নির্বাচনের আগে জঙ্গি তৎপরতা

সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে

7

দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীর প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা চলাকালীন ও জাতীয় নির্বাচনের আগে আবারও জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক নানা মেরুকরণের মধ্যে জঙ্গিদের হঠাৎ তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়া দেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। চট্টগ্রাম ও নরসিংদীর পৃথক দুটি ঘটনা সরকারকে চিন্তায় ফেলেনি শুধু, আমাদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলছে। এ অবস্থায় সরকারের জঙ্গি বিরোধী তৎপরতা আরো জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে বলে আমরা মনে করি। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় জঙ্গিবিরোধী অভিযানের পরপর গত রবিবার ঢাকার নিকটে নরসিংদী জেলার মাধবী উপজেলায় দুটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পেয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম (সিটিটিসি) ইউনিট। একটি মাধবদী উপজেলার শেখেরচর ভগীরথপুর চেয়ারম্যান মার্কেট এলাকায়। অন্যটি মাধবদী ছোট গদাইরচর গাংপাড় এলাকায়। গত মঙ্গলবার বিকেলে ভগীরথপুরের অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। অপারেশন ‘গার্ডিয়ান নট’ নামে এ অভিযানে নারীসহ দুই জঙ্গি নিহত হয়েছে। অন্যদিকে বুধবার দুপুরে ছোট গদাইরচর গাংপাড় এলাকার একটি বাড়ি থেকে দুই নারী জঙ্গি আত্মসমর্পণ করার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় জঙ্গিদের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভগীরথপুর এলাকায় অভিযানের পর পুলিশ জানায়, বাড়িটিতে দুজনের লাশ পাওয়া গেছে। এদের একজন পুরুষ ও একজন নারী। তারা চারটি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত দুজনেরই বয়স ত্রিশের কোঠায়। তারা নব্য জেএমবি’র সদস্য। পাঁচ তলা বাড়ির পঞ্চম তলার ওই ফ্ল্যাটটি ৩ অক্টোবর ভাড়া নিয়েছিল তারা। ছোট গদাইরচর গাংপাড় এলাকার জঙ্গিদের সঙ্গে এখানকার জঙ্গিদের যোগসাজশ রয়েছে বলে পুলিশ মনে করছে। পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য মতে, দুর্গাপূজা ও সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জঙ্গিরা বড় ধরনের নাশকতার জন্য সংগঠিত হচ্ছিল। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে আস্তানা দুটি চিহ্নিত হওয়ায় ঝুঁকিটা বড় করে দেখা হচ্ছে। এর আগে ৫ অক্টোবর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জে একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে দুই পুরুষ জঙ্গির ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধার করে র‌্যাব। এই আস্তানায় জঙ্গি সদস্যরা চট্টগ্রাম আদালতে হামলাসহ বিভিন্ন স্থানে নাশকতার চক্রান্ত করছিল বলে পুলিশের গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
সরকারের নজরদারি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও জঙ্গি তৎপরতা থেমে নেই। ঠিক আগের মত নতুন খোলসে দেশের অভ্যন্তরে জঙ্গিরা নানাভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আশার কথা, জঙ্গিদের ভয়াবহ সব পরিকল্পনা আগেই নস্যাৎ করতে সক্ষম হয়েছে র‌্যাব ও পুলিশ, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বড় সাফল্য। বর্তমান সরকার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। গত কয়েক বছরে দেশে যেভাবে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছিল তাতে আন্তর্জাতিক বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সরকার কঠোর মনোবল ও সাহসের সাথে জঙ্গিদের সকল পরিকল্পনা ও তৎপরতা অতি অল্পসময়ে থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। যা বিশ্ববাসীর কাছে প্রশংসিত হয়েছে। বলা যায়, জঙ্গি তৎপরতা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। এরমধ্যেও জঙ্গিদের যেকোন তৎপরতা গোয়েন্দা পুলিশের নজর এড়াতে পারছে না।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আগাম তথ্য নিয়ে বেশকিছু জঙ্গি আস্তানায় সফল অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হচ্ছে। এই তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি জঙ্গি দমন অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও নব্য জেএমবি বা অন্য জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর গোপন তৎপরতা কীভাবে চলছে এবং কারা এর সাথে যুক্ত তা গভীর অনুসন্ধান করা দরকার। সম্প্রতি জঙ্গিদের অপতৎপরতায় প্রতিয়মান হওয়া যায়, জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তারা বিভিন্ন কৌশলে তাদের তৎপরতা অব্যাহত রাখছে এবং নতুন নতুন সদস্য সংগ্রহ করছে। এক্ষেত্রে ইসলামের নামে নতুন ধর্মীয় মতবাদ লা মাযহাবিদের প্রতি তীক্ষ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। আমরা আরো মনে করি, জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধ হলে এদের তৎপরতাও আরো কমে যাবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে তদারকি করতে হবে। এছাড়া সরকার আগে যেভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল- তা আবারও চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে।