সুস্থ সবল রোগমুক্ত আগামীর জন্যে চাই পুষ্টিশিক্ষা

এমরান চৌধুরী

7

আজকাল মানুষ বেশ স্বাস্থ্য সচেতন। নিজেকে নিয়ে, নিজের পরিবারকে নিয়ে কীভাবে ভালো থাকা চাই, তা নিয়ে ভাবেন খুব সিরিয়াসলি। আর তাই জোয়ান বুড়ো সবার পছন্দ চিনিমুক্ত খাবার এবং পানীয়। কথা হচ্ছে মানুষ নিজেদের নিয়ে যতটাই ভাবেন না কেন বিক্রেতা কিংবা উৎপাদনকারী যদি ক্রেতার স্বার্থ বা স্বাস্থ্যের কথা না ভাবেন তাহলে মানুষ কখনো সুস্থ থাকতে পারেন না। ভোক্তারা এক রকম চোখ বুঁজেই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে কেনাকাটা করে। মানুষ মনে করে তাঁরা যে মরিচের গুড়ো কিনেছে তাতে অন্তত ইটের গুড়ো মেশানো হয়নি। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা হয় না। একান্ত অনিচ্ছা সত্তে¡ও এক নম্বর জিনিসের দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে তিন নম্বর জিনিস। খাচ্ছি মোটা দাগে ভেজাল, ফরমালিনযুক্ত, অনেক সময় মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যের বাজছে বারোটা, সে সঙ্গে পকেটের বাজছে তেরোটা।
কোন জিনিসে ভেজাল মেশানো হয়েছে, কোথায় কতটুকু ফরমালিন রয়েছে, এক লিটার দুধে কতটা পানি রয়েছে তা মানুষ জানতে না পারলেও ক্রয় করা খাবারগুলো কতটা পুষ্টি সমৃদ্ধ তা কিন্তু একটু সচেতন হলেই জানতে পারা যায়।


কোন ভিটামিনের অভাবে রাতকানা রোগ হয়? দাঁতের নানা সমস্যার জন্য কোন ভিটামিনের ঘাটতি দায়ি? ভিটামিন ডি এর ঘাটতিজনিত রোগগুলো কি কি? কোনো ভিটানের অভাব হলে রক্তাল্পতা দেখা দিতে পারে, এ সব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা কিন্তু মানুষ পেতে পারে একটু মাথা ঘামালেই। আমরা জানি ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে রাতকানা রোগ হয়। ফলে শিশুদের দেখতে অসুবিধা হয়। এ ভিটামিনের ঘাটতি আরো বেশি হলে চোখের উপরের ঝিল্লিটা শুকিয়ে যায়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় জেরাপথ্যালমিয়া বলা হয়। এর অভাব যদি আরো বাড়ে তাহলে কর্ণিয়া আক্রান্ত হয়। এক সময় ঝিল্লিটা ফেটে গিয়ে সম্পূর্ণ কর্ণিয়া নষ্ট হয়ে যায় এবং দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি লোপ পায়। অর্থাৎ নেমে আসে অকাল অন্ধত্ব। ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে আমাদের দেশে এক বিরাট সংখ্যক শিশু দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। এজন্যে সরকারের স্বাস্থ্যবিভাগ কর্তৃক বছরে দুইবার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। ১২-৫৯ মাসের শিশুদের লাল রঙের ২ লক্ষ আই.ইউ. ক্যাপসুল এবং ৬-১১ মাসের শিশুদের নীল রঙের ১ লক্ষ আই.ইউ.ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়।
বাংলাদেশে অপুষ্টিজনিত যে অন্ধত্বের গৃষ্টি হয় তার কারণ প্রধানত দুটো: একটি পরিবেশগত, অন্যটি অর্থনৈতিক। বাংলাদেশে সকল ঋতুতে পুষ্টিকর খাবার সমান পাওয়া যায় না। যেমন বছরের অন্যান্য সময়ে যেরূপ ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ ফল ও শাকসবজি পাওয়া যায়, অবিরাম বর্ষার শেষে গ্রামীণ জনগণ এবং বস্তি এলাকায় সেরূপ পাওয়া যায় না। ফলে বর্ষাকালে ফসল কাটার আগে অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব বেশি হয়। অপুষ্টির অন্যতম কারণ দারিদ্র্য। শহরের বিপুল সংখ্যক বস্তিবাসী মানুষের পাশাপাশি এখনও গ্রামের হাজার হাজার পরিবারের নুন আনতে পানতা ফুরানোর অবস্থা। তাদের পক্ষে নিজেদের ছেলেমেয়েদের পুষ্টিকর খাবারের সংস্থান করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। আবার অনেকেই গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পোষেণ কিন্তু সেই পোষা প্রাণি থেকে উৎপাদিত ডিম-দুধ নিজেদের সন্তানদের খাওয়ানোর বদলে গৃহপালিত পশুপাখির খাদ্য এবং পরিবারের চাল, ডাল, নুন কিনতে ব্যয় করে ফেলেন। ফলে নিজেরা পুষ্টির চাষ করলেও নিজেদের ছেলেমেয়েরা থেকে যায় উপেক্ষিত। বেকারত্ব, অল্প আয়, পরিবার বিভক্তি এ সব কারণেও অনেকে শাকসবজি ও ফলমূলের মতো খাদ্য যোগাড় করতে পারেন না, যা অপুষ্টির জন্য বহুলাংশে দায়ি।
তবে অপুষ্টির সবচেয়ে বড় কারণ বয়স্কদের খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে অজ্ঞতা। এ ছাড়া খাদ্যের রন্ধনগত ত্রুটিও অপুষ্টির জন্য বহুলাংশে দায়ি। অনেকে শাক-সবজি ও ফলমূল কেটে এত বেশি ধুতে থাকেন যে, এ বাড়তি ধোয়ায় অনেক পুষ্টি চলে যায়। ভাত রান্না করার সময় অনেক মহিলাই ভাতের মাড় ফেলে দেন, চালকে বেশি মাত্রায় পুকুরে নিয়ে গিয়ে কচলানো মোটেই ভালো দিক নয়। তাছাড়া অনেক মা-বাবা আছেন যাঁরা শিশুদের হজম ক্রিয়া ব্যাহত হবে ভেবে বঞ্চিত করেন অনেক পুষ্টিকর খাবার থেকে। তাই পুষ্টির জন্য পুষ্টিকর খাবার যতটা না দায়ি তারচেয়ে বেশি দায়ি খাদ্য নির্বাচন, রন্ধন, পরিবেশনগত অসচেতনতা।
একটি শিশু যে উপদানে বা পরিমাণে খাদ্য পাওয়ার কথা তার খাবারে যদি সবকটি উপাদানের ঘাটতি থাকে তখন তার দেহে প্রত্যেকটি উপাদানের অভাবজনিত অপুষ্টি দেখা দেয়। এ অবস্থাকে বলা হয় পুষ্টিহীনতা। খাদ্যে কোনো উপাদান বেশি ও কোন উপাদান কম থাকলে এবং এ অবস্থা বেশিদিন চলতে থাকলে যে অপুষ্টি দেখা দেয় তাকে বলা হয় বিরুপ পুষ্টি। এ বিরুপ পুষ্টির জন্য শিশুদের কোয়াশিয়রকর বা গা ফোলা রোগ এবং ম্যারাসমাস বা হাড্ডিসার রোগ হয়। এছাড়া ছয়টি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত সুষম খাদ্যের যেকোন একটি উপাদানের অভাব দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকলে ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্যগত একটি মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক কিছুই নয়। এ ধরনের অপুষ্টিকে নির্দিষ্ট বা বিশেষ অপুষ্টি বলা হয়। এ ধরনের অপুষ্টিতে শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া ছাড়াও গলগÐ, রিকেটস, বেরিবেরি, রক্তাস্বল্পতা প্রভৃতি রোগ দেখা দেয়।
অনেক শিক্ষিত, সচেতন মানুষও মনে করেন পুষ্টিকর খাবার মানেই দামি খাবার। কথাটা কোন অর্থেই সত্য নয়। দামি খাবার থেকে যে কম দামি খাবারে বেশি পুষ্টি পাওয়া যায় তা জানা গেছে অনেক আগেই। দামি খাবার হিসেবে আমরা যে সব খাবারের নাম উল্লেখ করতে পারি তাহলো চিকন চাল, পাউরুটি, বড় মাছ, মাংস, ডিম, মুধ, পনির, আঙুর, কমলা, আপেল, নাশপাতি, ঘি মাখন। বিপরীতে সস্তা খাবার হিসেবে উল্লেখ করতে পারি মোটা চাল, আটা, গোল আলু, মিষ্টি আলু, ছোটোমাছ, বিভিন্ন প্রকারের ডাল, সবুজ ও রঙিন শাক-সবজি, কুল, আমলকি, আমড়া, কামরাঙা, বাতাবী লেবু, আনারস, কলা, পেঁপে, আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, তেল।
উপর্যুক্ত তালিকা থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, যাঁরা পুষ্টিকর খাবার বলতে শুধু দুধ, ডিম, মাংস, মাছকে বোঝেন তাদের ধারণা কিন্তু সঠিক নয়। কম দামি অথচ বেশি পুষ্টিমানসম্পন্ন অনেক খাবারই আমাদের ধারে কাছে পাওয়া যায়। মাছের মধ্যে মলা, ঢেলা মাছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ রয়েছে। একটিমাত্র আমলকিতে যে পরিমাণ ভিটামিন এ এবং সি রয়েছে এক কেজি আপেলেও তা নেই। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যোপযোগী আপেলে মাত্র ৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি রয়েছে, পক্ষান্তরে একই পরিমাণ আমলকিতে থাকে ৪৬৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি। আমাদের বাড়ির আঙিনায়, খোলা জায়গায়, ডোবা, খানা-খন্দকের ধারে অযতেœ অবহেলায় বেড়ে ওঠে যে কচু শাক তার পুষ্টিমান প্রশ্নাতীত। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যোপযোগী কচু শাকে থাকে ১২০০০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন। পক্ষান্তরে একই পরিমাণের দুধে থাকে মাত্র ৮ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন। জেনে রাখা দরকার ১ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন = ১.৬৬ আই. ইউ ভিটামিন এ। আবার ১ আই. ইউ ভিটামিন এ = ০.৩০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ। ধারে কাছে ভিটামিন ‘এ’ এর অবাধ ছড়াছড়ির পরও প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে শিশুদের খাওয়াতে হচ্ছে ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতিজনিত রোগ প্রতিরোধের জন্য ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল, যা বিদেশ থেকে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে ক্রয় করতে হয়। অথচ আমরা একটু সচেতন, সতর্ক হলেই এই মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারি। যা অন্য কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে রাখতে পারি একটি বিরাট ভূমিকা। আমাদের মনে রাখতে হবে যে সন্তানকে আমরা পৃথিবীর মুখ দেখিয়েছি তার সঠিক লালন পালন যেমন আমাদের কর্তব্য, তেমনি এই লড়াইয়ে জিততে পারার মধ্যেই রয়েছে আমাদের কৃতিত্ব। এখানে যদি আমরা ব্যর্থ হই, আমাদের আগামীরা যদি দেশ, সমাজ ও জাতির বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমরা বিবেকের কাছে যেমন দায়ি হব, তেমনি দায়ি হব প্রজন্মের কাছে।তাই আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব হবে নিজে জানা এবং অন্যকে জানানো। কারণ যে সমাজের যত বেশি সংখ্যক মানুষ শিক্ষিত ও সচেতন সেই সমাজ ততবেশি সক্রিয় এবং সমৃদ্ধ। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, অবৈতনিক নারী, শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, উপবৃত্তি, শিশুদের স্কুলে দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা দেশের সাক্ষরতার হার বাড়াতে যেমন যুগোপযোগী আর্শিবাদ, তেমনি শিক্ষা ও সচেতনতার প্রসার ঘটিয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশ থেকে অপুষ্টির মতো মারাত্মক সমস্যার আমূল উৎসারণে রাখতে পারে অগ্রণী ভূমিকা এবং জাতি পেতে পারে একটি সুস্থ, সবল ও নিরোগ শিশুসমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক