সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আমাদের শিক্ষা

লিটন দাশ গুপ্ত

12

আজ শুভ বিজয়া দশমী। সনাতন ধর্মাবলম্বীর সকল সদস্যসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি রইল আমার পক্ষ থেকে শারদীয়া বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা। বাঙ্গালী হিন্দুদের সর্ব বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে শারদীয়া দূর্গোৎসব। অপরপক্ষীয় তিথির পর, মহালয়া বা পিতৃপক্ষের সূচনা থেকে সাধারণত দূর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সেই হিসাবে মহালয়ার অমাবস্যা তিথিতে দেবী মা দূর্গা দুই পুত্র কার্তিক গনেশ ও দুই কন্যা লক্ষী সরস্বতীকে সাথে নিয়ে মর্ত্যে পিতৃগৃহে আগমন করেন। আজ বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্যদিয়ে নিরাকার হয়ে দেবী দূর্গা পিতৃগৃহ হতে, কৈলাশে স্বামীর গৃহে প্রত্যাবর্তন করবেন।
বাংলার আবহমান কাল থেকে লোকজ সমাজে ও সংস্কৃতিতে অন্যান্য দেবদেবীর মত যুক্ত হয়ে আছে দুর্গতি নাশিনী দেবী দূর্গা। তবে বাঙ্গালী হিন্দু সমাজে দেবী দূর্গাকে অন্য রকম শ্রদ্ধা ও ঘরের মেয়ে হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ এই সময় বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসা ঘরের মেয়ে মনে করে বাঙ্গালী হিন্দু সমাজ। একই সাথে সেই ভাবেই বরণ করে থাকে, আদরযতœ ও আপ্যায়ন শেষে দশমীতে বিদায় দিয়ে থাকে।
পুরাণে কথিত আছে মহিষাসুরের সাথে নয়দিন নয়রাত যুদ্ধ করার পর, দশম দিনে জয় লাভ করেন দেবী দূর্গা। এখানে বাল্মীকি মুনি রচিত রামায়ণ, দেবী ভাগবত পুরাণ, কিংবা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণসহ বিভিন্ন শাস্ত্র গ্রন্থে বিভিন্নভাবে দেবী দূর্গার মহিমা ব্যাখ্যা প্রদান করা হলেও এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ মার্কেন্ডিয় পুরাণে উল্লেখিত মতামতকে বিশ্বাস করে। মার্কেন্ডেয় পুরাণ মতে, সত্য যুগে আমত্যবর্গের (মন্ত্রীপরিষদের) বিদ্রোহের ফলে কোলা রাজ্যের রাজা সুরথ রাজ্যচ্যুত হন। অতঃপর আত্মরক্ষার্থে রাজা সুরথ গহীনবনে আত্মগোপন করতে চলে আসেন। সেখানে পরিচয় হয় গৃহহারা হয়ে আসা বৈশ্য সমাধির সাথে। অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে দুজনেই আশ্রমে গিয়ে মেধামুনির শরণাপন্ন হন। মেধামুনি তাঁদের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শুনেন এবং তাঁদেরকে মহামায়ার আরাধনা করতে পরামর্শ প্রদান করেন। মেধামুনির কথা মত মহামায়ার পূজা করে অবশেষে রাজা সুরথ হারানো রাজ্য ফিরে পান। এই মহামায়ায় হচ্ছেন দেবী দূর্গা। এই সম্পর্কে ‘প্রথম দূর্গাপূজা ও মেধসআশ্রম আবিষ্কারের কথা’ শিরোনামে পত্রিকায় উপ-সম্পাদকীয়তে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম।
যাই হোক এখন কথা হচ্ছে ভারতের পর, পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বাংলাদেশে চলতি বছর প্রায় সাড়ে একত্রিশ হাজার পূজো মন্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশে বিভিন্ন পূজামন্ডপে বিভিন্ন ধরণের থিম সাজসজ্জা এবং জাতি ধর্ম বর্ণ নারী পুরুষ দল মত নির্বিশেষে সকলের উপস্থিতির ফলে, শারদীয়া দূর্গাপূজা জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এবার বিভিন্ন পূজামন্ডপে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ সামিল হওয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে বলা যায়। আর তাই নোয়াখালীর মত জায়গায় রামেন্দ্র সাহার বাড়িতে ১০০ ফুট উচ্চতার প্রতিমা তৈরী করে পূজা করতে সক্ষম হয়েছে। কিংবা দেশের বাগেরহাটের লিটন শিকদারের বাড়িতে কয়েক কিলোমিটার বিস্তৃত একটি মন্ডপে ৮০১ টি বড় বড় বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি তৈরী করে জমকানো এক বর্ণিল পূজার আয়োজন করতে পেরেছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম পূজোর স্বীকৃতি পেয়েছে এবং আগামীতে আরো বড় আকারে ১০০১ টি মূর্তি তৈরী করে পূজোর ঘোষনা দিয়েছে।
লেখা বাহুল্য হলেও লিখতে হয়, অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় এই সরকারের আমলে শংকামুক্ত শান্তি সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে, সনাতন সম্প্রদায় ধর্মীয় রীতি নীতি মেনে পূজা পার্বণ অনুষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে এবং হচ্ছে। আর এতে করে একটি প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ঈর্ষান্বিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে ধর্মীয় বিদ্বেষ সৃষ্টির মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। যার মধ্যে ইসকন’কে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী বা জঙ্গী গোষ্ঠী বলে মিথ্যা অপপ্রচার, সরকারি চাকুরী ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ করতে, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্যে, হিন্দু আধিক্য নিয়োগ দিচ্ছে বলে দেশের মানুষকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করা ইত্যাদি।
অনেক চড়ায় উৎরায় পেরিয়ে ’৪৭ সালে তথাকথিত দ্বিজাতি তত্তে¡র ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হলে, বাংলাদেশ পাকিস্থানের অংশে যুক্ত হয়ে এক চরম মহাসাম্প্রদায়িক সংকটে পড়েছিল। ’৭১ সালে অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যুদ্ধের মধ্যদিয়ে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। যেই রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ জয়ী হয়েছিল, এখন সেই রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকাতে বা সরকার গঠন করাতে, ধর্ম যার যার উৎসব সবার পরিণত হয়েছে। সার্বিকভাবে বলা যায় দেশ আজ শিক্ষা সাহিত্য স্বাস্থ্য সংস্কৃতি অর্থনীতি যোগাযোগ তথ্য প্রযুক্তিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ হয়েছে। আজ বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। ইতোপূর্বে এই সম্পর্কে ‘বাংলাদেশ এখন বিশ্ব দরবারে মর্যাদাবান এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তি’ শিরোনামে উপসম্পাদকীয় লিখেছিলাম।
যাই হোক, কথায় কথায় অনেক কথা বলে ফেললাম। আবার কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেলেছি জানিনা। এইদিকে নিরপেক্ষ কথা বলতে গেলেও অনেকে রাজনৈতিক বা ভিন্ন প্রসঙ্গের বক্তব্য বলে বির্তক শুরু করবে। এখন শেষকথা হচ্ছে জেগে উঠুক মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি, সামগ্রিকভাবে সমৃদ্ধ হোক দেশ ও জাতি, অব্যাহত থাকুক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন; আজকের শারদীয়া দূর্গোৎসব থেকে এটাই হোক আমাদের শিক্ষা। একই সাথে অসুর ও অশুভ দানব শক্তি বিনাশ করে, মানব মনে ঐক্যবদ্ধ শক্তি সঞ্চিত হোক এবং শরতের শুভ্র কাশফুলের মত সকলের মনে একরাশ শান্তির শ্বেতস্নিগ্ধ পুষ্পরাশি প্রস্ফুটিত হোক এটাই আমার আজকের লেখার মাধ্যমে সবার কাছে প্রত্যাশা। পরিশেষে সবাইকে আবারো জানাচ্ছি বিজয়াদশমীর আন্তরিক শুভেচ্ছা, জয় মা দূর্গা