সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২)

8

সাহিত্যিক, কবি, সমালোচক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ আলী আহসান ১৯২২ সালের ২৬ মার্চ মাগুরা জেলার আলোকদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। সৈয়দ আলী আহসানকৃত বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের ইংরেজি অনুবাদ সরকারি ভাষান্তর হিসেবে স্বীকৃত। সৈয়দ আলী আহসান পুরনো ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি হাইস্কুল থেকে এন্ট্রান্স (এসএসসি) এবং ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে ঢাকা কলেজ) থেকে এফএ (এইচএসসি) পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ১৯৪৩ সালে স্নাতক (বিএ) এবং ১৯৪৪ সালে স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি কলকাতা চলে যান। পরে যথাক্রমে অল ইন্ডিয়া রেডিও কলকাতা কেন্দ্রে এবং রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রে নিয়ামকরূপে চাকরি করেছেন।
১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমির পরিচালক (প্রধান নির্বাহী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে যোগ দেন। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দাযিত্ব পালন করেন। এরপর আবারও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৭-৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পদে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সুইডেনের নোবেল কমিটির সাহিত্য শাখার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৯ সালে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে অভিষিক্ত হন এবং সে বছরই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। শেষ বয়সে দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সৈয়দ আলী আহসান মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। এ সময় তিনি ‘চেনাকণ্ঠ’ ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন।
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তার বিচরণ ছিল। এর মধ্যে তার কবি পরিচিত উল্লেখযোগ্য। তার কবিতার বইয়ের মধ্যে সেরা বিবেচনা করা হয় ‘একক সন্ধ্যায় বসন্ত’ (১৯৬২) বইটিকে। এ বইয়ের কবিতায় তার স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর টের পাওয়া যায়। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- কাব্যগ্রন্থ : অনেক আকাশ (১৯৬০), সহসা সচকিত (১৯৬৮), উচ্চারণ (১৯৬৮), আমার প্রতিদিনের শব্দ (১৯৭৩) ও প্রেম যেখানে সর্বস্ব। প্রবন্ধ : মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ (আধুনিক যুগ, ১৯৫৬), কবিতার কথা (১৯৫৭), কবিতার কথা ও অন্যান্য বিবেচনা (১৯৬৮), আধুনিক বাংলা কবিতা : শব্দের অনুষঙ্গে (১৯৭০), রবীন্দ্রনাথ : কাব্য বিচারের ভূমিকা (১৯৭৩), মধুসূদন : কবিকৃতি ও কাব্যাদর্শ (১৯৭৬), আধুনিক জার্মান সাহিত্য (১৯৭৬), যখন কলকাতায় ছিলাম (২০০৪), বাংলা সাহিত্যে ইতিহাস মধ্যযুগ এবং শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য। সম্পাদনা : পদ্মাবতী (১৯৬৮) ও মধুমালতী (১৯৭১)। অনুবাদ : ইকবালের কবিতা (১৯৫২), প্রেমের কবিতা (১৯৬০) ও ইতিহাস (১৯৬৮)। ইসলামী গ্রন্থ : মহানবী ও আল্লাহ আমার প্রভু। অন্যান্য : যখন সময় এলো, রক্তাক্ত বাংলা, পাÐুলিপি, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, রজনীগন্ধা, চর্যাগীতিকা, আমাদের আত্মপরিচয় এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ১৯৭৫ সাল ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি। জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর তিনি অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ১৯৬৯ সালে তিনি পাকিস্তান আমলের মর্যাদাবান দাউদ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। এছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পুরস্কার-বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮), শেরে বাংলা পুরস্কার, সুফি মোতাহার হোসেন স্বর্ণপদক (১৯৭৬), একুশে পদক (১৯৮২), নাসির উদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৮৫), মধুসূদন পুরস্কার (১৯৮৫), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮৭) এবং জাতীয় অধ্যাপকরূপে নিযুক্তি (১৯৮৯)। ২০০২ সালের ২৫ জুলাই তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। সূত্র : ইন্টারনেট