সৃজনশীল গণিত : শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য করণীয়

মো. আজিজুর রহমান

65

সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে গণিত পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনে শিক্ষক ও অভিভাবকদের করণীয় কয়েকটি দিক নিচে উল্লেখ করা হলো :
শিক্ষকের করণীয় : শ্রেণিতে শিক্ষার্থীকে শেখানোর প্রক্রিয়া হলো বিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। শিক্ষক এই প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষক নির্দেশনা প্রদান করবেন এবং শিক্ষার্থী নির্দেশনা অনুসরণ করে শিখতে সক্ষম হবে। শিক্ষককে অবশ্যই গণিতের ওপর সৃজনশীল জ্ঞানের লালন ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। শিক্ষককেন্দ্রিক কৌশল ব্যবহারের পরিবর্তে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক কৌশল ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ ও আনন্দের সঙ্গে শিখে থাকে। শিক্ষার্থীদের ক্ষমতা ও প্রবণতা এবং পাঠের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শিক্ষক পদ্ধতি ও কৌশল নির্বাচন করে থাকেন।
অংশগ্রহণমূলক পাঠদান : শিক্ষক-শিক্ষার্থী পরস্পরের মধ্যে সমন্বয়ে পাঠদান ফলপ্রসূ হয়ে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক সহায়তাকারী বা সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করবেন এবং শিক্ষার্থীদের চিন্তনদক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করে দেবেন। সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির সফলতা বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক অংশগ্রহণমূলক পাঠদানের ওপর।
বাস্তব উপকরণ ব্যবহার করা : শিখনপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো শ্রেণিকক্ষে বাস্তব উপকরণ ব্যবহার করে শ্রেণিপাঠ আকর্ষণীয় করে তোলা। গণিত শিখন শেখানো কার্যক্রম আরও আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে পাঠ-সংশ্লিষ্ট কোনো বাস্তব ঘটনা বা উদাহরণ বা উপকরণ ছবি, চিত্র, সারণি, চার্ট, পোস্টার কিংবা মডেল ব্যবহার করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক নিজে সহজলভ্য উপকরণ তৈরি করতে পারেন। গণিতে এ পদ্ধতি শিখনের ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর এবং শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্য ও প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
দলীয় কাজ পরিচালনা করা : শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে দলীয় কাজ একটি সফল শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পদ্ধতি। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শিক্ষার্থীর কাছে আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় হলো দলগত কাজ। এর মাধ্যমে শ্রেণির সব শিক্ষার্থীকে পাঠে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়। এতে বিভিন্ন মেধার শিক্ষার্থীর সমন্বয়ের মাধ্যমে শিখন দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের বৈচিত্র্য সৃষ্টিই সৃজনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একক বা জোড়ায় কাজ করানো : শিক্ষক অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে শিখন কার্যক্রম আনন্দদায়ক করার জন্য একক বা জোড়ায় কাজ দিতে পারেন। এতে শিক্ষকের নির্দেশনা অনুসারে দুজনে আলোচনার মাধ্যমে বা এককভাবে তাদের সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অনুশীলনের মাধ্যমে পাঠদান : গণিতে অনুশীলনের বিকল্প নেই। সাধারণত অনুশীলনের মাধ্যমেই অভিজ্ঞতা অর্জন হয়ে থাকে।
কাজেই শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করে থাকেন। ফলে নতুন পরিস্থিতিতে তাদের অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করার যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হবে।
শিক্ষক একজন সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করবেন : শিক্ষক কখনো শিক্ষার্থীকে নিজে কাজ করিয়ে দেবেন না। এতে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। একজন শিক্ষকের কাজ হলো শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা কোনো নির্দিষ্ট পাঠ কীভাবে শিখবে এবং কীভাবে পড়বে তা ঠিক করে দেওয়া। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কাজটি করবে, শিক্ষক শুধু ওই কাজ সম্পাদনে সহায়ক উপায়-উপকরণ প্রদর্শন ও জোগান দেবেন। শিক্ষার্থীদের কাজের মাধ্যমে শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেবেন। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীরাই সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করবে এবং প্রশ্নের সঠিক উত্তর ও পূর্ণাঙ্গভাবে লেখার যোগ্যতা অর্জন করবে।
অভিভাবকের করণীয় : বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা। আপনার সন্তানকে বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি ও শ্রেণির পাঠগ্রহণে উত্সাহ দেওয়া প্রয়োজন। সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দিতে নিজেকে প্রস্তুত করার উপযুক্ত জায়গা হলো শ্রেণিকক্ষ। শ্রেণির কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন কৌশল, অনুশীলন, নম্বর বণ্টন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান দান করেন। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন-উত্তর তৈরির বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে বুঝতে পারবে এবং সে অনুসারে তা প্রয়োগ করতে সক্ষম হবে।
সন্তানকে নোট-গাইড মুখস্থ করা থেকে বিরত রাখা : সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের অনুশীলনের ক্ষেত্রে বাজারের প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের গাইড ও নোট বই সংগ্রহ করা এবং তা মুখস্থ করা থেকে আপনার সন্তানকে বিরত রাখবেন।
বাসায় শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা : প্রত্যেক অভিভাবককে তাঁর বাসার পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষা দীর্ঘস্থায়ী ও বাস্তবভিত্তিক করার জন্য সব শিক্ষার্থীকে বাসায় নিয়মানুসারে অধ্যবসায় করা প্রয়োজন। অভিভাবকের সচেতনতায় বাসায় শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়ে থাকে।
সন্তানের শিখন অগ্রগতির খোঁজখবর রাখা : প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত তার সন্তানের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। শিক্ষা বিষয়ে সর্বশেষ সংস্কার সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত করা। একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে তার সন্তানের বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের শ্রেণির কাজ, বাড়ির কাজ ও অনুশীলনমূলক পরীক্ষার অগ্রগতির খোঁজ রাখা প্রয়োজন। ফলে নিজ নিজ সন্তানেরা তাদের কাজের প্রতি আরও যতœবান হবে। বিদ্যালয়ের কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ ও পরামর্শ প্রদান : অভিভাবক বিদ্যালয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশ উন্নয়নকল্পে তাঁরা শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরামর্শ প্রদান করে থাকেন।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সমস্যা : বিদ্যালয়ের কার্যক্রমের সঙ্গে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন সমস্যা জড়িত। প্রয়োজনে পাঠের বিষয়বস্তুকে বাস্তব জীবনের কোনো ঘটনার সঙ্গে মিল বা সম্পর্ক রেখে তা গল্পাকারে সন্তানদের বলা যেতে পারে। তখনই শিক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং বাস্তব জীবনে নিজেও তা কাজে লাগাতে পারবে।