সেকাল এবং একালের বড়দিন উৎসব

108

খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে ‘বড়দিন’ হচ্ছে একটা বিশেষ উৎসবের দিন। এই দিনটাতেই খ্রিষ্টান ধর্মের প্রবর্তক মহান যীশু কুমারি মাতা মেরির গর্ভ থেকে পৃথিবীতে এসেছিলেন। দেশ ভাগের আগে পুরো ভারত বর্ষ জুড়ে ইংরেজদের প্রভূত ক্ষমতা ছিল। এসময় ভারতের অনেক বাঙালিও ইংরেজদের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেছিল। তারা ইংরেজদের সাথে তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিতো ইংরেজরাও তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় এবং পারিবারিক অনুষ্ঠান সমূহে যোগ দিতো। সে সময় থেকেই খ্রিষ্টান মিশনারি সমূহ কলকাতাসহ সমগ্র ভারত বর্ষে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারে বেশ তৎপর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ৪৮ পূর্ববর্তি এবং তারপরেও মাদার তেরেসার কারণে কলকাতায় খ্রিষ্ট ধর্ম বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কলকাতার ব্যাপক সংখ্যক দলিত জনগোষ্ঠী খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়ে তাদের ধর্মীয় জীবনাচারণে আমূল পরিবর্তন ঘটায়। ভারতবর্ষে সেথেকেই খ্রিষ্টান ধর্মের আচার আচরণাদি পালন হতে শুরু করে । ইংরেজরা সেসময় ভারতবর্ষে বেশ আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বড়দিন উৎসব পালন করতো। বড়দিনের দিন তারা তাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ধনি গরিব সবাইকে উপহারসামগ্রী বিতরণ করতো এবং নিজেদের বানানো কেকসহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার খাওয়াতো। তৎকালীন সময়ে ভারতবর্ষে কীভাবে বড়দিন উৎসব পালন করা হতো তা কবি ঈশ্বর গুপ্তের ‘বড়দিন’ কবিতার কয়েকটি লাইন থেকে তার ধারণা পাই। তিনি তার বড়দিন কবিতায় লিখেছেন — খ্রিষ্টের জনম দিন, বড়দিন নাম।
বহুসুখে পরিপূর্ণ কলকাতার ধাম।
কেরানি দেওয়ান আদি বড় বড় মেট।
সাহেবের ঘরে ঘরে পাঠাইতেছে ভেট।
ভেটকি কমলা আদি, মিছরি বাদাম,
ভালো দেখে কিনে লয়, দিয়ে ভালো দাম।
ইংরেজ আমলে কলকাতায় বড়দিন উৎসব যে মহা ধুমধামের সহিত পালিতো হতো তা উদ্ভিদ বিজ্ঞানী গিরিশচন্দ্র বসু তার ‘ বিলাতের পাত্র’ বইতে উল্লেখ করেছেন। তিনি এ উৎসবকে বিলাইতি দুর্গোৎসব বলে বর্ণনা করেছেন। খ্রিষ্টান ধর্মাবল্বীদের বিশেষ করে বাঙালি খ্রিষ্টানদের কাছে বড়দিন পালনের দুটি দিক হলো – ২৪ ডিসেম্বর খ্রীষ্টম্যাস ইভের মিডনাইট ম্যাস বা সমবেত প্রার্থনা দিয়ে শুরু আর ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনে গীর্জায় গিয়ে সে প্রার্থনা শেষ করা। আর অন্যটি হলো পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন, সমবেত হওয়া,বন্ধুত্বস্থাপন, উপহার আদান – প্রদান এবং আনুষ্ঠানিক ভোজন পর্ব। ইংরেজ আমলে কলকাতার বড়দিন পালন ছিল কিছুটা ঘরোয়া, কিছুটা উৎসবে জাঁকজমক পরিবেশ। পুরাতন বাড়িঘর নতুন করে সারানো, চুন করা, বিভিন্ন রঙের প্রলেপ লাগানো এবং উৎসবের ঠিক পূর্ব রাত্রে মূল ফটকে কলাগাছ বসানো, পিলারগুলোতে দেবদারু – লতাপাতা জড়ানো, গাঁদা ও অন্যান্য ফুল দিয়ে চারিদিক সাজানো, সর্বোপরি সুদৃশ্য কাগজের রঙিন ফিতে, পতাকা, লাইটিং পেপার সহযোগে উৎসবময় করে তোলা হতো। যার বর্ণনা দিতে গিয়ে ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছেন –
হায় রে সুখের দিন শোভা কব কায়।
ইংরেজ টোলায় গেলে নয়ন জুড়ায়।।
প্রতি গেটে গাঁদা- গার, কারিগুরী তাতে।
বিরজিত ছটা চারু, দেবদারু পাতে।।
সেসময় ভারতবর্ষের প্রতি তিনটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার চাকরির কারণেই হোক কিংবা ব্যবসায়িক কারণেই হোক ইংরেজদের সাথে যুক্ত ছিল ফলে তারা বড়দিন উৎসবটিতে তাদের আনুগত্য প্রকাশ করতো বিভিন্নভাবে। প্রকৃতপক্ষে সেকালে বারোয়ারী দুর্গাপূজাও এতো রমরমা ছিলনা। তাই বড়দিনের উৎসব ছিল চোখে লাগার মতো। ইংরেজ টোলার বনেদি দোকান সেজে ওঠতো। চিনে বাজারের দেশি দোকাবগুলো আলো, ফুল, রঙিন কাগজে মনোহরি হয়ে ওঠতো। উপহারসামগ্রী হিসেবে হিরের আংটি, শাড়ি, মদ, প্রসাধনসামগ্রী, জেম জেলি, আখরোট, কাজুবাদাম, শীতবস্ত্র, চামড়ার সামগ্রীও দেয়া হতো। গয়না গাটি দেয়া নেয়া আড়দিনের প্রধান কাজ ছিল। বড়দিনের রাতে চলতো তাসের আড্ডা। ১৮৩৫ সালে ছাপানো ‘ সিনস্ অ্যান্ড স্কেচো অফ হিন্ডোস্টান অ্যান্ড অ্যাংলো ইন্ডিয়া’ বইতে এমন বড়দিনের বর্ণনা দেয়া আছে। এমন জাঁকজমকপূর্ণ বড়দিনের একটু ভাটা পড়েছিল ওয়ারেন হেস্টিংস ভারত বর্ষে আসার পর। তিনি ভারতবর্ষে এসে ঘোষণা করেছিলেন কোনো চাকরিজীবী ইংরেজ ব্যবসা করতে পারবেননা এতেই ইংরেজদের পকেটে টান পড়েছিল অবশ্য ওয়ারেন হেস্টিংস চলে যাওয়ার পর তা আবার পুরোদমে শুরু হয়েছিল। বড়দিনের সকল নিয়মনীতি ষোলো পূর্ণ হতো সম্মিলিতভাবে ভোজন পর্ব শেষ হওয়ার পর।
অন্তত দশ বারো পদ খাবার দাবার সঙ্গে দেশি বিদেশি পানীয়, এই ছিল সেকালের বড়দিনের খাবারের নমূনা। আর খ্রিষ্টমাস মেনুতে খাবারের প্রধান উপকরণ ছিল ‘ বোরস হেড ‘ অর্থাৎ শুকরের মাথা যা তেজপাতা, রোজমেরি, আপেল অন্যান্য উপাদান দিয়ে পরিবেশন করা হতো। বিশেষ খাবারে থাকতো টার্কি বা ডার্ক রোস্ট, খ্রিষ্টমাস পাই, প্লাম পুডিং চকোলেট,খেজুর, বাদাম ইত্যাদি।
সেকালে বড়দিনের কলকাতায় সবচেয়ে বড় ভোজ হতো বড় লাটের বাংলোয়। বড় বড় রাজ কর্মচারি ও প্রসাশনিক কর্মকর্তারা এই ভোজ সভায় যোগদান করতে পারতো। বড়লাটের বড়দিনের ভোজ সভার আয়োজন প্রসঙ্গে গিরিশ চন্দ্র বসু লিখেছেন – ‘ বালভোগ ‘ দিয়ে ব্রেকফাস্ট শুরু। তারপর ডিনার, সপার এবং শেষে বল ড্যান্স। বর্তমানে বড়দিনের উৎসব কলকাতায় পালিতো হয় প্রায় সার্বজনীনভাবে।
বড়দিনের দিন কলকাতার প্রতিটি ঘরে কেকের আয়োজন চলে সেসাথে চলে খ্রিষ্টমাস ট্রি সাজানোর ধূম। ছোট বড় শান্তা ক্লসে ছেয়ে যায় বাজার। হাসপাতাল, স্কুল, গীর্জায় চলে সমবেত প্রার্থনা। আজ অবশ্য কলকাতার বড়দিন উৎসব ইংরেজদের ট্র্যাডিশনাল ঐতিহ্য অনেকটাই মেনে পুরোপুরি বারোয়ারী উৎসবের চেহারা নিয়েছে। শুধু খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষই নয়, সকল ধর্মের সকল বয়সের মানুষ বড়দিনের উৎসবকে দুর্গাপূজোর আদলে পালন করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে সকল ধর্মের উৎসবগুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে পালন করা গেলে উৎসবের আমেজ হয়ে ওঠবে সার্বজনীন।

লেখক:প্রাবন্ধিক