স্টিফেন হকিং : ‘বস্তুকে ছাপিয়ে মন’

94

স্টিফেন হকিং আর রজার পেনরোজ। এই দুই বিজ্ঞানী ছিলেন পরস্পরের সতীর্থ, বন্ধু ও গুণগ্রাহী। দুজনের কয়েক দশক দীর্ঘ বন্ধুত্বের উপস্থিতি থেকে ঝরে পড়লেন হকিং। গত বুধবার ১৪ মার্চ হকিং চলে গেলেন দুনিয়া থেকে তার শারীরিক উপস্থিতির পালা চুকিয়ে। প্রিয় বন্ধু ও সতীর্থ হকিংয়ের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে লিখলেন রজার পেনরোজ ‘দ্য গার্ডিযান’ পত্রিকায়। লেখাটির শিরোনাম : ঝঃবঢ়যবহ ঐধশিরহম// গরহফ ড়াবৎ সধঃঃবৎ : ঝঃবঢ়যবহ ঐধশিরহম – ড়নরঃঁধৎু নু জড়মবৎ চবহৎড়ংব.
স্টিফেন হকিং, যিনি মারা গেলেন ৭৬ বছর বয়সে তার মোটরচালিত হুইল চেয়ারে। মাথাটা একদিকে কাত আর হাত দুটো কন্ট্রোল প্যানেলে কাজ করার জন্য আড়াআড়ি রাখা এমন ছবিই সাধারণ মানুষের কল্পনা ভাসে। এ যেন নিরেট বস্তুকে ছাপিয়ে মনের জয়োল্লাসের প্রতীক। প্রাচীন গ্রিসের দেলসির দৈববাণীতে যেমন যেন তেম্নিভাবেই শারীরিক অপূর্ণতা ও ত্রুটি উসুল হয়ে গেছে প্রায় অতিলৌকিক এক ক্ষমতার বরে। যা বদৌলতে মুক্ত স্বাধীন মন তার ঘুরে বেড়িয়েছে গোটা ব্রহ্মান্ড জুড়ে। আর হঠাৎই হঠাৎই ব্রহ্মান্ডের নানা গোপনকে তিনি হাজির করতেন, যেসব গোপন লুকানো থাকতো লোকচক্ষুর আড়ালে। এভাবে লেখা শুরু করেন পেনরোজ।
এরপর তিনি লেখেন : অবশ্যই এমন ভাবালুতাময় ছবিও তাকে তুলে ধরে বটে, তবে তাতে তার আংশিক পরিচয়ই ফুটে ওঠে। যারা হকিংকে চেনেন, তারাই একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে তার প্রবল উপস্থিতির গুণকীর্তন করতে পারবেন। এমন এক মানুষ যার ছিল জীবনের প্রতি ছিল তার অসীম উচ্ছ্বাস, ছিল রসিক এক মন আর সেইসঙ্গে বিপুল দৃঢ় মনোবল। ছিল প্রবল মানসিক শক্তির পাশাপাশি মানবিক দুর্বলতাও। আর দশটা স্বাভাবিক সাধারণ মানুষের মতোই।


চির অধরাই রয়ে গেল তার নোবেল পুরস্কার!
হকিংকে বিশ্বের সমকালীন তাত্তি¡ক পদার্থবিদদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণদের একজন, এমনকি আইনস্টাইনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। একপ্রকার মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে ভীষণরকম অচল হওয়ার পরও তিনি সম্পূর্ণ সাফল্যের সঙ্গে তার গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে গিয়েছেন। তত্ত্বীয় কসমোলজি আর কোয়ান্টাম মধ্যাকর্ষ হকিংয়ের প্রধান গবেষণাক্ষেত্র।
ষাটের দশকে ক্যামব্রিজে সহকর্মী রজার পেনরোজের সঙ্গে মিলে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব থেকে একটি নতুন মডেল তৈরি করেন হকিং। এছাড়াও হকিং কৃষ্ণ গহবর বা ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের বাইরে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার তত্ত্বের প্রয়োগ করেন। হকিং ছিলেন রয়াল সোসাইটি অব আর্টসের সম্মানীয় ফেলো এবং পন্টিফিকাল একাডেমি অব সায়েন্সের আজীবন সদস্য।
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বহু বিষয়ে তার সফল গবেষণা থাকলেও, এপর্যন্ত তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেননি। কারণ তার তত্ত্বগুলো নোবেল কমিটির স্বীকৃতি পেতে হলে যথেষ্ট পর্যবেক্ষণযোগ্য ড্যাটার প্রয়োজন ছিল। অনেক বিশেষজ্ঞকেই বলতে শোনা গিয়েছে, ভবিষ্যতে হয়ত হকিংয়ের তত্ত¡গুলোর পর্যবেক্ষণযোগ্য ড্যাটা পাওয়া যাবে, কিন্তু ততোদিনে নোবেল পুরস্কার গ্রহণের জন্য হকিংকেই পাওয়া যাবে না। তাদের কথাই সত্য হলো।
হকিংকে সম্মানিত করবার সুযোগ নোবেল কমিটি কখনোই পাবে না আর। মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার দেওয়ার নিয়ম তো নেই! তাই এ পুরস্কারটি চিরকালই অধরা থেকে যাবে এ মহান বিজ্ঞানীর।


হকিংয়ের আলোচিত ১২ উক্তি
১. জীবনে কৌতুক না থাকলে জীবন হয়ে উঠতো বেদনাজর্জর
২. মানুষের মহত্তম অর্জনগুলো এসেছে কথা বলার মধ্য দিয়ে, আর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলো কথা না বলার কারণে।
৩. বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার ক্ষমতা
৪. জ্ঞানের সবচে বড় শত্রু অজ্ঞানতা নয়, বরং জ্ঞানের বিভ্রম
৫. যেসব লোক নিজেদের আইকিউ নিয়ে বড়াই করে, ক্ষতিগ্রস্ত তারাই।
৬. আমার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে যদি আমি রাগ করি তবে তা হবে আমার সময়ের অপচয়মাত্র। জীবনের সঙ্গে সবাইকে মানিয়ে নিতে হয়। আমি সেটা খারাপ করিনি।
৭. তুমি যদি সব সময় রেগে থাকো আর অভিযোগ জানাতে থাকো, তাহলে লোকে তোমাকে আর সময় দেবে না।
৮. ঈশ্বর শুধু জুয়া খেলেনই না, বরং ঘুঁটিটাকে কখনও এমন জায়গায় ছুড়ে ফেলে দেন যে, এটিকে আর খুঁজে পাওয়াই যায় না।
৯.চাইলে নিজের জীবনাটকে শেষ করে দেবার অধিকার যেন ভুক্তভোগীর থাকে। তবে আমার মনে হয় তা হবে বড় এক ভুল। জীবন যতো খারাপ মনে হোক, জীবনে করার মতো, সফলতা লাভের মতো কিছু একটা থাকেই। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ।
১০. সবকিছু আগে করতে চাই-এমন কতো কাজ যে আমার আছে!… ভেঙে যাওয়া বিকল হয়ে যাওয়া কম্পিউটারের জন্য তো কোনো পরকাল নেই। যারা অন্ধকারকে ভয় পায় এই রূপকথা শুধু তাদেরই জন্য।
১১. অকাল মৃত্যুর সম্ভাবনার মধ্যেই গত ৪৯টি বছর ধরে বেঁচে আছি আমি। মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না, তবে মরে যাবার জন্য কোনো তাড়া আমার নেই।
১২. এই মহাবিশ্ব ততোটা মহাবিশ্ব হয়ে উঠতো না, যদি তাতে ভালোবাসার মানুষেরা না থাকতো।

‘রসিক ও খেয়ালী এক বিজ্ঞানী’
দীর্ঘদিন যাবত মোটর নিউরন ডিজিজের সাথে লড়াই করে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত এবং সুপরিচিত একজন বিজ্ঞানীতে পরিণত হওয়া স্টিভেন হকিং ৭৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। তিনি ছিলেন রসবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ, বিজ্ঞানের একজন জনপ্রিয় দূত এবং তিনি সব সময় নিশ্চিত করতেন যেন তাঁর কাজ সাধারণ মানুষেরা সহজে বুঝতে পারেন। তাঁর লেখা বই ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ অনেকটা ধারণার বাইরে বেস্ট সেলার বা সবচেয়ে বিক্রিত বইয়ে পরিণত হয়।
তবে তিনি ছিলেন বেশ খেয়ালী। তার হুইলচেয়ারটিই তিনি প্রায়সময় বেপড়োয়াভাবে চালাতেন। ২০০০ সাল নাগাদ আঘাতের কারণে তিনি বেশ কয়েকবার কেমব্রিজের একটি হাসপাতালে জরুরী বিভাগে চিকিৎসা নেন। ঐসময় একটি অভিযোগ আসে যে তিনি কয়েক বছর যাবত নানাভাবে মৌখিক এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করে এবং হকিং বারবার বলেন যে, তার এসব আঘাত কোন নির্যাতনের কারণে হয়নি। পরে বিষয়টি নিয়ে পুলিশও আর আগায়নি।

স্টিভেন হকিং ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে যখন তিনি তাঁর প্রথম স্ত্রী জেন কে বিয়ে করেন। নিউরন ডিজিজ রোগটি যতটা দ্রুততার সাথে ছড়ানোর আশঙ্কা করা হচ্ছিল তার চেয়ে কম গতিতে ছড়ায় তার শরীরে। ১৯৯৫ সালে তিনি তার সাবেক নার্সকে বিয়ে করেন। ২০০৭ সালে তিনি প্রথম চলৎশক্তি হীন ব্যক্তি হিসেবে একটি বিশেষ বিমানে ওজনশূন্যতার অভিজ্ঞতা নেন। তার ভঙ্গুর শারীরিক অবস্থা সত্ত্বেও তিনি বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার দিতেন। ২০০৯ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছ থেকে প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম গ্রহণ করেন হকিং। ২০১৪ সালে কুইন এলিজাবেথের সাথে দেখা করেন হকিং। একই সালে স্টিফেন হকিংয়ের জীবন নিয়ে তৈরি হয় থিওরি অফ এভরিথিং চলচ্চিত্র। ২০১৭ সলে কেমব্রিজ থেকে সরাসরি তিনি হংকং-এ দর্শকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেন।