সুদূরের পদচিহ্ন

সাবেকুন নাহার রোদ

4

দিনাজপুর সরকারী কলেজের ছোট গ্রন্থাগার ভবন।
চারটে সারি। সারি প্রতি পনেরো জন করে বসা যায়। পুরো ঘর সবসময় পূর্ণ থাকে না। জন কয়েক করে ছাত্রছাত্রী পড়তে আসে। আমরা চার জন বড় এক ভাইয়ের কাছে প্রাইভেট পড়ি। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের জন্য ক্যালকুলাস প্রাইভেট। আজ প্রাইভেটে বান্ধবী নাজমিনের প্রথম দিন আর আমার দ্বিতীয় দিন। প্রাইভেট শেষ করে অংক তুলছি দু’জনে। আমার পুরো মনোযোগ ছিল খাতার পাতায়। লেখার এক ফাঁকে নাজমিন বললো এখানকার একটা ছেলেকেও ওর চোখে লাগল না।ওর এ কথা শুনে আমার হাতটা থমকে গেল। ভাবলাম, ওর চোখে যখন একজনকেও লাগেনি আমি একটু দেখিতো কেউ এ চোখে লাগতে পারে কিনা। দেখা শুরু করলাম। দেখতে দেখতে একজনের কাছে গিয়ে চোখ আটকে গেল। তার মানে সেই এ চোখে লেগেছে। বান্ধবীকে বললাম, ইয়ার, তোর কি সত্যি সত্যি কাউকে ভালো লাগেনি। আরেকবার ভালো লাগার চোখ দিয়ে দেখ দি তোর চয়েজে কোনো পরিবর্তন আনতে পারিস কিনা। কিন্তু, একি কমেন্ট। তার মানে না। আমাকে বললো, কেন তোর কি কাউকে ভালো লাগলো নাকি। উত্তরে বললাম, হুম। ও বললো, সেকি! তাহলে দেখা তোর কাকে ভালো লাগলো।
বললাম, সেটা তো হবে না দোস্ত। আমার চয়েজের কথা যদি তোকে বলি, তুই তাহলে আমাকে ইনসাল্ট করবি। বলবি, তোর চয়েজের কোনো মাথা নেই, নইলে ওই রকমের একটা ছেলেকে কারো ভালো লাগতে পারে!
পারে। কারো না লাগুক আমার লাগতে পারে। ও জোর করলো দেখার জন্যে কিন্তু আমি দেখালাম না।
সত্যি কথা বলতে কি ছেলেটাকে আমার খুব ভালো লেগেছিলো। কী মায়াবী মুখ, চোখ! কী মনোযোগ দিয়েই না পড়ছিল! তার দিকে যতই দেখছিলাম ততই ভালো লাগছিল সত্যি। অবশ্য ভালো লাগার একটা কারণ আছে। সেট হলো, আমি খুব সাধারন। অল্পতেই তৃপ্ত থাকি। স্বাভাবিক সবকিছুই আমার ভালো লাগে। আমার জীবনে কিংবা পছন্দে গর্জিয়াসের কোনো ছাপ নেই। আসলে আমি অসুন্দর তো তাই অল্পতেই আমার সবকিছু ভালো লেগে যায়। তবে এটা সত্যি বান্ধবীকে যদি দেখিয়ে দিতাম তবে ওরও ভালো না লেগে পারতো না। মাস্ট বি। খুব না হলেও একটু লাগত।
আসলে ছেলেটা খুব সুন্দর ছিল না। ফর্সা ছিল না। শ্যামলাই ছিল। গড়নটা পাতলা।বসে ছিলো তাই উচ্চতা যে কতোটা ছিল তা বলতে পারবনা। তাতেই ফাস্ট ক্লাস। সবার পছন্দ তো আর একই না। কারো সাধারন কারোও বা অসাধারন। আমারটা না হয় সাধারনই হলো। তারপর থেকে রাস্তায় যত সুন্দর মুখ দেখেছি সেখানে সেই মুখটি এনে বসিয়েছি।কিন্তু সব মুখই তার কাছে ম্লান হয়ে গেছে।
সেদিন ভাবলাম, দেখিতো সে সামনের দিন আসে কিনা। ওমা! প্রতিদিনই আসে। প্রতিদিন একই জায়গায় সে বসবে। কোনোদিক তাকাবে না। সেই মনোযোগ পড়াশোনায়। তার সব ভালোলাগা, বিরক্তি সবই যেন বইয়ের পাতার মধ্যে বন্দী। দেখতে কতই না ভালো লাগছে!
ভেবেছিলাম জীবনে এরকম একটা অভিজ্ঞতা নেব সেটা হচ্ছে কাউকে যদি মন থেকে ভালো লেগে যায় তবে তাকে সরাসরিই বলবো আমার ভালো লাগার কথা। কিন্তু তাকে মন থেকে ভালো লাগা সত্তে¡ও বলতে পারিনি। বলতে গিয়ে বারবার ফিরে এসেছি অপ্রত্যাশিত ভয়ে। যদি সে খুশি হওয়ার পরিবর্তে বিরক্ত হয়।
থাকনা, অব্যক্ত ভালোলাগার কথাগুলো মনের আকাশে ঘন কালো মেঘ হয়ে পুন্ঞ্জীভূত রয়ে। পাছে বলতে গিয়ে যদি আবার হিতে বিপরীত হয় তখন গোপন ভালোলাগার সুখটুকুও নষ্ট হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং সেটা দিন পন্ঞ্জিকার পাতায় সবার অগোচরেই মুখ থুবড়ে পড়ে থাক।
প্রাইভেট কিছুদিন পড়ার পর রমজান মাসে বন্ধ থাকলো। খুললো ঈদের কয়েক দিন পর। সবাইকে দেখতে পাই কিন্তু তাকে আর দেখতে পাইনা। ভেবেছিলাম পরের দিন আসবে কিন্তু সে ভাবনায় গুড়েবালি। তারপর থেকে তাকে আর দেখতে পাইনা। এমনি করে প্রাইভেটও শেষ হয়ে গেল – তার দেখা নেই।
লাইব্রেরীতে আর যাওয়াও হবেনা তার সাথে কোনোদিন দেখাও হবেনা।
হয়তোবা পৃথিবীর আনাচে-কানাচে কোনোদিন দেখা হয়েও যেতে পারে।তখন চিনতে পারবো কিনা, তাও জানিনা।
এভাবে চলতে চলতে সে কথা বোধ হয় ভুলে যাবো। কিন্তু ভুলতে পারবোনা। কারণ, ডায়েরির পাতা উল্টোলেই মনে পড়ে যাবে সেই স্মৃতিকথা। হাসি পাবে একটুখানি, কলজের কোথাও টানও পড়বে হয়তোবা।
সবটাই আজ স্মৃতির সঙ্গী। যাও সুদূর, ‘যেখানেই থাকো ভালো থেকো।’
তোমার পদচিহ্নে এঁকে দেব আমি স্মৃতি আকাশের সাতটি স্তর।