‘সোসাইটি পার্ক’ নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিবাসীর বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ

মোহাম্মদ শাহজাহান

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরে পাক ভারত উপমহাদেশে এক সামাজিক বিপর্যয় নেমে আসার ফলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী বেশ কিছু সংখ্যক মুসলিম পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দেশান্তরিত হয়ে আসে। এই সকল পরিবারের অনেকেই বেশ সচ্ছল পরিবার ছিল। তৎকালীন আর্থ-সামাজিক অবস্থায় তাদের বসবাসের জন্য এই সময় একটি আলাদা অভিজাত আবাসিক এলাকার প্রয়োজন দেখা দেয়। এই অবস্থায় তৎকালীন সমাজের কিছু স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ চট্টগ্রামের তৎসময়ে বেশ নিরিবিলি এবং প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ হিসাবে নাসিরাবাদ এলাকায় ১৯৫১ সালে সমবায়ের ভিত্তিতে একটি অভিজাত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার লক্ষ্যে দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিঃ নামে একটি সমবায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। দেশ বিভাগের পরে সম্ভবত: দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিঃ প্রথম সমবায়ী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি তৎকালীন সরকারের সমর্থন নিয়ে প্রায় ৪২.১১ একর জায়গায় ক্রমান্বয়ে একটি মনোরম আবাসিক এলাকা গড়ে তোলে। এই আবাসিক এলাকায় মনোরম পার্ক, স্কুল, মসজিদ প্রশস্থ রাস্তা সহ সব ধরনের আবাসিক সুবিধা বিদ্যমান ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কালে এবং পরবর্তী পর্যায়ে সোসাইটি আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী অবাঙালি পরিবারগুলি দেশ ত্যাগ করার ফলে এই এলাকায় বিপর্যয় নেমে আসে আর আবাসিক বাড়িগুলির প্রায় সবগুলিই জনশুন্য হয়ে পড়ে। কালের ধারাবাহিকতায় ক্রমান্বয়ে এই আবাসিক এলাকাটি শ্রীহীন হয়ে পড়ে। এক সময়ে সোসাইটির যে মনোরম পার্কটি শিশুদের সহ সকলের জন্য একটি বিনোদনের স্থান ছিল ক্রমান্বয়ে সেই পার্কটি একেবারেই জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়ে এবং এখানে বিভিন্ন এলাকার নানা শ্রেণীর লোকজনের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। পরবর্তীতে সুন্দর পার্কটি ক্রমান্বয়ে খেলার মাঠে পরিণত হয় এবং বিভিন্ন স্থানের অসামাজিক যুবকরা এই মাঠে সারাদিন এমনকি রাতেও নানা রকম আড্ডায় লিপ্ত থাকত আর এলাকায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতো। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে। এমনকি পার্কের পার্শ্বে অবস্থিত অংকুর সোসাইটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বহিরাগতদের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে যাতায়াত করতো। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিভিন্ন সময়ে সোসাইটি ব্যবস্থা কমিটি দায়িত্ব পালন করলেও এই পার্কটির উন্নয়ন ও সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ কখনই গ্রহণ করেনি। ফলে সোসাইটি আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী সদস্যদের মনে বেদনা ও হতাশা বিরাজমান ছিল। এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র আলহাজ্ব আ.জ.ম নাছির উদ্দীন দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পার্কটি আধুনিকায়নের মাধ্যমে বহুমূখী ব্যবহারোপযোগী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিল্পগ্রæপ পিএইচপি ফ্যামিলি ও জুমাইরা হোল্ডিংস লিঃ এর আর্থিক সহযোগিতায় গত ২৮শে জুলাই ২০১৮ ইং তারিখে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে পার্কটির আধুনিকায়ন কাজ শুরু করা হয়। পার্কটিতে শিশুদের জন্য আলাদা ‘শিশু পার্ক’ জোন, কিশোর এবং বড়দের বিভিন্ন খেলাধুলার জন্য নেট বেষ্টিত ‘সবুজ মাঠ’ এবং সব শ্রেণীর নারী-পুরুষদের হাঁটার জন্য ওয়াক ওয়ে সহ বয়স্কদের ক্ষণিক বিশ্রামের জন্য টাইলস করা বেঞ্চ এবং ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পার্কে পর্যাপ্ত আলোকায়ন এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফার্স্ট এইড এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সবুজ মাঠটিতে খেলাধুলার পাশাপাশি ঈদের এবং জানাজার নামাজ আদায় ও সামাজিক অনুষ্ঠান করার ব্যবস্থা রয়েছে। পার্কটিতে সময় ভাগ করে ছোটদের শিশু পার্ক ব্যবহার ও সবুজ মাঠে খেলাধুলা, বড়দের ওয়াক ওয়ে ও সবুজ মাঠ ব্যবহার এবং মহিলাদের ওয়াক ওয়ে ব্যবহারের জন্য পৃথক পৃথক ব্যবস্থা করা হয়েছে। পার্কটিতে শৃঙ্খলা রক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচ্ছন্নতার জন্য নিরাপত্তা প্রহরী ও মালী নিয়োগ করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য পার্কটি সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন এই পার্কটি বিগত ৩০ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে উদ্বোধন করেন দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিঃ এর সভাপতি ও সিটি মেয়র আলহাজ্ব আ.জ.ম. নাছির উদ্দীন। সোসাইটির সদস্যগণ, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে বসবাসরত এলাকাবাসী ও বিশিষ্ট নাগরিকগণ এবং তাদের পরিবারের সদস্যগণ পার্ক ব্যবহারের নীতিমালা অনুযায়ী সোসাইটি কার্যালয়ে রেজিস্ট্রেশন করে পার্ক ব্যবহার করতে পারছেন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে বর্তমানে প্রায় ৬০ লক্ষ লোক বসবাস করে এবং এই জনসমষ্টি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। কিন্তু এই বিশাল জনসমষ্টির অবসর বিনোদনের জন্য তেমন কোন সুব্যবস্থা এখনও গড়ে উঠেনি। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র আলহাজ্ব আ.জ.ম. নাছির উদ্দীন দায়িত্ব গ্রহণ করার পর চট্টগ্রাম মহানগরীকে গ্রিন এবং ক্লিন সিটি হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেন এবং সে সকল কার্যক্রম ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। এই সকল কার্যক্রমের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীতে বসবাসকারী জনগণ যাতে অবসর বিনোদন আনন্দের সাথে করতে পারেন সেই লক্ষ্যে তিনি নগরীর বিভিন্ন স্থানে সুদৃশ্য ও সবুজ বনায়নের মাধ্যমে পার্ক স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছেন এবং নগরীর বাসিন্দাগণ বেশ কিছু এলাকায় সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া এরকম দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য দেখতে পাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দৃষ্টিনন্দন সোসাইটি পার্কটি নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি এলাকায় বসবাসকারী শিশু কিশোর এবং বিভিন্ন বয়সী নারী পুরুষদের কাছে ইতোমধ্যে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সংস্কারকৃত এই পার্কটিতে বৈকালিক ও সান্ধ্যকালীন সময়ে মনোরম আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে সোসাইটির সদস্যদের এবং এলাকাবাসীর এক অভূতপূর্ব মিলনমেলায় পরিণত হয়। দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিঃ এর সদস্যদের জন্য সোসাইটি সভাপতি ও সিটি মেয়র আলহাজ্ব আ.জ.ম নাছির উদ্দীন এবং বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি অনন্য উপহার নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকার এই ‘সোসাইটি পার্ক’।
সোসাইটির সাধারণ সদস্যদের সরাসরি ভোট প্রদানের মাধ্যমে বিগত তিন মেয়াদের এক মেয়াদে সম্পাদক ও দুই মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন কালে আলহাজ্ব আ.জ.ম. নাছির উদ্দীন এর নেতৃত্বে দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিঃ এর ব্যবস্থাপনা কমিটি বহুবিদ উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে যা সোসাইটির বিগত দিনে সম্ভব হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেসরকারি সমবায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিঃ আজ দেশের অন্যতম বৃহত্তম আবাসিক সমবায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানটি একটি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন সমবায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিগণিত হয়েছে। এর ফল স্বরূপ ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এর অধীনে সমবায় অধিদপ্তর’ কর্তৃক, বিশেষ শ্রেণী, তাঁতীসহ অন্যান্য পেশা ভিত্তিক সমবায় শ্রেণী/ক্যাটাগরীতে দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিঃ জাতীয় সমবায় পুরস্কার-২০১৭ এ ভূষিত হয়েছে, যা সোসাইটির বিগত ৬৮ বৎসরের ইতিহাসে এই প্রথম।
লেখক : সম্পাদক
দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিঃ, চট্টগ্রাম।