সিরাজুল হক মিঞা

বজল আহমদ

30

বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম সিরাজুল হক মিঞার ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি শনিবার। ১৯৯৪ ইংরেজির এইদিনে রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচিত মানুষটি ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবী ছেড়ে অন্য জগতে পাড়ি দেন। চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা সিরাজুল হক মিঞার জন্ম সাবেক ডবলমুরিং থানার অন্তর্গত মাদারবাড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিক সংগঠক। নিরহংকার, সাদাসিধে ও সৌখিন এই মানুষটি রাজনীতির ধারে কাছেও ছিল না কখনো। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মত মহান নেতার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয় তার এবং সেই সূত্রে বঙ্গবন্ধু’র হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পথ চলা শুরু হয় আদর্শবান এই নেতার। ব্যক্তিগত কারিশমা ও সাহসিকতার কারণে তিনি দ্রুত চলে আসেন লাইমলাইটে এবং একজন সংগঠক হিসেবে তার নামটিও উঠে আসে আলোচনায়। বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলের সাংগঠনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তৎকালীন সিটি এবং পরবর্তীতে মহানগরী আওয়ামী লীগের সভাপতিও ছিলেন ত্যাগী এই নেতা। স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জননেতা এম এ হান্নান সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করলে অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবেও দলের হাল ধরেন চৌকস এই নেতা। তিনি যখন আওয়ামী লীগে যোগ দেন তখন দলের ছিল বড় দুঃসময় ও দুর্দিন। ছিল বৈরী পরিবেশও। আর সেসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছিল যেন নিষিদ্ধ। স্বৈরাচারী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু এবং গোয়েন্দা নজরদারি উপেক্ষা করে অনেকটা আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে তখন রাজনীতি করতে হতো। প্রকাশ্যে রাজনীতি করা বড় কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তখন আজকালকার মতো এতো নেতাকর্মীরও ছড়াছড়ি ছিল না। সিরাজুল হক মিঞার আগমনে সেই সময় দলে নতুন মাত্রা যোগ হয়। দলীয় রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সাবেক মন্ত্রী জননেতা মরহুম আলহাজ জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছের মানুষ এবং একান্ত আস্থাভাজন। জহুর আহমদ চৌধুরী তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক। ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অন্যতম একজন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মীও। সেই সুবাদে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সিরাজুল হক মিঞার বেশ প্রভাব ছিল। তাছাড়া এক দফার প্রবক্তা প্রয়াত এম.এ আজিজ, এম.আর ছিদ্দিকী, এম.এ. হান্নান, এম.এ মান্নান প্রমুখদের মতো চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতাদের সাথে ছিল তার ঘনিষ্ঠতা ও সুসম্পর্ক। বঙ্গবন্ধুর ডাকে চলমান স্বাধীকার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখেছেন লড়াকু এই মানুষটি। সেই সময় স্টেশন রোডস্থ রেস্ট হাউস বর্তমানে হোটেল সৈকত ছিল তৎকালীন সিটি আওয়ামী লীগের কার্যালয়। কেন্দ্রীয় নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী এ রেস্ট হাউসে বসতেন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। বহুল আলোচিত এই রেস্ট হাউস হতে মূলত সেই সময় নিয়ন্ত্রণ হতো চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের রাজনীতি। বিশেষ করে সত্তরের সাধারণ নির্বাচনের পর উত্তল দিনগুলোতে বহুল আলোচিত এই রেস্ট হাউস ছিল আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু। সে সময় চট্টগ্রামের মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য ছুটে আসত এই রেস্ট হাউসে। সিরাজুল হক মিঞা ছিলেন তখন দলের অন্যতম একজন নীতিনির্ধারক। তার সাংগঠনিক দপ্তরও ছিল এখানে। বলতে কি সিরাজুল হক মিঞার রাজনৈতিক জীবনে সিংহভাগ কেটেছে এই রেস্ট হাউসে। স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন দলের ত্যাগী এই নেতা। মরহুম ফজল করিম ছিলেন তখন চেয়ারম্যান। ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি চট্টগ্রামের উন্নয়নে কৃতিত্বেও স্বাক্ষর রেখেছেন। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মত মৌলিক বিষয়গুলো উন্নয়নে তিনি কাজ করে গেছেন সাধ্যমত। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ নির্মাণেও তার অবদান ছিল। প্রয়াত এ নেতার রেখে যাওয়া আদর্শকে এখনো অনুসরণ ও লালন পালন করে যাচ্ছেন, তারই সুযোগ্য সন্তান চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক মাহবুবুল হক মিঞা। আজকের এ লেখার মধ্যদিয়ে আক্ষেপের সুরে বলতে হয় এমন একজন নির্লোভ রাজনীতিকের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তার নামে কোন স্থাপন বা রাস্তার নামকরণের উদ্যোগ নেওয়ার গরজবোধ করে নি কেউ। পরিশেষে তার বিদেহী আত্মার শান্তি। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুক।