সাহিত্যে দ্রোহ ও প্রতিবাদ

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

34

সাহিত্যে দ্রোহ কিংবা সাহিত্যে প্রতিবাদ-একটি ব্যাপৃত বিষয়। বহু আগে থেকে মানুষ সাহিত্যের মাধ্যমে তাঁর বোধ ও উপলব্ধি, প্রেম ও প্রখরতা, জীবন ও স্বপ্নকে উচ্চকিত করেছে। কখনো সাহিত্যে সমাজবাস্তবতা প্রকট হয়ে উঠেছে, আবার কখনো সৌন্দর্য সৃষ্টি বা অন্তর্গত উপলব্ধি উঠে এসেছে শব্দের পানসিতে। এটা সহজবোধ্য বিষয় যে, যেখানে জীবন থাকবে সেখানে ¯েœহ-নিমগ্নতা থাকবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকবে, ঘৃণা ও কুসংস্কার থাকবে, মোহ থাকবে, থাকবে কপটতা ও খল মানুষের মুখেরা। কারণ জীবন এসবের বাইরে নয়। সাহিত্যে জীবনের প্রতিফলন পাওয়া যায় বিধায়ই সাহিত্যপাঠ আমাদের কাছে উপভোগ্য এবং প্রয়োজনীয়। সাহিত্যে দ্রোহ-প্রতিবাদ খুব পুরনো একটি বিষয়। গল্প-কবিতা-উপন্যাসে শিল্পচাতুর্যের কারণে কখনো সু²ভাবে, কখনো রূপকার্থে আবার কখনো বৃহৎ ক্যানভাসে উঠে এসেছে দ্রোহ-প্রতিবাদ। দ্রোহ প্রতিবাদ হয়েছে কখনো ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, কখনো সামাজ্যবাদী শক্তি, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এ প্রতিবাদ করা কিংবা বিদ্রোহী হওয়া সামর্থের কাজ- সাহসী ভ‚মিকাও প্রশংসারযোগ্য। কারণ সমকালের অসঙ্গতির বিরুদ্ধেই সাহিত্যিকরা তির্যক বাণ ছুড়েন, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন অপসংস্কৃতি, অপশাসন ও গোঁড়ামীগুলো। যার ফলে দ্রোহী সাহিত্যিককে কালে কালে যেমন মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে, তেমনি জেল-নিপীড়নকেও সহ্য করতে হয়েছে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি এ বিষয়টি একটি ব্যাপৃত বিষয়। তবে এ আলোচনায় বিশ্বসাহিত্য নয় কেবল বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।
আবদুল হাকিম জন্মেছিলেন আজ থেকে কয়েকশ’ বছর আগে ১৬২০ সালের দিকে, নোয়াখালির জেলার বাবুপুরে। তিনি ছিলেন স্বজাতি ও স্বভাষার প্রতি গভীর অনুরাগী মানুষ। কিন্তু সেই সতেরশ’ শতকের শুরুর দিকে আরবি, ফার্সি, সংস্কৃতিকে অনেকে বাঙালি হয়েও মহার্ঘ মনে করতো। কিন্তু কষ্টের ব্যাপার হলো তারা বাংলায় কথা বলতে অসম্মানবোধ করতেন। বাংলা নিজেদের মাতৃভাষা হলেও এইশ্রেণির লোকেরা তা বর্জন করেছে, হীন মনে করেছে। কবি হিসেবে, যিনি মধ্যযুগের গুরুত্বপূর্ণ একজন প্রতিভাধর-নুরনামা, ইউসুফ জোলেখা, লালমতি, সয়ফুলমুলুক-এর লেখক আবদুল হাকিম স্বভাবতই চুপ থাকতে পারেন নি। সচেতন বাঙালিদের মতো এই নিগ্রহ তাঁরও গায়ে লেগেছে। তিনি নিগ্রহের জবাবে লিখলেন ‘বঙ্গবাণী’ শিরোনামের কবিতাটি। তাঁর ধারালো জবাব :
“যে জন বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী
সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন’ জানি \
দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়
নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায় \”
আবদুল হাকিম কবিতায় বাংলা নিগ্রহকারীদের ‘জন্ম নির্ণয় ন’ জানি’ বলে পরোক্ষভাবে কেবল গালি দেননি বা ভর্ৎসনাই করেননি, দেশ ত্যাগ করতেও বলেছেন। এখানেই মধ্যযুগের এই কবির প্রতিবাদ, এ কবির মহত্ত¡। একই বিষয়ে আমরা আরো দুশো বছর পর কলম ধরতে দেখি বঙ্গিমচন্দ্রকে। যদিও বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন সংস্কারাচ্ছন্ন, গোঁড়াপন্থী ও সাম্প্রদায়িক মানুষ; তারপরও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিলো শত্রুনিপাতকারী অস্ত্রের মতো। তাঁর ‘বাবু’ প্রবন্ধটি এক্ষেত্রে উল্লেখ্য। তৎকালীন যুবকদের কিংবা ভাবুকদের (!) বাংলা রেখে ইংরেজি ভাষাপ্রীতি, মদ ও নারীপ্রীতি কিংবা প্রাশ্চাত্যের সংস্কৃতিকে প্রাণপণ অনুকরণ ও অনুসরণ করা বঙ্কিমের দৃষ্টিগোছর হয়েছিলো ভালোভাবেই। দূরদর্শিতার কারণে তিনি এর ক্ষতি সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই তাঁর বিদ্রæপ; অন্যদৃষ্টিতে তাঁর প্রতিবাদ :
‘যাঁহারা বাক্যে অজেয়, পরভাষাপারদর্শী, মাতৃভাষাবিরোধী, তাঁহারাই বাবু। মহারাজ! এমন অনেক মহাবুদ্ধিসম্পন্ন বাবু জন্মিবেন যে, তাঁহারা মাতৃভাষায় বাক্যালাপে অসমর্থ হইবেন।… যিনি নিজগৃহে জল খান, বন্ধুগৃহে মদ খান, বেশ্যাগৃহে গালি খান, এবং মুনিব সাহেবের গৃহে গলাধাক্কা খান, তিনিই বাবু। যাঁহার স্নানকালে তৈলে ঘৃণা, আহারকালে আপন অঙ্গুলিকে ঘৃণা এবং কথোপকথনকালে মাতৃভাষাকে ঘৃণা, তিনিই বাবু।’
অনেক প্রতিক‚লতার মধ্য দিয়ে ১৯৬০ সালে এক বাঙালি লেখক ‘নীলকর-বিষধর-দংশন-কাতর-প্রজানিকর-ক্ষেমঙ্করেণ-কেনচিৎ-পথিক’ ছদ্মনামে একটি নাটক লিখেছিলেন। যে নাটকটি পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ এবং কালজয়ী রচনার মর্যাদা লাভ করে। নাটকটির নাম ‘নীলদর্পণ’। লিখেছিলেন দীনবন্ধু মিত্র। নীলকরদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্মমতাকে ধারণ করে আছে এ নাটকটি । দীনবন্ধু মিত্র তাঁর পেশাগত প্রয়োজনেই বাংলার যেসকল অঞ্চলে নীল চাষ হতো সেসব অঞ্চলে গিয়েছিলেন। তাই তিনি কৃষকদের উপর নীলকরদের অত্যাচার খুব কাছ থেকেই প্রত্যক্ষ করেছেন। ফলে তাঁর ভেতরকার জমা হওয়া ক্ষোভ, বিক্ষোভের সম্মিলিত প্রকাশ পেয়েছে নীলদর্পণে। ঐ সময়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাহিত্যের এমন দ্রোহ আর হয় নি। বিরুদ্ধ শক্তির বিরুদ্ধে এ নাটকটি একটি শক্তিশালী পক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাঠানো হয়েছিলো। পরে বিভিন্ন আন্দোলনে ও প্রতিক্রিয়ায় সরকার নীলকরদের অত্যাচার বন্ধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছিলো। এ সম্পর্কে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘নীলদর্পণ নাটক প্রকাশিত হলে এবং এর ইংরেজি অনুবাদ প্রচারিত হলে একদিনেই এ নাটক বাঙালিমহলে যতটা প্রশংসিত হয়েছিল, শ্বেতাঙ্গমহলে ঠিক ততটাই ঘৃণিত হয়েছিল। এই নাটক অবলম্বন করে বাঙালির স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের সূচনা, এই নাটক সম্বন্ধে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত স¤প্রদায় ও রায়তদের মধ্যে মৈত্রীবন্ধন স্থাপিত হয়, এর মধ্যে দিয়েই শ্বেতাঙ্গ নীলকরদের বর্বর চরিত্র উদ্ঘাটিত হয়।’ এ থেকে স্পষ্ট নীলদর্পণ তখন কেবলই সাহিত্যকর্ম হিসেবে গন্ডী বদ্ধ থাকে নি। সেটি দ্রোহীর মুখের বাণী হয়েছে, পীড়িতের আত্মনাদ হয়ে প্রতিকার চেয়েছে, প্রতিবাদ করেছে। এমন আরেকটি নাটক বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’।
শিল্পী মাত্রই একজন অসাধারণ মানুষ। শিল্পীরা কোনো না কোনোভাবে তাঁর স্বকালের ধারক ও বাহক হন। এমন শিল্পী খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি স্বকালের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেন নি, কলমের কালিকে রক্তে পরিণত করেন নি। তবে যাঁরা শিল্পের জন্যে শিল্প-এমন মতে বিশ্বাসী তাদের কথা নাও বলা যেতে পারে। সেই নীলদর্পণ পার হয়ে আরো কয়েক দশক পরে আমরা আমাদের জাতীয় কবির কাছে যেতে পারি। তাঁকে নিয়ে নতুন করে বা পুরাতন করে কিছু বলার নেই খুব একটা- তাঁর বড় পরিচয় তিনি বিদ্রোহী। তাঁর বিদ্রোহ শোষণ-অত্যাচার আর ভন্ডামির বিরুদ্ধে; তাঁর বিদ্রোহ সুন্দর সমাজের বিনির্মাণের। তাঁর প্রসঙ্গে শুধুমাত্র ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ ব্যাপারে আলোচনা করতে চাই। কারণ এর মধ্য দিয়ে আমরা দুটো দিক উন্মোচিত করতে পারবো। প্রথমটি হলো : কবির দ্রোহ, তাঁর বজ্রভাষা। দ্বিতীয়টি হলো : বিদ্রোহের পরিণাম। নজরুলকে তাঁর বিদ্রোহের জন্যে কাঠগড়াতে শাস্তির জন্যে শান্তি ভঙ্গের দায়ে দাঁড়াতে হয়েছে। শাস্তিও পেতে হয়েছে। তাঁর রাজবন্দীর জবানবন্দীতে সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ স্পষ্ট এবং এটাই দৃষ্টান্ত। জেলে বন্দী হবার পর তিনি এই গদ্যটি লিখেছিলেন। কেমন ছিলো তাঁর লেখার বিদ্রোহ, শব্দ চয়ন তার পাঠ নেয়া যাক :
‘আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এ তো ন্যায়ের শাসন হতে পারে না। এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে ন্যায়, দিনকে রাত বলানোÑ একি সত্য সহ্য করতে পারে? …
রাজার পেছনে ক্ষুদ্র, আমার পেছনে রুদ্র। রাজার পক্ষে যিনি, তার লক্ষ্য স্বার্থ, লাভ অর্থ, আমার পক্ষে যিনি তার লক্ষ্য সত্য, লাভ পরমানন্দ। রাজার বাণী বুদ্বুদ, আমার বাণী সীমাহারা সমুদ্র। আমি কবি, অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করবার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তি দানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন।…সত্য স্বয়ংপ্রকাশ। তাহাকে কোনো রক্ত-আঁখি রাজ-দÐ নিরোধ করতে পারে না। আমি সেই চিরন্তন স্বয়ম্-প্রকাশের বীণা, যে-বীণায় চির-সত্যের বাণী ধ্বনিত হয়েছিল। আমি ভগবানের হাতের বীণা। বীণা ভাঙলেও ভাঙতে পারে, কিন্তু ভগবানকে ভাঙবে কে?’
অথবা ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় নজরুলের সর্বময়ী প্রার্থনা এমন চতুর্দিকবেদী : ‘প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,/ যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!’ এখানে পাঠক মাত্রই বিস্মিত হবেন নজরুলের স্পর্ধা দেখে। বিস্মিত হবে শব্দের শান দেখে। ঐ সময়ে প্রতিকূলতার মধ্য থেকে আমরা বহুদূর থেকেও নজরুলের উচ্চকণ্ঠ শুনতে পাই। বাংলা সাহিত্যে তাঁর বিদ্রোহ অনন্য ও অতুলনীয়।
বয়সে টগবগে তরুণ, মননে-চিন্তায় সত্তর পাড়ি দেয়া প্রবীণ সুকান্ত ভট্টাচার্যও চাইতেন তিনি মানুষের কবি হবেন। তাঁর কবিতায় মানুষের দাবি থাকবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ থাকবে, শৃঙ্খল ভাঙার গান রণিত হবে শব্দে শব্দে। সেটা তিনি করেওছেন তাঁর কবিতায়। তবে তাঁর বিদ্রোহ ও প্রতিবাদ অন্যদের তুলনায় একটু ব্যতিক্রম তো বটেই। রয়ে-সয়ে ধীরস্থির কিন্তু তারপরও তীক্ষè-তির্যক তাঁর ভাষা। মানুষের উপলব্ধিতে পৌঁছানোর মতো সাবলীলতা তরুণ বয়সেই তিনি আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন। তাঁর ‘সিঁড়ি’ কবিতা :

‘আমরা সিঁড়ি
তোমরা আমাদের মাড়িয়ে
প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও,
তারপর ফিরেও তাকাও না পিছনের দিকে;
তোমাদের পদধূলিধন্য আমাদের বুক
পদাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় প্রতিদিন।
তোমরা তা জানো,
তাই কার্পেটে মুড়ে রাখতে চাও আমাদের বুকের ক্ষত
ঢেকে রাখতে চাও তোমাদের অত্যাচারের চিহ্নকে
আর চেপে রাখতে চাও পৃথিবীর কাছে
তোমাদের গর্বোদ্ধত, অত্যাচারী পদধ্বনি।’

বেগম রোকেয়ার কথাও এখানে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ্য। কেননা, তাঁর প্রতিবাদ ছিলো জলের মতো। কিন্তু তাঁর ভ‚মিকা সে-সময়ে ও পরবর্তীতে কার্যকর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। নারী আন্দোলনের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সেই ঊনিশ শতকের শেষ দিকে ও বিংশ শতাব্দির প্রথম ভাগে যে বলিষ্ঠ ভ‚মিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেনÑতা এক কথায় অনবদ্যও। তিনি তৎকালীন সমাজের নারীদের এগিয়ে নিতে সাহিত্যচর্চা করেছেন যেমন, তেমনি সামাজিক কাজও করেছেন। তাঁকে বলতে শুনি, তিনি বলছেন : ‘ভগিনীরা! চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন, অগ্রসর হউন! মাথা ঠুকিয়া বল মা! আমরা পশু নই; বল ভগিনী! আমরা আসবাব নই; বল কন্যে আমরা জড়োয়া অলঙ্কাররূপে লোহার সিন্ধুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বলো আমরা মানুষ।’ এ কথাও একটা বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহ তৎকালিন পুরুষশাসিত গোঁড়াপন্থী, সংস্কার আচ্ছন্ন মানুষদের বিরুদ্ধে। তিনি নারীকে মানুষ হিসেবে দেখেছেন, নারীর অধিকারের কথা বলেছেন। কেউ হয়তো তাঁকে তখন ধর্মের দোহাই দিয়ে নিবৃত্ত করতে চেয়েছেন, কেউ গালাগালিও করেছেন। কিন্তু ‘সুলতানার স্বপ্ন’র রচয়িতার পথচলা থামে নি। কষ্ট পেয়েছেন, পীড়িত হয়েছেন, কখনো অবহেলিতও হয়েছেন কিন্তু থেমে যাননি। বিদ্রোহীরা এমনই, থেমে চলা তাঁদের কাজ নয়Ñএগিয়ে যাওয়াই তাদের ধর্ম।
হেলাল হাফিজের বিদ্রোহের বিশেষত্ব তাঁর প্রেম। তিনি তাঁর কবিতায় প্রেম ও দ্রোহের অপূর্ব সম্মিলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়তে তিনি বলেছেন : ‘যদি কেউ ভালোবেসে খুনি হতে চান/তাই হয়ে যান/উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।/ এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’
আবার ‘অস্ত্র সমর্পণ’-এ তাঁর কণ্ঠস্বর সেই একই। যেন কবিতায় প্রেম ও দ্রোহের মহামিলন ঘটেছে। ফলে বাংলা সাহিত্যে তিনি আলাদাই রয়ে গেলেন। তাঁর অস্ত্র সমর্পণ :

‘অথচ তোমাকে আজ সেই আমি কারাগারে
সমর্পণ করে, ফিরে যাচ্ছি ঘরে
মানুষকে ভালোবাসা ভালোবাসি বলে।

যদি কোনোদিন আসে আবার দুর্দিন,
যেদিন ফুরাবে প্রেম অথবা হবে না প্রেম মানুষে মানুষে
ভেঙে সেই কালো কারাগার
আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার।

নির্মলেন্দু গুণের বিদ্রোহ, সংক্ষুব্ধতা নানা দিকে ছড়িয়ে আছে। কখনো অন্যায়-অবিচার, কখনো শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ। শ্রেণিসংগ্রাম তাঁর ভিতরেও দেখি। ক্ষেতমজুরের কাব্যে তিনি বলেন : ‘খোদার জমিন ধনীর দখলে/ গেছে আইনের জোরে,/ আমাগো জমিন অইব যেদিন/ আইনের চাকা ঘোরে।’
এ নিবন্ধের স্বল্প পরিসরে শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান যেমন আসেনি, তেমনি আসেনি আল মাহমুদ, আবুল হাসান প্রমুখ বরেণ্যদের নাম। তার মানে এই নয় যে, তাঁরা দ্রোহ বা প্রতিবাদের কবিতা, গল্প, উপন্যাস লিখেন নি। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, এমন সাহিত্যিক কমই আছেন যারা দ্রোহী বা প্রতিবাদী হন নি। তাঁদের কর্মের প্রতি, সৃষ্টির প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। আলোচ্য প্রবন্ধে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যকর্ম, গণঅভ্যুত্থানের কথাও আনা যেতে পারতো। কিন্তু স্থান সীমাবদ্ধতার জন্যে সেটি সম্ভব হলো না। তবে পরে এ বিষয়ে আরো ব্যাপৃত কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে ঐভাবে আমরা দ্রোহের রচনা পাচ্ছি না, এর কারণ হয়তো বড় কোনো পরিবর্তন বা ঢেউ আমাদের জীবনকে দোলায়িত করে নি। আবার উল্টোও হতে পারে। দোলায়িত হয়েছেন অনেকেই কিন্তু লেখেন নি। তবে নিঃসন্দেহে মানুষের জন্যে এমন দ্রোহ বা প্রতিবাদের কবিতা ও গল্পমুখরতা এবং প্রবন্ধের প্রাজ্ঞতার উপস্থাপন সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবে, চেতনা ও মননের নদীতে অনেকটাদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে আমাদের।