নিঃসন্দেহ হতে পারি বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে। এমডিজি অর্জনসহ নানা খাতে উন্নতি এবং জাতিসংঘসহ বিশ্বের শীর্ষ শক্তিধর দেশগুলোর প্রশংসার জন্য আমরা গর্ব করতে পারি বাংলাদেশের সামর্থ্য নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর এই সাহসী নেতৃত্বের ফলে আজ বিশ্বসমাজে বাঙালি জাতি সম্পর্কে অতীতের সব ধ্যান-ধারণা ও পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এখন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আইএমএফ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ মর্যাদার সঙ্গে তাদের ঋণ নিয়ে দেনদরবার করতে পারছে। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার রূপকল্প বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে দারিদ্র্যের হার আরও হ্রাস পেয়েছে। মানুষের গড় আয়ু এবং মাথাপিছু আয় তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নয়নের গতিতে বাংলাদেশ আজ সবার চেয়ে এগিয়ে। কৃষি উৎপাদনের সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি সারা বিশ্বের মানদন্ডেই বিস্ময়কর। বাংলাদেশের মানুষ নানাভাবে উৎপাদনমুখী কাজে নিজেদের নিয়োজিত করছে। যারা দেশে পারছে না, তারা বিদেশে গিয়ে আয় করছে। দেরিতে হলেও সদ্যবিদায়ী বছরে বিদেশে শ্রমশক্তির রপ্তানিও বাড়তে শুরু করেছে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করেছে অবিশ্বাস্য দৃঢ়তায়।
নতুনের মধ্যেই নিহিত থাকে অমিত সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সুযোগ করে দেবে নতুন বছর। আমাদের প্রত্যাশা হোক নতুন বছর বয়ে আনবে সমৃদ্ধির বার্তা, প্রতিহিংসামুক্ত গণতান্ত্রিক চেতনাসমৃদ্ধ সুস্থ পরিবেশ। আমরা সব সময় আশাবাদী। আমরা স্বপ্ন দেখি সামনের দিনগুলো সুন্দর হবে। তাই সঙ্গতকারণেই নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জনকল্যাণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে, বৈরিতার পরিবর্তে সৃষ্টি হবে সহযোগিতার পরিবেশ। নতুন বছরে মর্মান্তিক কোনো সড়ক দুর্ঘটনা, ভয়াবহ অগ্নিকা-, শিক্ষাঙ্গনে হানাহানি, লাখো-কোটি মানুষের ভাগ্য বিপর্যয়কারী অনিয়ম-দুর্নীতি আমরা দেখতে চাইনা। নতুন বছরে দেশের মানুষের গড় আয় ও আয়ু আরও বৃদ্ধি পাক। চিকিৎসা ক্ষেত্রে আরো উন্নত প্রযুক্তি ও নির্ভরতার জায়গা তৈরি হোক। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকুক। রাজনৈতিক সমঝোতা সহানুভূতি সহনশীলতার ক্ষেত্রে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়ার মত মত পরিবর্তন আসুক। আসুন, আমরা সকলে মিলেমিশে আমরা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। এগিয়ে যাই সমৃদ্ধির শিখরে। আর তাতেই এগিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। আমরা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব সেই ‘স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ’।