সিয়াম তাক্ওয়ার প্রশিক্ষণ

মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

13

মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল যাতে তোমরা তাক্ওয়া অর্জন করতে পারো।
রমজান বিষয়ক পবিত্র কোরআনের আয়াতটি বহুল পঠিত, আলোচিত এবং উচ্চারিত। আয়াতটির গুরুত্ব ব্যাপক। তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে মানে মহানবী হয়রত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর যখন রোজার বিধান অর্পিত হয় তখন হতে কেয়ামত পর্যন্ত সব মুসলমানদের ওপর ফরজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল মানে আদম (আ.) হতে মহানবী (দ.) পর্যন্ত রোজার বিধান ফরজ ছিল। লক্ষ লক্ষ নবী রাসুলের আগমন ও বিদায়ের সাথে সাথে ধর্মের অনেক বিধান পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু রোজার বিধান কখনো পরিবর্তন হয়নি। এটি সর্বকালের বিধান। বর্তমান পৃথিবী নামক গ্রহটির দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, গত ২০ বছরে ২০গুণ পরিবর্তন হয়েছে। আগামী ৩০ বছরে পৃথিবী কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আমরা কেউ কল্পনা করতে পারবো না। এখন আমরা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিবর্তন যুগের মানুষ। কিন্তু রোজার বিধান পরিবর্তন হবে না, কারণ রমজান মহাকালের আত্মশুদ্ধির বিধান। এই পরিবর্তনের যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির যুগে হয়তো আমরা মঙ্গলগ্রহে ঘর নির্মাণ করতে পারি কিন্তু সেখানে গিয়ে যদি মারামারি-হানাহানি, পাপাচার, ব্যভিচার, হত্যাকান্ড করি সেটাকে উন্নতি বলা যাবে না। মানুষের মনের উন্নতিই সত্যিকার উন্নতি। যা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে অর্জিত হয়। মানুষের মন হলো পাওয়ার পয়েন্টে। আলোর গতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলামিটার আর মনে গতি তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি। মনকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। বর্তমান যুগকে বলা হয় যান্ত্রিক সভ্যতার যুগ। এ যুগে কত শত যন্ত্র আবিষ্কার হয়েছে তার কোন নেই ইয়ত্তা। কিন্তু মনের পরিবর্তনের যন্ত্র কখনো আবিষ্কার হয়নি। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই মানুষ মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। মহান আল্লাহ পাক আত্মশুদ্ধির জন্য রমজানের রোজা ফরজ করেছেন।
বর্তমান তরুণ ও যুব সমাজের চরম অবক্ষয় একটা মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। যা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা আইন প্রয়োগ করে নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না, কারণ এই সমস্যাটি যতটা শারীরিক তার চেয়ে বেশি মানসিক। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা বলেছেন, ৭০ ভাগ রোগ মানসিক, ৩০ ভাগ আঘাত জনিত ও জীবাণুবাহী। এসব ব্যাধি দূর করতে মনের চিকিৎসা বেশি প্রয়োজন। দেহ ও মনের সমন্বয়ে মানুষের সৃষ্টি। দেহ মাটি আর রূহ আল্লাহর নির্দেশ বা নুর। মাটি নিম্নগামী আর রূহ ঊর্ধ্বগামী। মাটির বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে বেশি হলে মনুষ্যত্ব হারিয়ে মানুষ পশুতে পরিণত হয়। আত্মার শক্তি প্রবল হলে মানুষ অনেক ঊর্ধ্বে চলে যায়। রমজানের রোজার কারণে উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায়। মানব হতে পারে মহামানব।
ব্যক্তি, সমাজ, দেশের বাইরের পরিবর্তন চাইলে ভেতরের পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব নয়। বাইরের বড় ধরনের মহাবিপ্লব বা পরিবর্তন চান ? তাহলে, ভেতরটা পরিবর্তন করেন। বাইরে হয়ে যাবে মহাপরিবর্তন। বাইরের পরিবর্তন দ্বারা ভেতরের পরিবর্তন সম্ভব নয়। রমজানের রোজার তাক্ওয়া দ্বারা ভেতরের পরিবর্তনে সমগ্র জাতির পরিবর্তন সম্ভব। রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো তাক্ওয়া। যা ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য। মানুষ তাক্ওয়ার মাধ্যমেই সকল অবিচার অপরাধ হতে বাঁচতে পারে। তাক্ওয়া হলো সকল ভালো কাজের উৎস এবং মন্দ কাজ হতে বিরত থাকার উপায়। যিনি তাকওয়া অর্জন করে তিনি ‘মুত্তাকি’। মুত্তাকি মানুষকে সৎ কাজে উৎসাহিত করতে আগে নিজেই সৎ হয়।
‘তাক্ওয়া’ শব্দটি ছোট, অর্থ অনেক ব্যাপক। সরল অর্থ আল্লাহ ভীতি, যে দেশে প্রকাশ্যে রাজপথে ঘুষ, দুর্নীতি আদান-প্রদান হয় সেদেশে আইন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ঘরে ঘরে চার দেওয়ালের ভেতরের পাপাচার, ব্যভিচার, খুন, নির্যাতন বন্ধ করবে কীভাবে ? তার জন্য প্রয়োজন আল্লাহর ভীতি। রমজানের রোজা তাক্ওয়া সৃষ্টি করে।
তাক্ওয়া মানে আল্লাহর ভয়। এটি সাপ বাঘ সিংহের ভয় নয়, আল্লাহর ভয় মানে তাঁর আদেশ মানা। তাঁর প্রতি অনুগত থাকা। সমাজে মানুষ কী বলবে সে ভয়ে আমরা প্রচুর পাপাচার হতে বিরত থাকি। অথচ মহান আল্লাহ পাক সবকিছু দেখছেন, তাঁর সামনে কীভাবে পাপকরবো ? এ ভীতির নামই ‘তাক্ওয়া’। অপরাধ বন্ধ করতে হলে সমাজ তাক্ওয়াভিত্তিক হতে হবে। সিসি ক্যামরা লাগিয়ে অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। অপরাধ দমনে তাক্ওয়াভিত্তিক সিসি ক্যামরা অন্তরে স্থাপন করতে হবে। মনে রাখতে হবে ফেরেস্তারা আমাদের সবকিছু রেকর্ট করছে এবং মহান আল্লাহ পাক আমাদের গর্দানের শাহী বাগের চেয়ে নিকটে।
তাক্ওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আড়াই শতাধিক আয়াত আছে। সূরা বাকারার মধ্যে ‘তাক্ওয়া’ শব্দ ত্রিশবার আছে। পবিত্র কোরআনের প্রায় বিধি বিধানের পর তাক্ওয়া ছাড়া ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বলে ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ মুত্তাকিদের আমলই কবুল করেন। (সূরা : মায়েদা, আয়াত : ২৭)
মানুষ তাক্ওয়ার গুণ অর্জনের মধ্যদিয়েই মুত্তাকি হয়। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে আরো ঘোষণা করেছেন ‘আল্লাহর কাছে (তোমাদের কোরবানীর) মাংস, রক্ত, কোনোটাই পৌঁছে না, পৌঁছে ‘তাক্ওয়া’ (সূরা : হজ্ব, আয়াত : ৩৭) তাক্ওয়াবান ব্যক্তিই সম্মানিত। তাই পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই যে সর্বাধিক সম্মানিত যে সর্বাধিক তাক্ওয়াবান, (সূরা : হুজায়াত, আয়াত : ১৩)
যে মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক তাক্ওয়া সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। তাক্ওয়া ছাড়া সে কোরআনও মানুষের কোনো উপকারে আসে না বলে কোরআনের শুরুতেই ঘোষণা করেছেন, এই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েত। (সূরা বাকারা, আয়াত : ২)
মুত্তাকি হলো তাক্ওয়া অর্জনকারী। তাক্ওয়া অর্জন হয় রোজার মাধ্যমে। আবার কোরআন নাজিলের মাধ্যমে রোজা ফরজ হয় এবং রোজার গুরুত্ব অধিক হয়। সরল অর্থে বলা যায়, কোরআনের হেদায়তের জন্য তাক্ওয়ার দরকার, তাক্ওয়ার জন্য রোজার প্রয়োজন, কোরআনের কারণেই রোজার প্রাপ্তি। সবই একীভূত, পৃথক করার কোন সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ পাক আমাদের রমজানের মাধ্যমে তাক্ওয়া অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক।