অসাম্প্রদায়িক চেতনার রূপকার

সৈয়দ আহমদুল হক : প্রসঙ্গ প্রেমদর্শন

ড. মো. নূরে আলম

9

সৈয়দ আহমদুল হক পারস্যের অধিকাংশ আধ্যাত্মিক কবিকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। প্রেম, সুরা, শরাব, সাকি, পিয়ালা, মদিরা, পানশালা ইত্যাদি প্রতীকধর্মী শব্দগুলোর তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তাঁর সাহিত্যে ইতিবাচক বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর প্রেম প্রতিভা মূলত সৃজনী প্রতিভা। তিনি এক আশ্চর্য ক্ষমতায় ফারসি সাহিত্যের রূপক শব্দগুলো স্বীয় লেখনীতে এত সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন; স্বীয় জীবনের সমস্ত দুঃখ-চাঞ্চল্য-বিক্ষোভকে অন্তরালে রেখে তিনি এমন এক অনবদ্য সৃষ্টি মানুষের সম্মুখে দাঁড় করিয়েছেন যার রহস্যময় সৌন্দর্য চিরকাল মানুষের সম্মুখে যেন অপূর্বই থেকে যায়। ইহা এক ধরনের সেবা, সেবক আত্মগোপন করে তাঁর প্রকৃতি, রূপ-রসের সেবা মানুষের দরবারে হাজির করেন, যার দৃষ্টান্ত: “ব্যাসের ‘মহাভারত’, বাল্মীকির ‘রামায়ণ’, হোমারের ‘ইলিয়ড’, কালিদাসের ‘শকুন্তলা’, শেক্সপীয়রের ‘ম্যাকবেধ’, মাইকেলের ‘মেঘনাদবধ’, ফেরদৌসির ‘শাহনামা’, রূমীর ‘মসনবী’, সাদীর ‘গুলিস্তান-বোস্তান’, হাফিজের ‘দিওয়ান’ এবং খৈয়ামের ‘রুবাইয়াত’ ইত্যাদি। যাঁরা এ সমস্তের স্রষ্টা তাঁদের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে এ সকল সৌন্দর্যের কক্ষে কক্ষে শৃঙ্গে বিচরণ করা যায়। বড় সৃষ্টির ভিতর যে পূর্ণ তপস্যার এবং সেবায় আত্মসম্মানের ভাব রয়েছে, সমগ্রতার দিক দিয়ে লক্ষ করলে সৈয়দ আহমদুল হক-এর প্রেম দর্শনে তা বিদ্যমান।
সৈয়দ আহমদুল হক সর্ব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি ছিলেন অসা¤প্রদায়িক। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে লেখার পাশাপাশি হিন্দু ধর্ম সম্পর্কেও বহু কিছু লিখেছেন। শুধু তিনিই নন, মুসলমান সাহিত্যিকগণ হিন্দুদের নিয়ে গল্প-কবিতা লেখার বহু উদাহরণ রয়েছে। বিশেষকরে মধ্যযুগ থেকেই হিন্দু মুসলমান সংস্কৃতি এবং উভয় স¤প্রদায়ের মিলনের কবিতা-গান পাওয়া যায়। সপ্তদশ শতকের মুসলমান কবিগণ এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। দৌলতকাজী ও সৈয়দ আলাওলের ‘সতীময়না’, সৈয়দ আলাওলের ‘পদ্মাবতী’, সূফী পন্থীদের জীবাত্মা-পরমাত্ম বিষয়ক নানা পদাবলি, আকবর, লালন ফকির, সৈয়দ মর্তূজা প্রভৃতি কবি সাহিত্যিকগণ প্রকৃষ্ট উদাহরণ। নসরৎ খাঁ এর মত উদার মানসিকতাও মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাছাড়া হিন্দুদের মধ্যেও উদারতার অভাব ছিল না। মুসলমান শাসকের নির্দেশে মহাভারত রচনা করেছেন কবীন্দ্র পরমেশ্বর, যবন হরিদাসকে মুকুটমণি হিসাবে রবণ ও সম্মান করেছেন পরম বৈষ্ণবেরা, কবি কঙ্কনের কালকেতুর গুজরাট নগরীতে মুসলমান প্রজাদের স্থান দেওয়া হয়েছে আদরের সঙ্গে, তাদের জন্য মসজিদও তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল।’ তাই সৈয়দ আহমদুল হক ব্যক্তিগত জীবনাচরণ এবং চিন্তা রাজ্যে ছিলেন একান্ত অসা¤প্রদায়িক কিন্তু ধর্মপরায়ন। তাঁর মধ্যে লোক দেখানো নামাজ, রোজা, বাহ্যাচারের কোনো সংশ্রব ছিল না। এ সকল বাহ্যিক আচরণকে তিনি আদৌ ধর্মের বলে মনে করতেন না। তাঁর মুরলীর বিলাপ গ্রন্থে প্রেমবাদ, ভক্তিবাদ, অদ্বৈতবাদ, আধুনিক বিবর্তনবাদ, সামা-সঙ্গীত ইত্যাদি বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্থান পেয়েছে। সৈয়দ আহমদুল হক এর এমন প্রেম দর্শন ছিল; যে দর্শন তিনি সরাসরি কুরআন থেকে গ্রহণ করেছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে : বলুন হে (মুহাম্মদ সা) ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, তবেই আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন। (সূরা আল ইমরান : ৩১)
হাফেজ, রুমি, সাদি, আত্তার ও খাইয়ামসহ ইরানের সুফি কবিগণ তাঁদের অধিকাংশ লেখনিতে প্রেম, শরাব, সাকি নিয়ে আলোচনা করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম যেমন হাফিজ সম্পর্কে বলেছেন, হাফিজের গান অতল গভীর সমুদ্রের মত। ক‚লের পথিক যেমন তাহার বিশালতা, তরঙ্গ-লীলা দেখিয়া অবাক বিস্ময়ে চাহিয়া থাকে, অতল-তলের সন্ধানী ডুবুরী তেমনি তাহার তলদেশে অজস্র মণিমুক্তার সন্ধান পায়। তাহার উপরে যেমন ছন্দ-নর্তন, বিপুল বিশালতা; নিম্নে তেমনি অতল গভীর প্রশান্তি, মহিমা।…এ গভীরতা আমরা লক্ষ করতে পারি সৈয়দ আহমদুল হক-এর সাহিত্যকর্মে। সৈয়দ আহমদুল হক স্বীয় হৃদপিÐ বিদারণ করে, প্রেমদর্শনের আলোকে প্রেম শরাবের বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি তাঁর প্রেম শরাব নামক প্রবন্ধে অত্যন্ত নিপুণতার সাথে এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। সৈয়দ আহমদুল হক, মাওলানা রুমি এবং ইরানের সুফিসাধকগণ সেই শরাবের কথাই বলেছেন, মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সূরা ইনসানের ২১ নং আয়াতে যে শরাব সম্পর্কে বলেছেন : ‘ওয়া সাক্কাহুম রাব্বুহুম শারাবান তাহুরা’ ‘আল্লাহ বেহেশতিদিগকে এমন এক রকম সুরা (শরাব) প্রদান করবেন, যা হবে বিশুদ্ধ ও পবিত্র। (আল-কুরআন, ৭৬ : ২১)
এটা সাধারণ বা জাগতিক শরাব নয়। জাগতিক শরাব মানুষকে পাপাচারে লিপ্ত করে। ফলে ইসলাম এ শরাবকে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সুফিগণ আল্লাহর প্রেমকে প্রেম শরাব বলে মনে করেন। সুফি সাধকগণ যে শরাব বা পাত্রের কথা বলেন, তা হল নিজের হৃদয় ও ক্বলব। আল্লাহর প্রেমের শরাব মানুষকে বিশুদ্ধ ও পবিত্র করে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়। সৈয়দ আহমদুল হক-এর মতে, যাঁরা আল্লাহর প্রেমে আত্মহারা হয়ে যান, তাঁদের প্রতিনিয়ত নামাযে নিয়োজিত বলে মনে করতে হবে। আউলিয়াগণ এই শ্রেণিভুক্ত। সৈয়দ আহমদুল হক মুরলীর বিলাপ গ্রন্থে পারস্যের সুফি কবি ফরিদুদ্দিন আত্তার রচিত কাব্য থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে প্রেম-দর্শনের বিষয় পরিষ্কার করেছেন। আত্তারের মতে, ‘প্রেম হলো নিজ অস্তিত্ব হতে মুক্ত হওয়া এবং চির সত্যের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করা। প্রেমিকের হৃদয়ে যখন প্রেম আগুন ধরিয়ে দেয়, তখন এটি তার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত প্রেমাস্পদ ছাড়া আর যত কিছু আছে সব কিছুকে পুড়িয়ে ফেলে। বুদ্ধি বলতে থাকে নিজেকে বাড়াও কিন্তু প্রেম বলতে থাকে তুমি নিজের স্বার্থ ত্যাগ কর।’ যেখানে ত্যাগ নেই সেখানে প্রেম নেই। যারা আত্মোৎসর্গ করে তারা অমর। সৈয়দ আহমদুল হক শেখ ফরিদউদ্দিন আত্তারের প্রেমের ক্ষেত্রে এ আত্মোৎসর্গ ও ত্যাগ তিতীক্ষার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সমন্বয় সাধন করেছেন।
