সিন্ডিকেটের অনিয়ম-দুর্নীতিতে ‘জিম্মি চমেক হাসপাতাল’

ফারুক আবদুল্লাহ

194

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত কিছু চিকিৎসক, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা সিন্ডিকেট সৃষ্টি করে পদে পদে অনৈতিক উপায়ে অর্থ আয় করে চলেছেন। এ অসাধুচক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে পুরো চমেক হাসপাতাল। এতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার জন্য ভরসার জায়গাটি রোগী ও স্বজনদের কাছে ‘শোষণ-হয়রানির’ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন অনুসন্ধান চালিয়ে হাসপাতালের আসা রোগী ও স্বজনদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার যুগান্তকারী উন্নতি হয়েছে। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় গত ১০ বছরে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট ৭ গুণ বেড়েছে। নামমাত্র খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় সরকারি হাসপাতালে। সিসিইউ, আইসিইউ, অপারেশন ও ডায়ালাইসিস সেবার ক্ষেত্রে নামমাত্র মূল্য নেওয়া হয়। সব সরকারি হাসপাতালে ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু হাসপাতালের দায়িত্বরত অতি মুনাফা লোভী এক শ্রেণির চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সিন্ডিকেটের কারণে স্বাস্থ্যখাতে সরকারের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চারজনের একটি সিন্ডিকেট চমেক হাসপাতালে আউট সোর্সিং নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি ওষুধ অবৈধভাবে বিক্রি ও মেডিকেলের জন্য কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতিতে সরাসরি জড়িত। এই সিন্ডিকেট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পূর্ব গেইটে সব ওষুধের দোকান থেকে প্রতিমাসে ১১ হাজার ২০০ টাকা চাঁদা আদায় করে থাকে। সেখানে ৩০ থেকে ৩৫টি ওষুধের দোকান রয়েছে। বেশিরভাগ দোকানেই সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ রাতে কেনা-বেচা চলে সিন্ডিকেটের ইশারায়। আর সে ওষুধগুলো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীদের কাছে বিক্রি হয় ন্যায্য দামের থেকেও দিগুণ বেশি দামে। হাসপাতালের এক ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তিনি জরুরি বিভাগে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত রোগীদের ঠিকমত চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন না এবং রোগীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন। একইভাবে ১৬ নং ওয়ার্ডের এক চিকিৎসক সরকারি ওষুধ বাণিজ্য, রোগীদের সাথে খারাপ আচরণ এবং ইন্টার্নি চিকিৎসকদের হয়রানির সাথে জড়িত। তার বিরুদ্ধে ইন্টার্নি মহিলা চিকিৎসকদের কৌশলে অনৈতিক প্রস্তাব দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। অনৈতিক প্রস্তাবে রাজী না হলে তাদের ইন্টার্নশিপ সার্টিফিকেট থেকে বঞ্চিত ও নানা হয়রানি করেন।
এছাড়া দুইজন ওয়ার্ড মাস্টার হাসপাতালের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ছত্রছায়ায় জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে আউট সোর্সিং নিয়োগ দিয়ে থাকেন। পরবর্তীতে তিন মাস পর নানা অজুহাত দেখিয়ে তাদেরকে ছাঁটাই করে দেন। হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে এই দুই ওয়ার্ড মাস্টারের নিজস্ব লোক রয়েছে। যারা তাদেরকে প্রতিমাসে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা দিয়ে হাসপাতালে প্রতিদিন অবৈধ কাজ করে। তাদের দ্বারাই রোগীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালের শিশু চুরি সাথেও তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। এ সব কাজের সাথে চমেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির এক পরিদর্শক সহযোগিতা করে থাকেন। হাসপাতালের যাবতীয় অনৈতিক কাজের মূলহোতা এই দুই ওয়ার্ড মাস্টার।
অনুসন্ধানে উঠে আসে হাসপাতালের আরো নানা অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য। হাসপাতালে পুলিশ ফাঁড়ির ওই পরিদর্শক উর্ধ্বন কর্তৃপক্ষের ছত্রছায়ায় নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। বদলি বাণিজ্য, সার্টিফিকেট বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি ওষুধ চুরি, হাসপাতালের যন্ত্রাংশের টেন্ডার বাণিজ্য, এ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপরাধে সাথে জড়িত তিনি। এই পরিদর্শক জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীদের পুলিশ কেইসের সিল দিয়ে রুমে নিয়ে তাদের মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অংঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। তার সহযোগী হিসেবে জরুরি বিভাগের ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির তিনজন কর্মচারী রয়েছেন।
চমেক হাসপাতালের আইসিইউ মানে সোনার হরিণ। এই আইসিইউ বাণিজ্য নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। যেখানে রাজনৈতিক নেতা, বিএমএ নেতা এবং চিকিৎসক রয়েছে। তারা চমেক হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের মুমূর্ষু রোগীদের আইসিইউতে না দিয়ে নগরীর ৯টি বেসরকারি হাসপাতালের সাথে কন্ট্রাক্ট করে মোটা অংঙ্কের টাকার বিনিময়ে মুমূর্ষু রোগীদের সেসব হাসপাতালের আইসিইউতে শিফট করেন। এতে চমেক হাসপাতালে সাধারণ রোগীরা সঠিকভাবে চিকিৎসা না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এছাড়া চমেক হাসপাতালের আইসিইউ’র এক নার্স ভর্তি হওয়া রোগীদের ওষুধের ¯িøপ ধরিয়ে দিয়ে হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে এক ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে আসার কথা বলেন। যদি ওই ফার্মেসি থেকে রোগীর স্বজন ওষুধ না আনে তাহলে ওষুধ গ্রহণ করেন না। এবং রোগীর স্বজনের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন। আর রোগীর চাহিদার তুলনায় বেশি ওষুধ ¯িøপে লিখে দেন। চিকিৎসা শেষে থেকে যাওয়া ওষুধ রোগীকে না দিয়ে পুনরায় ওই ফার্মেসিতে ফেরত দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেন। এছাড়া আইসিইউ থেকে ¯িøপ ফার্মেসিতে নিয়ে গেলে ১৫% কমিশন দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটকে।
এসব বিষয়ে জানতে চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহমেদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকায় একটি হাসপাতালে আছেন জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি হলে অথরিটি কি বলে আমার প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে? যদি অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ পেয়ে থাকেন, তাহলে লিখে দেন।