সোনার বাংলা গড়তে আজ বড় বেশি প্রয়োজন মাস্টার নজির আহমদ-এর মতো মানুষের

9

জামাল উদ্দিন

শারীরিক অবস্থা একটুখানি নাজুক। চতুর্দিকে চলছে করোনা নামক মহামারিকে কেন্দ্র করে লকডাউন। অফিসে বসে মুহূর্তে মুহূর্তে শুনতে পাচ্ছি অ্যাম্বুলেন্সর করুণ শব্দ ও মৃত্যুর সংবাদ! এরই মাঝে আবু তালেব বেলাল ভাইয়ের অনুরোধ নজির স্যারকে নিয়ে একটা লেখা দিতে হবে। নজির স্যার অর্থাৎ মাস্টার নজির আহমদ, যিনি দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। যিনি একাধিক স্কুল-কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, তাঁকে নিয়ে দু’কলম লেখা যায় না? দু’পৃষ্ঠাও নয়, বরং দু’টি বই লেখা যেতে পারে। বেলাল ভাই যখন আবদার করেছে কী করা যাবে?
নজির স্যার বলেই খালাস, আমি ভাবতে থাকলাম কোথায় থেকে শুরু করা যায়? আমাদের দেশে যাঁরা বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক অর্থাৎ ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে জন্মেছিলেন তাঁরা ইতিহাসের অনেক বড় বড় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এরমধ্যে অনেকগুলোই মর্মান্তিক আর কিছু সুখের। অতি বেদনাদায়ক ঘটনাগুলোর মধ্যে পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, চল্লিশের মন্বন্তর, ভারত বিভাগ, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলন, আয়ুব খানের সামরিক শাসন, পরপর সামুদ্রিক জলোচ্ছ¡াস ও বন্যা, একাত্তরে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা…। এত কিছু যাঁরা দেখেছেন, সয়েছেন, আত্মস্থ করেছেন এবং ইতিহাসের একেকটা বাঁকে এসে ঘূর্ণিতে ডুবতে ডুবতে বেঁচে গেছেন তাঁরা অবশ্যই ভাগ্যবান। তাঁরা গভীর বেদনার সাথে দেখেছেন কিভাবে তাঁদের সহযাত্রীরা হারিয়ে গেছেন। আমরা স্বীকার করি বা না করি তাঁরা আমাদের ঋণি করে গেছেন। দেশ তাঁদের কাছে ঋণি। এমনই ক্ষণজন্মা এক পুরুষ হলেন বঙ্গপসাগরের উপকুলে জন্মনেয়া মাস্টার নজির আহমদ। তিনি শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কারিগড়, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণতন্ত্রের সৈনিক এবং মানবতাবাদী সমাজ সেবক। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্তত দু’টি কাজের জন্য মাস্টার নজির আহমদের উপস্থিতি ভাস্বর হয়ে থাকবে। এক. তিনি অবহেলিত অঞ্চলে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে সমাজকে এগিয়ে নিতে এ প্রজন্মকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে তোলার ব্যবস্থা করেছেন। দুই. দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেছেন। বৈরী সময় ও প্রতিকুল পরিবেশেও ইস্পাত কঠিন সংকল্প নিয়ে যিনি আমাদের এই বিক্ষুব্ধ উত্তাল সমাজ সমুদ্রে ভেসে চলা একটি সাম্পানের সাম্পানওয়ালাÑ তারই নাম হচ্ছে মাস্টার নজির আহমদ। তিনি চট্টগ্রামের অহংকার, আমাদের গৌরব, একথা বলতে কারো দ্বিধা থাকা উচিত নয়, অন্তত যারা এই সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী। কিন্তু আমরা কী সত্যি সত্যিই এসব কালজয়ী মানুষদের যথাযথ মূল্যায়ণ করতে পারি। নজির স্যার জন্মেছেন বাঁশখালীতে। কিন্তু বাস্তবতা হল বহু ইতিহাস আর স্মৃতির স্থাবর সম্পদ ‘বাঁশখালী’ আগে কখনো গভীরভাবে দেখা হয়নি। এ যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ..
‘দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশির বিন্দু।’
ইতিহাসের বাস্তবতাকে খুঁজতেই গিয়েছিলাম বাঁশখালীতে। পরিকল্পিত লক্ষ্য অর্জনের সাথে এমন কিছু নতুন বিশেষ অর্জন হয়ে গেলো, সে সব অপ্রকাশিত তথ্যের বহিঃপ্রকাশের জন্যই বাঁশখালীর মাস্টার নজির আহমদ-এর আজকের জানা অজানা উপখ্যান। চট্টগ্রাম শহর থেকে দক্ষিণে কর্ণফুলী নদীর ব্রীজ পার হয়ে কুচকুচে কালো পথ বেয়ে আনোয়ারার শেষ সীমানায় শংখ নদী। তার উপর চাঁঁনপুর ব্রিজ। ব্রিজটি পাড় হয়ে কিছুদুর গেলেই তো ইতিহাস আর ব্যঞ্জরণীতে গর্বের সাথে প্রতিষ্ঠিত বাঁশখালীর চাঁনপুর টি স্টেট। প্রায় দেড় শতাব্দী আগে তৎকালীন ব্রটিশ প্রশাসনিক এবং ব্যবস্থাপনায় চানপুর টি স্টেটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৪ সালে। যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। এছাড়া শত ইতিহাসের স্মৃতিবিজরিত বাঁশখালীর এমন কিছু ইতিহাসের বিস্মৃত অবস্থান এবং ঘটনা আছে যা পরিদর্শনে আনায়াসে যে কোন পরিদর্শককে স্মৃতির আহবানে শতাব্দী পিছনের বাস্তবতায় নিয়ে যায়। সুলতানী আমলের বখসী হামিদে মসজিদ, বখশী চামরীর বলিখেলা, ঐতিহাসিক মলকা-মনুর প্রেম উপখ্যান। এখানেই তো জন্মেছিলেন দেশ বরণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর আসহাব উদ্দিন আহমদ, যোগেশ সিংহ, শাহ বদিউল আলম ও ইতিহাসবিদ আবুল করিম সাহেবের মতো ক্ষণজন্মা মানুষ। এই নামগুলোর সাথে আরেকটি নাম যোগ হয়েছে, তিনি হলেন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক মাস্টার নজির আহমদ।
আমাদের এই মায়াবিনি পৃথিবী বহমান কালের মাত্রায় কত সুখ-দুঃখ সফলতা-ব্যর্থতার কাসুন্দি মিশিয়ে রেখেছে, ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে, অসুন্দর ব্যর্থতার অকল্যাণের স্মৃতিতে আমরা যেমন আৎকে উঠি, আশঙ্কায় মুহ্যমান হই, তেমনি এমন কিছু চিরায়ত সুন্দর সফলতা আছে যা শুনতে, বুঝতে, জানতে মোহিত হই, আত্মতৃপ্তিতে হৃদয় বিগলিত হয়ে যায়। সামান্য সংখ্যক এ সফল মানুষগুলোর কৃতকর্মেও বাস্তব এবং প্রয়োগিক প্রমাণিত দলিল ঘাঁটলে নিজকে মানুষ হিসেবে ভাবতে ভাল লাগে, গর্ববোধ করি।
আনন্দ সুখ সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য ত্যাগের প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বের চারদিকে এতো মন্দের মাঝে ভাল কিছুর সংখ্যা খুব কম। টাকার পেছনে মানুষ ছুটছে। ধনী ও গরীবের মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়ে তুলেছে টাকা। আর এই অর্থোপার্জন এমন একটি কৌশল যা সবার আয়ত্তে থাকে না। কেউ সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ উপার্জন করে। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি অপরের ঈর্ষার বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন একজন মানুষ তার চারপাশের নিকৃষ্ট ঈর্ষার গÐি থেকে সহজেই বেরিয়ে আসে। জীবন ও জগৎ সংসারে মহানুভব দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ হাতে গোনা ক’জন থাকেন, যাদের কর্ম ও ত্যাগের ফলে গোটা দেশ ও জাতি উপকৃত হয়।
আমি এখন জানার চেষ্টা করছি শিক্ষক নজির আহমদ সাহেবকে। যতটুকু জেনেছি, তাতে তাঁকে মূল্যায়ণ করা যায় দেশবরেণ্য সমাজহিতৈষী মানুষ হিসেবে। সোনার দেশ গড়তে হলে সোনার মানুষ প্রয়োজন। সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে নিজেকে ভোগ বিলাসে মত্ত না রেখে শ্রদ্ধাস্পদ মাস্টার নজির আহমদ আত্মোৎসর্গের মনোভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তাঁর জন্মসন ১৯৩০-এর দশক থেকে যে কবিতাটি আজো আমাদের বিবেককে শাণিত করে তা হলো,
পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলই দাও
তার চেয়ে সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
ত্যাগেই সুখ, ভোগে নয়। ত্যাগেই পুণ্য, ভোগে পাপ। এই মহামূল্যবান কথাটির সত্য প্রতিষ্ঠা আজকের এই দুর্মূল্যের দিনে মাস্টার নজির আহমদ-ই সম্ভব করেছেন। চোখ ফেরালেই দেখা যায় অনেক মানুষ দু’হাতে টাকা লুটছে। বছরে অনেকবার গাড়ির মডেল বদলাচ্ছে। অভিজাত পাড়ায় একটার পর একটা বাড়ি তৈরি করছে। আর সপরিবারে ভোগের আনন্দে ডুবে গেছে। সত্যিকার মানবধর্ম তো এটি নয়। পৃথিবীতে মানুষ আসে মাত্র কিছু দিন সময় নিয়ে। এর মধ্যেই তাকে অনেক কর্তব্য সম্পাদন করে যেতে হয়। ভোগ আর বিলাসিতা সারাজীবন কোন মানুষেরই কাম্য হতে পারে না। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীরাই অনাড়ম্বর সরল জীবন যাপন করেছেন। আইনস্টাইনের একটি উক্তি হলো, ‘প্রত্যেকের জীবনেই কিছু আদর্শ থাকে যা তার কর্ম প্রচেষ্টা ও বিচার শক্তির গতিপথ নির্ধারণ করে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে নিজেই প্রতিষ্ঠা করলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরপর আর থেমে থাসেননি। দক্ষিণ বাঁশখালীতে কোন কলেজ ছিল না, নৈরাজ্যের ঘনায়মান অন্ধকারে আশার আলোকবর্তিকা জ্বালাতে কেউ যখন এগিয়ে আসলেন না, বঞ্চিত অবহেলিত দক্ষিণ বাঁশখালীর জনগণের জীবনে যখন হতাশার দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে, তখন নজির আহমদ শিক্ষার প্রদীপ হাতে এগিয়ে আসলেন। প্রতিষ্ঠা করলেন ‘মাস্টার নজির আহমদ কলেজ’। তিনিই এই কলেজের স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার।
মানুষ তার আদর্শ নিয়েই এগিয়ে যায়। আদর্শের প্রকারভেদ থাকতে পারে। মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ করা যার আদর্শ, তিনি অবশ্যই মহান। আমাদের পাক-ভারত উপমহাদেশে অনেক হৃদয়বান ব্যক্তি ছিলেন যাঁরা তাদের কল্যাণকর ভূমিকার কারণে অমর হয়ে আছেন। চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্নস্থানে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন যে সব দানবীর, তারা লোকান্তরিত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু এসব অমর কীর্তি কখনো হারাবার কিংবা মুছে যাবার বিষয় নয়। তাদের যে সুমহান আদর্শ ছিল, তাতে আমাদের পূর্বসরীরা যেমনি উপকৃত হয়েছেন, বর্তমানে আমরাও তেমনি উপকৃত হচ্ছি। যুগ যুগ ধরে তাদের অমর দান এ জাতি গ্রহণ করে যাবে।
আজ নতুন এক শতাব্দীতে এরকম একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ মাস্টার নজির আহমদ নিজ জন্মস্থান বাঁশখালী উপজেলার পিচিয়ে পরা মানুষের জন্য নিজস্ব ভান্ডার উজাড় করে কিছু করেছেন কিছু পাবার আশায় নয়, তিনি দেবার ব্রত নিয়ে জাতির কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন। আমাদের দেশে নেতার অভাব নেই, উপদেশ বাণীর অভাব নেই, বুদ্ধিজীবীর অভাব নেই। আর রাজনৈতিক দলের তো সঠিক সংখ্যাই বলা কঠিন। এ দেশে সংস্থা উপদেশ, বড় বড় বক্তৃতা সবাই দিতে জানে, সবাই মাঠে মঞ্চে বক্তৃতা দিয়েও থাকেন, কিন্তু ব্যবহারিক প্রয়োগ করতে আসেন না। মাস্টার নজির আহমদ মিষ্টি কথা দিয়ে মানুষ ভোলাতে চান নি। তিনি চেয়েছেন যুগ যুগ থেকে অবহেলিত নিপীড়িত কিছু মানুষের কল্যাণ সাধন। সভ্য জগতের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার প্রধান উপাদান হলো শিক্ষা। এই শিক্ষার প্রসার লাভের জন্য মানুষকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে তিনি নিজ নাম ও স্ত্রীর নামে গড়ে তুলেছেন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দিয়েই অমর হয়ে থাকবেন মাস্টার নজির আহমদ। যারা শিল্প সাহিত্যের সাধনা করেন, যারা নিজেদের নিয়োজিত রাখেন শিক্ষার বুনিয়াদ গড়ার কাজে, যিনি নিজের লাভ লোকসান খ্যাতি অখ্যাতি সুযোগ-সুবিদার কথা চিন্তা না করে এই সকল কাজের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসেন, আমি এমন লোকের দেখা খুব বেশি পাইনি। আমার সৌভাগ্য আমি এমনই এমন একজন লোকের কথা জানলাম। সৌভাগ্য আরও বেশি এইজন্যই যে, তিনি আমাদেরই মতো সাথারণ একজন মানুষ। এছাড়া যে কর্মের জন্য তিনি হাজার বছর ইতিহাস হয়ে থাকবেন সেই কথাটি এখনো বলা হয়নি। ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ নামক একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ২০১২ সালে এই পত্রিকাটি প্রকাশ করে চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশে সংবাদপত্র জগতে নতুন ধারা সুচনা করেন। প্রকাশের শুরু থেকেই পত্রিকাটি অসাধারণ পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। অবহেলিত জনপদের কথা, জন্মভূমির কথা, জনগণের কথা, সাধারণ মানুষের অভাব –অভিযোগ, দুঃখ-দুর্দশা, দাবী-দাওয়া, সমস্যার কথা সমাজের সামনে তুলে ধরার জন্যই তাঁর এই প্রয়াস। তাঁর প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাটি সার্কলেশনের ক্ষেত্রে যেমন শীর্ষে, বিজ্ঞজন ও সাধারণ পাঠকের কাছে তেমনি সমাদৃত। পত্রিকাটির মূল্যায়নে তাঁকে আধুনিক সংবাদ পত্রের জনকও বলা যায়।
বাঁশখালী উপজেলার নাপোড়া গ্রামের মীর পাড়য় মাস্টার নজির আহমদ-এর পৈত্রিক নিবাস। ১৯২৭ সালে এক শুভ মুহূর্তে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই নজির আহমদ লেখাপড়ার পাশাপাশি জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অলসতার মাঝে না থেকে কঠোর পরিশ্রম করে কিভাবে নিজের পায়ে দাঁড়ানো যায়, সে স্বপ্নই তিনি দেখতেন। শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে এসে মাস্টার নজির আহমদ প্রচÐ পরিশ্রমে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্রতায় তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ৭ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলেন। ব্যবসা-বাণিজ্যই তাদের কর্মক্ষেত্র। গড়ে তুলেছেন আধুনিক শিল্পকারখানা। লাভ করেছেন খ্যাতি। পিতার আদর্শই লালন করেন সন্তানরা । এমন পারিবারিক সংহতি সত্যিই বিষ্ময়কর।
প্রতিষ্ঠা লাভের পরও থেমে থাকেনি তার কাজ। জীবনের সঞ্চিত অর্থ বিত্ত আজ সাধারণ মানুষের মাঝে বিলিয়ে নিজেকে অমর করে রাখার মহৎ কাজ সম্পন্ন করতে যাচ্ছেন। এসব মহৎ কাজে পেছন থেকে যিনি উৎসাহ যোগিয়েছিলেন তিনি হচ্ছেন তাঁরই মহীয়সী পতিœ। মাঠে কর্মী হিসাবে বাবার স্বপ্নে সারথি হয়েছিলেন তাঁদের সুযোগ্য সন্তানগণ। তাঁদের প্রচেষ্টায় বাঁশখালী উপজেলা ছাড়াও চট্টগ্রামে বহু স্কুল, কলেজ, পাঠাগার, মাদ্রাসায় উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামের রাস্তা দিয়ে মানুষ হেঁটে যেতে পারতো না বর্ষার সময়। সে রাস্তাটি নিজ খরচে পাকা করেছেন। ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ করেছেন। লেখাপড়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন স্কুল। স্বল্প পরিসরে মাস্টার নজির আহমদ-এর বৃহৎ কর্মযজ্ঞ আলোচনা শেষ হবে না।
গ্রাম বাংলার অগণিত গরিব মানুষের সহায়তাকারী, বিরল ব্যক্তিত্ব মাস্টার নজির আহমদ দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেছেন। বাঙালি গুণীজনের কদর দিতে জীবিত অবস্থায় করতে জানে না। হয়তো তিনিও পাননি। তিনি আজ থেকে ২৭ জুন ২০১২ সালে পরলোক গমণ করেছেন। আমরা চাই এই গুণীব্যক্তিকে উপযুক্ত সম্মান জ্ঞাপন করা হোক। সমাজ সেবায় এই মহান ব্যক্তির অবদান জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে। সকল হিংসা-দ্বেষ ভুলে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা মাস্টার নজির আহমদ-এর মতো মানুষের হাতকে যেন শক্তিশালী করে তুলি। সোনার বাংলা গড়তে আজ বড় বেশি প্রয়োজন মাস্টার নজির আহমদ-এর মতো মানুষের। যিনি সবাইকে ডেকে বলেছিলেনÑ এখনো যুদ্ধে যাবার সময় আছে, হাত-পা গুটিয়ে নিক্রিয় নিরপেক্ষ হয়ে তথাকথিত সুখময় গৃহকোণে বসার দিন নয়। বেরিয়ে আসার দিন। উজ্জ্বল সূর্যের দিকে এগিয়ে যাবার দিন। রাজা রাম মোহন রায় কিংবা ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর এর মত ক্ষণজন্মা পুরুষরা যুগে যুগে আবির্ভূত হয় না তবুও দেশপ্রেমিক এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ মানুষ বিভিন্ন সমাজে থাকেন বলেই সমাজ টিকে থাকে, সভ্যতা বিকশিত হয়। আমাদের বর্তমান সমাজের এমন মানুষের সংখ্যা বিরল নয়। এমনই একজন মহানুভব ব্যক্তি মাস্টার নজির আহমদ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো যুগ যুগ ধরে সমাজের কল্যাণে সমুজ্ঝল থাকুক।
আমরা ভাবি জীবন চলমান, আসলে মৃত্যুই প্রবহমান। সে-ই জীবনকে টেনে নিয়ে যায়। পরিণতির দিকে লক্ষ্য করুন, মৃত্যু অন্তহীন সমুদ্র আর জীবন তাতে প্রতিনিয়ত বর্ষণ করে যায়। তাকে সজীব করে তোলে। এই যাত্রায় তাঁরাই অমর, মানুষ যাঁদের ভালোভেসে বিদায় দেয়; যাদের অন্তিম যাত্রায় থমকে দাঁড়ায়। টুপি খুলে বলতে চায় ‘হ্যাট অফ ডিয়ার …’।
সর্বশেষ কথা হলো, একটি প্রোজ্জ্বল জীবনকে একটি মলাটের ভেতর বন্দী করে রাখা যতটা অসম্ভব ততটাই অসম্ভব এমন কৃতী, মানবদরদী মানুষ সম্পর্কে দু-চার কথায় ইতিটানা। মাস্টার নজির আহমদ সম্পর্কে কিছু লিখতে গিয়ে মনে হলো, এই প্রচারবিমুখ ব্যক্তিটিকে প্রচারের আলোয় ভাসিয়ে দেয়া উচিৎ ছিল অনেক আগেই।

লেখক: গবেষক ও প্রকাশক