সুধাংশু বিমল দাশগুপ্ত

23

বোয়ালখালী উপজেলার কধুরখীল গ্রামের প্রখ্যাত আইনজীবী অনুকূল চন্দ্র দাশের জ্যেষ্ঠ পুত্র সুধাংশু বিমল দাশগুপ্ত।তিনি ১৯০৯ সালের ৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সুদর্শন ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। ছোটবেলা থেকেই সমাজকর্মী, নাট্যকর্মী হিসেবে অভিনয় করতেন। ১৯২৬ সালে কধুরখীল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন। চট্টগ্রাম কলেজে আই.এ তে ভর্তি হন। আই.এ পাস করার পর তিনি কলকাতা বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে বি.কম পাস করে সেখানকার ‘‘বাটলীবাই এন্ড কোং’’ থেকে আর-এ (বর্তমান সি.এ) পাস করে বিভিন্ন কোম্পানীতে উচ্চপদে চাকুরী করেন। ছাত্রজীবন ও চাকুরীতে থাকাকালীন সময়ে বিভিন্ন নাটকে প্রধান চরিত্রে তথা নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করতেন। তাঁর অভিনিত বিভিন্ন নাটক এলাকার প্রবীণ লোকেরা এখনো স্মরণ করেন। বিশেষত: তাঁর অভিনিত ‘‘চাঁদ সওদাগর’’ ও সর্বশেষ ‘‘পথের শেষে’’ নাটক ‘‘কধুরখীল নাঠ্য মঞ্চ’’, পটিয়া ক্লাব ও কধুরখীল মিলন মন্দির মঞ্চে পঞ্চাশ – ষাটের দশকে কয়েকবার অভিনীত হয়েছে। ঐ সময় তিনি প্রচুর প্রশংসা অর্জন করেন।
সুধাংশু বিমল দাশগুপ্তের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কধুরখীল বালিকা বিদ্যালয়কে উচ্চ বিদ্যালয়ে উতীর্ণ করণ করা হয়। ১৯১৯ সাল থেকে কধুরখীল বালিকা বিদ্যালয় প্রথমে ‘‘সীতা সুন্দরী প্রাথমিক বিদ্যালয়’’ নামে পরিচিতি ছিল। ঐবিদ্যালয়টি প্রফুল্ল চৌধুরীর মায়ের নামে নামকরণ করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্যালয়টি এম.ই স্কুল অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত চালু ছিল। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত চালু থাকাকালীন সময়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ললিত চন্দ্র চৌধুরী এবং সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে বিনয় ভূষণ চৌধুরী, মহেন্দ্র লাল বিশ্বাস ও অমিয়া দাশগুপ্ত প্রমুখ।
১৯৫৭ সালে কধুরখীল জুনিয়র বালিকা বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন সুধাংশু বিমল দাশগুপ্ত। তাঁর আমলে অত্র এলাকায় নারী শিক্ষার যথেষ্ট উন্নতি হয়। সুধাংশু বিমল দাশগুপ্ত সম্পাদক ও মনীন্দ্র লাল চৌধুরী সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সুধাংশু দাশগুপ্তের প্রচেষ্টায় চিত্তরঞ্জন চৌধুরী প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্কুলে যোগদান করেন। তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে অত্র স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ১৯৬০ সালে দায়িত্ব নেন। তাঁর এই স্কুলে যোগদান করার বিষয়ে সুধাংশু দাশগুপ্ত মুখ্য ভূমিকা পালন করেন এবং স্কুলে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। কধুরখীল কলেজ প্রতিষ্ঠায় ও তাঁর ভূমিকা ছিল।
১৯৬০ সালে স্কুলে নবম শ্রেণিতে ক্লাস শুরু হয়। ১৯৬১ ও ১৯৬২ সালে দুই বছর স্কুলের মেয়েরা প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে প্রবেশিকা পাস করে। ১৯৬৩ সালে সম্পাদক সুধাংশু দাশগুপ্তের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তৎকালীন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড থেকে স্কুলের নামে এস.এস.সি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য যে, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের প্রথম চেয়ারম্যান এ.এইচ. মাহমুদ সুধাংশু দাশগুপ্তের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের সুবাদে শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন পাওয়া যায়। তখন চট্টগ্রামের জিলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে দায়িত্ব ছিলেন মিসেস মোমেন। কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নতিকরণে তিনি সম্পাদক সুধাংশু বিমল দাশগুপ্তকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। তখন থেকেই স্কুলের নামে ছাত্রীরা পরীক্ষা দেবার সুযোগ পায়। সুধাংশু বিমল দাশগুপ্তের যুগপৎ কধুরখীল উচ্চ বিদ্যালয় ও কধুরখীল বালিকা বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সম্পাদক হিসেবে কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
উল্লেখ্য যে, তিনি কধুরখীল সমবায় সমিতির সাথেও দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে কখনো সম্পাদক কখনও সভাপতি ছিলেন। তিনি এলাকার নারী শিক্ষার উন্নয়নের জন্য গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন। কধুরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক বিধুভ‚ষণ চৌধুরীর মুত্যুর পর প্রায় ২০ বৎসর কধুরখীল উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে কধুরখীল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) পরিচালনা পরিষদের সম্পাদক হিসেবে ও দায়িত্ব পালন করেন। ষাটের দশকে তাঁর চেষ্টায় কধুরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন নির্মিত হয়। কধুরখীলের সকল সামাজিক ও শিক্ষা বিষয়ক কর্মকাণ্ডের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন।
কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পাকিস্তান আমলের একেবারে শেষের দিকে ১৯৭০ সালে বিধুভূষণ চৌধুরী ও ডা: হর্ষবিজয় চৌধুরী থেকে স্কুলের নামে ভ‚মি কেনা হয়। ১৯৭২ সালের স্কুলের মূল ভবন দূর্গা মন্দিরসংলগ্ন জায়গা থেকে বর্তমান নতুন জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। সুধাংশু দাশগুপ্ত ১৯৭২-৭৩ সাল পর্যন্ত বালিকা বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে জড়িত ছিলেন। সুধাংশু দাশগুপ্তের ছেলে মেয়েরা সবাই সুশিক্ষিত জ্যেষ্ঠপুত্র বিদেশে বসবাসরত ডা: অমিত কুমার দাশগুপ্ত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। অন্য দুই ছেলে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে আছেন। সুধাংশু দাশগুপ্তের আপন ভাইপো ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞানী প্রয়াত অধ্যাপক ড. আশীষ দাশগুপ্ত ২০১৭ সালের মে মাসে কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন করে ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ) টাকা অনুদান স্কুল কর্তৃপক্ষকে প্রদান করেন। শুধাংশু দাশগুপ্তের একমাত্র মেয়ের জামাই বাংলাদেশের অন্যতম প্রখ্যাত সার্জন অধ্যাপক ড. পি.বি রায়।
বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষক চিত্তরঞ্জন চৌধুরী ১৯৬৪-৬৫ সালে গোমদন্ডী হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে চলে যান। তাঁর স্থলে অমিয়া দাশগুপ্তা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পঞ্চাশের দশকে কিছুদিনের জন্য সাতকানিয়া পদুয়া গ্রামের জমিদার সন্তান শশাংক গুপ্ত ও স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন। সুধাংশু দাশগুপ্ত দেশ স্বাধীন হবার পর স্কুলের দায়িত্ব ছেড়ে দেন। ১৯৮০ সালের ১৫ আগস্ট তিনি প্রয়াত হন।