সিডিএ’র উদ্যোগ আবাসন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরার আশা

14

চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও জেলা-উপজেলায় আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা ও বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জনবহুল অথচ সীমিত ভূমির এ ছোট্ট দেশে মানুষের আবাসন সমস্যা প্রকট। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আবাসন সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা একান্তই প্রধান কয়েকটি নগরকেন্দ্রিক এবং অপ্রতুল। সেদিক বিবেচনা করে সরকার নব্বই দশকের শুরুতে বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কোম্পানি গঠন করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা ও বাস্তবায়নের অনুমোদন দেয়। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এসব কোম্পানির মাধ্যমে তাদের আবাসন সমস্যা সমাধানে ঝুঁকে পড়ায় বাজারে এসব আবাসন কোম্পানিগুলোর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় তবে এ সুযোগে শত শত নামসর্বস্ব আবাসন কোম্পানিও গড়ে উঠে যাদের মাধ্যমে গ্রাহক প্রতারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। গণমাধ্যমে এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে সরকার প্রায় পাঁচবছর আগে আবাসন কোম্পানিগুলোকে রাজউক বা সিডিএর নিবন্ধনভুক্ত করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ওই সময়েই আবাসন কোম্পানিগুলোকে নিবন্ধনের উদ্যোগ নেয় সিডিএ। গতকাল দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সিডিএ কর্তৃক ২০১৩ সালে নিবন্ধনের জন্য আবাসন কোম্পানিগুলো থেকে দরখাস্ত আহবান করা হয়। তখন ২৫৩টি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান (আবাসন কোম্পানি) নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে। সে সময় রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং সোসাইটি অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) থেকে আপত্তি তোলা হয় কিছু বিষয়ে। নিবন্ধন ফি কমানো এবং রিহ্যাব সদস্য ছাড়া কাউকে নিবন্ধন না করানোর দাবি ছিল এরমধ্যে অন্যতম। এ নিয়ে বিভিন্ন দেন-দরবারের কারণে নিবন্ধন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে রিহ্যাবের দাবি আংশিক মেনে নেওয়া হয়। রিহ্যাবের সদস্যদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হলেও নিবন্ধন ফি কমানোর দাবি নাকচ করে মন্ত্রণালয়। ফলে পূর্বের নির্ধারিত ফি দিয়েই আবাসন প্রতিষ্ঠানকে সিডিএ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। এজন্য অবশ্যই আবাসন প্রতিষ্ঠানকে রিহ্যাবের সদস্য হতে হবে। রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ অনুযায়ী ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এই আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। আবাসন প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের জন্য সর্বশেষ চলতি বছরের মে মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়। এর পরেই নিবন্ধন সনদ প্রদান কার্যক্রম শুরু করার কথা ছিলো। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করা ২৫৩টি প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো নির্ধারিত সব কাগজপত্র জমা দিতে পারেনি। এ অবস্থায় সময় আরো একমাস বাড়ানো হয়। এরই মধ্যে সিডিএ সবগুলো প্রতিষ্ঠানের খবরাখবর নিয়েছে। আবেদনের কাগজপত্র যাচাই করে মাত্র ১১টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন সনদ দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আবাসন কোম্পানিগুলোকে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে বেশ কয়েকটি শর্ত দেওয়া হয়। এরমধ্যে অন্যতম ছিলো, হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, বাধ্যতামূলক রিহ্যাবের সদস্য হওয়া, নির্ধারিত আবেদন ফি পরিশোধ, নির্ধারিত জনবল কাঠামো, যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী অফিস থাকাসহ আরো বেশ কয়েকটি শর্ত। সিডিএ’র কাছে আবেদন করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠানছাড়া বাকিগুলো এসব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। এরমধ্যে বেশিরভাগ কোম্পানির অফিস আবাসিক এলাকায় হওয়ায় নিবন্ধন অযোগ্য হিসেবে বিচেনা করা হয়েছে। তাছাড়া কিছু কোম্পানির হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স না থাকা ও জনবলের অভাব পরিলক্ষিত হয়। তবে কোম্পানিগুলো যাবতীয় কাগজপত্র হালনাগাদ করলে নিবন্ধন সংগ্রহ করতে পারবে। উল্লেখ্য যে, নিয়মানুযায়ী কোনো ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। যদি সিডিএ’র আওতাধীন এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করে তাহলে তাকে অবশ্যই সিডিএ থেকে নিবন্ধিত হতে হবে। রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইনের ৫(১) ধারা অনুযায়ী, ‘কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রত্যেক রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট হতে নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে।’ এতোদিন এ নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করেনি আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে এ খাতে নানা বিশৃঙ্খলা চলে আসছিলো। সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত হতে হয়েছিল প্রতারিত। অনেককে প্রতারক আবাসন ব্যবসায়ীদের হাতে সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে পথে বসতে হয়েছে। নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন হলে এ খাতে জবাবদিহিতা সৃষ্টি হবে। প্ল্যান পাস থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে সিডিএ। এতে গ্রাহক প্রতারণার ফাঁদ বন্ধ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, সিডিএ’র এ উদ্যোগ সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত। আশা করা যায় এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে আবাসন ব্যবস্থায় অব্যাহত বিশৃঙ্খলা লোপ পাবে। তবে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো স্বেচ্ছাচারি হয়ে উঠবে কিনা তার প্রতিও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।