সিনেমার ভুবনে যিনি উত্তম!

7

উত্তম কুমার নিয়ে মানুষের কয়েকটা অদ্ভুত বিশ্লেষণ রয়েছে। যেমন কেউ কেউ বিশ্বাস করত উত্তম কুমার নাকি দুনিয়ার সেরা নায়ক। বিশাল বড় একটা দুনিয়ায় এত এত অভিনেতা, উত্তম কুমার তার যুগেই দুনিয়ার সেরা অভিনেতা নন। মানুষ যখন যাকে দেখে বড় হয় তাকেই ভাবে সেরা। উত্তম কুমার সেরা না হলেও এই অঞ্চলের সিনেমার অন্যতম উত্তম পুরুষ। তসলিমা নাসরিন অবশ্য বলেছেন, “উত্তম কুমার ¯্রষ্টার মতো। গড যদি হ্যান্ডসাম হয় তবে তা হয়ত উত্তম কুমারের মতোই হবে দেখতে।” উত্তম কুমারকে এখনকার লোকজনের হয়ত তত হ্যান্ডসাম লাগবে না। তবে হ্যাঁ, ‘নায়ক’ সিনেমায় উনাকে যে পরিমাণ সুদর্শন লেগেছে ওরকম আর কাউকে কখনও লাগেবে না। কথাসাহিত্যিক রশীদ করীমের অবশ্য ভালো লাগতো প্রমথেশ বড়ুয়াকে। লিখেছেন- সপ্তাহের পর সপ্তাহ কীভাবে তিনি একই ছবি দেখতেন। কবি ফররুখ আহমেদ ঠাট্টা করে বলেছিলেন, “এ বয়সে এত সিনেমা দেখো না, মাথা বিগড়ে যাবে।” রশীদ করীমের মাথা বিগড়ায়-নি বরং তিনি হয়েছেন সফল কথাসাহিত্যিক।
গ্যারি কুপারকে নিয়ে উনি যে লেখাটা লিখেছেন সেরকম বাংলাদেশে কোনো সাহিত্যিককে দেখিনি একজন হলিউড অভিনেতা নিয়ে এমন করে লিখতে। এসময়ে এসে আপনি যখন গ্যারি কুপারের সিনেমা দেখবেন, বলা বাহুল্য আপনার হয়ত খুব বেশি ভালো লাগবেনা। তবে ইতিহাস বলবে উত্তম কুমার বাংলা চলচ্চিত্রে মহানায়ক আর কেউ তার ধারে কাছেও ছিল না। অভাব অনটনের সংসার থেকে উঠে এসে, থিয়েটার ও যাত্রা করার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকেও, একটার পর একটা ফ্লপ সিনেমা উপহার দিয়েও তিনি এই জগত ছেড়ে না পালিয়েই হয়েছেন বাংলা সিনেমার সবচেয়ে বড় নক্ষত্র। বলছিলাম উত্তম কুমারকে নিয়ে। যার বেশির ভাগ সিনেমাই আমাদের প্রজন্মের দেখা। আপনি যদি টিভিপোকা হন তাহলে সিনেমাগুলো দেখা হয়েই যায়। যেমন- একটা সিনেমার কথা বলি ‘ব্রজবুলি’। উত্তমের ক্যারিয়ারে শেষের দিকে তখন ভাটার টান, কিন্তু কি সুনিপুন অভিনয়! তার চরিত্রটা হল, সময় পেলেই বিশাল চাপা মেরে বেড়ান। পাড়ার সেই দাদাই যেন তিনি হয়ে গেছেন। অনেকে ‘এন্টনি ফিরিঙ্গি’ সিনেমার নাম বললে নাক সিঁটকায়। কিন্তু মন দিয়ে দেখবেন বেশ লাগবে। বিষণ্ণ হলে হয়ত মান্না দের গানটাও গাইবেন। ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’ গাইতে গাইতে মুখে একপ্রস্থ হাসিও এসে যেতে পারে। ‘চিড়িয়াখানা’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘সাগরিকা’, ‘সপ্তপদী’ আর ১০টা বাঙালির মতো আমাদের সবার প্রিয়। সুবোধ ঘোষের এক উপন্যাস নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বলছিলেন একবার। উপন্যাসটির নাম ছিল- ‘শুনো বরনারী’।
তিনি বলেছিলেন, “এত সাধারণ একটা উপন্যাস কিন্তু পড়তে এত মধুর, মনে হয় বারবার পড়ি।” উত্তম কুমারকে আমার তেমনি মনে হয়। তিনি সাধারণের ভেতরেই অসাধারণ। চলচ্চিত্র করেই তিনি বিত্তশালী হয়ে ছিলেন তাই বাসায় লোকজন ডেকে পার্টি করতেন, ধেই ধেই করে নাচতেন, সিগারেট খেতেন, আকন্ঠ মদ্যপানে ডুবে থাকতেন। কিন্তু যে পেশার যেই হোক কাউকে হেয় করতেন না, অজস্র টেকনিশিয়ানকে তিনি সাহায্য করেছেন সবসময়। সিনেমার সেটে তিনি আবার ভিন্ন, সিরিয়াস থাকতেন, হালকা লোকদের এড়িয়ে চলতেন। যেটা হিন্দি সিনেমার সুপারস্টার রাজেশ খান্না পারেন নি। ধান্দাবাজ কিছু প্রযোজকের সঙ্গে ছিল রাজেশ খান্নার ওঠাবসা।
অর্পনা সেনের লেখা পড়ে জেনেছিলাম, উত্তম কুমারকে নাকি সত্যজিৎ পছন্দ করতেন না। বিশ্বাস হয় না আমার কখনও হয়ত তা দুই মহীরুহ ব্যক্তিত্বের লড়াই। সত্যজিৎ না বানালে আমাদের অন্যতম প্রিয় সিনেমা ‘নায়ক’ ‘চিড়িয়াখানা’ কীভাবে পেতাম? উত্তম কুমারকে নিয়ে সবাই মোটামুটি জানে। তাই সেগুলো বলা মাত্রই হবে অতিকথন। তবে তা জানেনা তা হল, উত্তম কুমার কিশোর কুমারের মতো নিঃসঙ্গতা পছন্দ করতেন না। জীবনের শেষে এসে হয়ত এটাই তাকে বেদনার্ত করেছে। অবশ্য তখনকার নায়ক নায়িকারা ছিলেন অন্য ধাঁচের। তারা অভিনয় করলেও তাকে জীবনের একমাত্র বিষয় ভাবতেন না। পূর্ণেন্দু পত্রী একটা চলচ্চিত্র করবেন, তিনি মাধবী মুখার্জিকে নেবেন বলে ভেবেছেন, প্রতিদিন বাসায় গিয়ে ফিরে আসেন। একদিন দেখা হল। নায়িকা বললেন, “আমি আর অভিনয় করবো না, বøক বাটিকের কাজ শিখছি।” পরিচাল অনেক বুঝিয়ে রাজী করালেন অনেক কষ্টে। নায়িকার উত্তর, “আমাকে কদিন সময় দিন, যেটা শিখছি সেটা শেষ করি আগে। আর হাতে প্রচুর ব্যথা, বিশ্রাম নিতে চাই।” তো সেই যুগ এই যুগ অনেক ব্যবধান, তবে উত্তম কুমার সব সময় উত্তম, ছবি দেখতে বসলে আপনি ‘বোর’ হবেন না কখনও।