সৈয়দ আহমদুল হক আত্তারের মানতেকুত তায়ের অবলম্বনে প্রেমের সাত নগরীর বাণী তাঁর শিশ্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। পারস্য কবি আত্তার প্রেমের সপ্ত নগরী ফানা ফিল্লার জগতে পৌঁছে পাখিরা তাদের আকাক্সিক্ষত সী-মোরগের সাক্ষাৎ লাভ করল। কঠোর সাধনায় তাদের আত্মা শুদ্ধ, স্নাত, কলুষমুক্ত ও পবিত্র হল। যার অন্বেষণে তারা বহু মরুভূমি, নদী-সাগর অতিক্রম করে বিসর্জনের পথে জীবনকে উৎসর্গ করেছে সেই আকাক্সিক্ষত সুন্দর ভাস্বর জ্যোতি দেখতে পেল। তারা দেখল সী-মোরগ শুধু তাদের সম্মুখে নয়; যার দিকে দৃষ্টিপাত করে সেই সী-মোরগ বলে প্রতীয়মান হয়। দ্রষ্টা নিজের দিকে দৃষ্টি পাত করে, দেখে সেও সী-মোরগ। কাকে দেখতে আসল, কি দেখতে আসল! প্রত্যেকেই ভাবতে লাগল প্রকৃত সী-মোরগ কে? দৃষ্ট ও দ্রষ্টা, তুমিত্ব আর আমিত্ব, সবই একাকার হয়ে গেল। তাই মাওলানা রুমি বলেন, আত্তার অতিক্রম করেছেন প্রেমের সাতটি নগরী, আমরা এখনো একটি ছোট গলি মুখী।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, সৈয়দ আহমদুল হক ইরানের মহাকবি হাফিজের ন্যায় কুসুমে, আনন্দে, গানে, যেমন সুন্দর রূপ দেখেছেন, তার চেয়ে বেশি সুন্দরের সন্ধান পেয়েছেন শ্মশানে, মশানে, মানুষের দৈন্যে ও বেদনায়। রুদাকীর ন্যায় রাজা-বাদশাদের প্রসংশা কীর্তনে তাঁর সাধনা কখনও নিয়োজিত হয়নি। দেবদেবীর আরতি গানেও তাঁর কাব্য মুখর হয়ে ওঠেনি। তিনি জগতের বঞ্চিত, বুভুক্ষিত, মজলুমদের বঞ্চনার কথা শুনিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকলের সমন্বয়ে একটি প্রেমময়, উদার, শান্তিপূর্ণ এক অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠা। এ লক্ষ্যে তিনি ধর্মীয় গবেষক ও পÐিতবর্গের যোগসূত্র ঘটিয়ে প্রেমদর্শনের আলোকে সূফিতত্তে¡র প্রচার, প্রসার ও বিকাশের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আল্লামা রুমি সোসাইটি। তাঁর মহান আদর্শ, সূফিতাত্তি¡ক গবেষণা, অধ্যাত্মবাদের সাধনা পদ্ধতি এবং জীবন দর্শন রয়েছে আমাদের মাঝে। তাঁর মতে, কলসিরূপ মানুষ অগাধ সম্পদের কাছে নিজেকে বন্দি করে রাখবে কেন? পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ অর্জন করলেও তো সে নিজে সব খেতে বা ভোগ করতে পারবে না। তাহলে সে কেন সম্পদকে অনুসরণ করছে। যদি সে সত্যিকার খোদা প্রেমিক হয় তাহলে সম্পদই তাকে অনুসরণ করবে। তাঁর মতে, প্রেমের মাধ্যমে ¯্রষ্টার সান্নিধ্যে পৌঁছা সম্ভব। প্রেম দর্শন থেকেই তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনা লাভ করেছেন এবং প্রেম দর্শনকেই নিজ দর্শনের চরম সত্য বলে গ্রহণ করেছেন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক সভাপতি
ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।