সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আর নেই

জন্ম : ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩০ মৃত্যু : ১৪ জুলাই, ২০১৯

পূর্বদেশ ডেস্ক

30

সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। গতকাল রোববার সকাল পৌনে ৮টায় ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গত ১০ দিন ধরে এই হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিনি। ৯০ বছর বয়সী এরশাদ রক্তের ক্যান্সার মাইডোলিসপ্লাস্টিক সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিলেন; শেষ দিকে তার ফুসফুসে দেখা দিয়েছিল সংক্রমণ, কিডনিও কাজ করছিল না।
ভাইয়ের শারীরিক অবস্থার কথা জানাতে গিয়ে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের শনিবার বলেছিলেন, এরশাদের কোনো অঙ্গ আর স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না। প্রতিদিন ডাকলে চোখে মেলে তাকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আজ তা করেননি। আসলে তার বয়স হয়েছে। বয়সের কারণে যে উন্নতি হওয়ার কথা তা হচ্ছে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত-সমালোচিত চরিত্র এরশাদ সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় আশির দশকে অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে আট বছর দেশ শাসন করে গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের আগের সরকারে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের দায়িত্বপালনকারী এরশাদ বর্তমান সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্বে ছিলেন।
এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে সিএমএইচে ছুটে যান। তার সঙ্গে ছেলে রাহগির আল মাহি এরশাদও (শাদ এরশাদ) ছিলেন। এরশাদের আরেক ছেলে এরিক এরশাদ রয়েছেন বারিধারায় তার বাড়ি প্রেসিডেন্ট পার্কে। এরিকের মা বিদিশার সঙ্গে প্রায় দেড় দশক আগে এরশাদের বিচ্ছেদ ঘটে।
এদিকে চার জানাজা শেষে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে মঙ্গলবার বিকালে ঢাকায় সেনাবাহিনীর কবরস্থানে দাফন করা হবে।
গতকাল রোববার বেলা ১টা ৫০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসে সেনা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে এরশাদের প্রথম জানাজা হয়।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক সেনাপ্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, এরশাদের ভাই ও জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা, এরশাদের বড় ছেলে সাদ এরশাদসহ জাতীয় পার্টির বিভিন্ন স্তরের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জানাজার এক ঘণ্টা আগে জাতীয় পতাকা ও সেনাবাহিনীর পতাকা মোড়ানো এরশাদের কফিন মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়।
এর আগে রোববার সকালে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) সাবেক সামরিক শাসক এরশাদের মৃত্যুর ঘণ্টাতিনেক পর তার দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা শেষকৃত্যের বিস্তারিত সূচি গণমাধ্যমকে জানান।
দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এরশাদের মরদেহ এখন সিএমএইচের হিমঘরে রাখা হবে।
আজ সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিরোধী দলীয় নেতার দ্বিতীয় জানাজা হবে। নেতা-কর্মীসহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের মরদেহ বেলা ১২টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রাখা হবে। বাদ আছর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তৃতীয় জানাজার পর এরশাদের মরদেহ আবারও সিএমএইচের হিমঘরে রাখা হবে।
রাঙ্গা সাংবাদিকদের বলেন, সোমবার (আজ) এরশাদের মরদেহ তার নির্বাচনী এলাকা রংপুরে নিয়ে যাওয়ার ভাবনা থাকলেও ‘প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে’ সম্ভব হচ্ছে না। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির মরদেহ মঙ্গলবার সকালে রংপুরে নেওয়া হবে।
সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা শহরের ঈদগাহ মাঠে ‘পেয়ারা’ নামে পরিচিত রংপুরের সন্তান এরশাদের চতুর্থ জানাজা হবে বলে তার প্রেসসচিব সুনীল শুভ রায় জানিয়েছেন। হেলিকপ্টারে করে ঢাকার আনার পর ওই দিনই বাদ জোহর বাংলাদেশের চতুর্থ সেনাপ্রধানের মরদেহ সেনা কবরস্থানে দাফন করা হবে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব জানান, পরদিন বুধবার বাদ আছর গুলশানের আযাদ মসজিদে এরশাদের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে রোববার জানাজা শেষে বিকালে রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সামনে এরশাদকে সেনা কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নেতাকর্মীরা। তারা বনানী কবরস্থান বা রংপুরে দাফনের দাবি জানান।
নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়ে রাঙ্গা বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের মতামত অনুযায়ী দাফনের স্থান পরিবর্তন হতে পারে। তার পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে আমরা স্থান চূড়ান্ত করব। নেতা-কর্মীরা চাইলে উন্মুক্ত স্থানেও কবর দেওয়া হতে পারে।
এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের বলেন, আপাতত আমরা সেনানিবাস কবরস্তানে দাফনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কর্মীরা যেহেতু উন্মুক্ত স্থানে দাফনের কথা বলেছেন, সেটা বিবেচনা করা হবে। খবর বিডিনিউজের
গত কয়েক বছর ধরেই স্বাস্থ্য নিয়ে সমস্যায় ছিলেন এরশাদ। গত বছরের শেষ ভাগে সিঙ্গাপুরে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আসার পর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে খুব একটা দেখা যায়নি তাকে। এই সময়ে নিজের সম্পত্তি ট্রাস্টে দিয়ে যান তিনি।
অসুস্থতার কারণে ভাই জি এম কাদেরকে উত্তরসূরি ঘোষণা করে তাকে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও বসিয়ে যান এরশাদ; যা নিয়ে দলের জ্যেষ্ঠ কো-চেয়ারম্যান রওশনের সমর্থকরা রুষ্ট ছিলেন বলে জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়।
গত ২২ জুন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এরশাদকে সিএমএইচে নেওয়া হলে রাখা হয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। পরে নেওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে।
অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলসহ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতিবাচক অনেক ধারা সৃষ্টির জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত এরশাদ। ৯০ এর গণআন্দোলনের সময় তাকে নিয়েই ‘বিশ্ব বেহায়া’ চিত্রকর্মটি এঁকেছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান। আর্থিক কেলেঙ্কারি, নারীদের নিয়ে কেলেঙ্কারি, রাজনীতিতে একের পর এক ‘ডিগবাজি’ দিয়েও আলোচিত ছিলেন তিনি। তবে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের কাছে এরশাদ ছিলেন নায়কসম; তারা ‘পল্লীবন্ধু’ হিসেবেই ডাকতেন তাকে।
এরশাদের জন্ম ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রæয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে। অবিভক্ত ভারতে শিশুকাল কুচবিহারে কাটে তার। ভারত ভাগের পর তার পরিবার চলে আসে রংপুরে; পেয়ারা ডাকনামে পরিচিত এরশাদের কলেজের পড়াশোনা চলে রংপুরেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এরশাদ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় পশ্চিম পাকিস্তানেই ছিলেন এরশাদ। তার ভাষ্য, তিনি বন্দি হিসেবে সেখানে ছিলেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়ার তথ্য তুলে ধরে অনেকে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাকিস্তান থেকে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে ফেরার পর মামা রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়ার (বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রতিমন্ত্রী) সুপারিশে এরশাদকে সেনাবাহিনীর চাকরিতে ফেরত নেওয়া হয় বলে সেক্টর কমান্ডার রফিকুল ইসলাম তার বইয়ে লিখেছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হন তিনি; তখন তার পদমর্যাদা ছিল কর্নেল।
১৯৭৫ সালে এরশাদ ভারতের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রতিরক্ষা কোর্সে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। ওই বছরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাÐের সময় তিনি সেখানেই ছিলেন। ওই ঘটনার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসা জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হওয়ার পর তার উদ্যোগে ভারত থেকে এনে এরশাদকে করা হয় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান, মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে। পাকিস্তান প্রত্যাগত এরশাদকে জিয়ার এই পদোন্নতি দেওয়া তখন ভালো চোখে দেখেননি মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তারা। জিয়া রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে ‘নির্বিষ’ এরশাদকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করেন; কিন্তু সেই এরশাদই তার জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ান বলে বিএনপি নেতারা এখন বলছেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে যে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে জিয়া নিহত হন, তার পেছনে এরশাদই কলকাঠি নেড়েছিলেন বলে জিয়ার স্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অভিযোগ। ওই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নেতা মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে তখন হত্যা করা হয়েছিল, সেই হত্যার মামলা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বইতে হয়েছে এরশাদকে, যদিও রায় হয়নি।
জিয়া নিহত হওয়ার পর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এরশাদ। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। নিজেকে সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করে সামরিক শাসন জারি করেন তিনি, স্থগিত করেন সংবিধান। প্রথমে বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদে বসিয়েছিলেন এরশাদ। কিন্তু সব ক্ষমতা ছিল এরশাদেরই হাতে। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এরশাদের অনুমোদন ছাড়া কোনো ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ ছিল না আহসানউদ্দিনের। তার এক বছর পর আর রাখঢাক না রেখে আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেন এরশাদ; যার এই ক্ষমতারোহণ অবৈধ বলে পরে রায় আসে আদালতের।
ক্ষমতায় বসার পর প্রথমে জনদল নামে একটি দল এরশাদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল, যা ছিল তার রাজনীতিতে নামার প্রথম ধাপ। এরপর বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে গড়ে তোলেন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় পার্টি’, মৃত্যু পর্যন্ত এই দলটির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতেই। এরশাদের নয় বছরের শাসনকালে অবকাঠামোর উন্নতির দিকটিই তার সমর্থকরা বেশি করে দেখান, তবে অবাধ দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরিতে এরশাদের সেদিকে আগ্রহ ছিল বলে সমালোচকরা বলেন। উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য কৃতিত্ব নেন এরশাদ; কিন্তু তাও তার রাজনৈতিক অভিলাষ বাস্তবায়নের ধাপ হিসেবেই দেখেন সমালোচকরা।
এরশাদ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী এনে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যুক্ত করেন, যা বাংলাদেশের অসা¤প্রদায়িক চরিত্র বদলে দেয় বলে সমালোচনা করলেও এরপর সংবিধান সংশোধন হলেও স্পর্শকাতর এই বিষয়টি কেউ স্পর্শ করতে চাননি।
ঢাকার বাইরে হাই কোর্টের বেঞ্চ স্থাপনসহ আরও নানা পদক্ষেপে বিতর্কিত ছিল এরশাদের ক্ষমতার যুগ। তখন গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাও ছিল সীমিত। এর মধ্যেও এরশাদের সময়ে স্বাস্থ্য নীতি প্রশংসা পায় সমালোচকদেরও; তার গুচ্ছ গ্রাম প্রকল্প ও পথশিশুদের জন্য পথকলি ট্রাস্টও ছিল আলোচিত।
এরশাদের সময়েই ১৯৮৫ সালে গঠিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক, তবে ভারত-পাকিস্তান টানাপড়েনে তা কখনই কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে একের পর এক বিদেশ সফর নিয়েও সমালোচিত ছিলেন এরশাদ।
নিজেকে কবি হিসেবে পরিচয় দিতে চাইতেন এরশাদ; ক্ষমতায় থাকার সময় তার তার লেখা কবিতা-গান রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে শোনানো হত, তবে সেগুলো আদতে তার লেখা ছিল কি না, তা নিয়ে ছিল মানুষের সন্দেহ।
দমন-পীড়ন দিয়ে নিজের শাসন বজায় রেখেছিলেন এরশাদ; তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯৯০ সালে প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হয় তাকে। ক্ষমতাচ্যুত এরশাদ বন্দি হন তখন, তার বিরুদ্ধে হয় অনেকগুলো দুর্নীতির মামলা। কিন্তু তার মধ্যেই চমক দেখিয়ে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে রংপুরের ৫টি আসন থেকে বিজয়ী হন এরশাদ। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টিতে জনধিকৃত এরশাদই একটি অবস্থান পেয়ে গিয়েছিলেন। ওই সময় ৪২টির মতো মামলা হয়েছিল এরশাদের বিরুদ্ধে; তাকে বাগে আনতে এই সব মামলাগুলোর ব্যবহারও পরে দেখা গেছে। ওই সব মামলার একটিতে কেবল তার সাজা হয়েছিল।
এরশাদকে ‘পুনর্বাসনে’ ক্ষমতায় যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকায় মনোবেদনা প্রকাশ করে শহীদ শামসুল আলম মিলনের মা সেলিনা আখতার বলেছিলেন, সারাবিশ্বে স্বৈরশাসককে দেশ ছাড়তে হয় নতুবা বিচারের মুখোমুখি করে কঠোর শাস্তি দিতে দেখা যায়। অথচ আমাদের এখানে স্বৈরশাসককে ছুড়ে না ফেলে ক্ষমতাসীন দলে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এটা কেবল বাংলাদেশে সম্ভব হয়েছে।
১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের শাসনামলে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান এরশাদ; দলের নেতৃত্বভার নেন স্ত্রী রওশন এরশাদের কাছ থেকে। এরপর বিভিন্ন সময় নানা ভাগ হয় এরশাদের দল। মূল দল নিয়ে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে যোগ দেন তিনি। এরপর টানাপড়েন ও নানা অনুযোগ করলেও আওয়ামী লীগের কাছাকাছিই থেকেছিলেন এরশাদ।
২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেন তিনি। নিজে হন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের নেতার আসনে বসেন তিনি। এই পদে থেকেই পৃথিবী থেকে চিরপ্রস্থান ঘটেছে তার।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক : জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গতকাল রোববার পৃথক শোকবার্তায় তারা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে এরশাদের গঠনমূলক ভূমিকার কথা স্মরণ করেন।
এদিকে পৃথক পৃথক শোকবাণীতে শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া ও প্রধান হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী।
বিএনপির শোক : এইচ এম এরশাদের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলীয় প্যাডে দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক বেলাল আহমেদ এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান।
এতে বলা হয়, সাবেক সেনা প্রধান ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এক শোকবার্তায় তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবারবর্গ ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

সামরিক
শাসক থেকে রাজনীতিক

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কর্মজীবন জীবন শুরু হয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। ছাত্রজীবনেও তিনি রাজনীতির সংস্পর্শে আসেননি। মৃত্যুর আগে তার বড় পরিচয় ছিল তিনি একজন রাজনীতিবিদ। রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন, সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, সর্বশেষ ছিলেন একাদশ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগে ও ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যার কারণে বিএনপির নেতৃত্বে ধস নামে। ওই সময় দেশের রাজনীতিতে সংকট ও শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এই সুযোগে রাজনীতিতে আসার সুযোগ পান এরশাদ। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের রাজনীতির সমান্তরালে জাতীয় পার্টি গঠনের মধ্যদিয়ে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এরশাদ। খবর বাংলা ট্রিবিউনের
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সামরিক শাসকের রাজনীতিবিদ হওয়ার প্রথম মডেল হচ্ছেন আইয়ুব খান। আমাদের দেশে এই মডেলটি প্রথমে অনুসরণ করেছেন জিয়াউর রহমান। সর্বশেষ সেই মডেলটি অনুসরণ করতে দেখলাম এরশাদকে। এই তিন ব্যক্তির রাজনীতিতে আসার ধরন একই রকম। অর্থাৎ, সেনাবাহিনীর কিছু লোক ক্ষমতা দখল করার পর সেনাপ্রধান এর কৃতিত্ব নিলেন এবং তার ইচ্ছা হলো, কৃতিত্বটাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য দরকার একটি রাজনৈতিক দল। আর এর জন্য সংবিধান সংশোধনসহ যা যা করা দরকার তাই করলেন এরশাদ।
জাতীয় পার্টির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে বলা হয়েছে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রæয়ারি রংপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। যদিও কোনও কোনও তথ্যমাধ্যম বলছে, এরশাদের জন্ম ভারতের কুচবিহার জেলার দিনহাটায়। তবে এরশাদ নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন তার জন্ম কুড়িগ্রামে মামা বাড়িতে।
জাতীয় পার্টির ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেন এরশাদ। এরপর ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে নিয়োগ লাভ করেন তিনি। ১৯৬০-৬২ সালে তিনি চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন। ১৯৬৮ সালে শিয়ালকোটে ৫৪তম ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯-৭০ সালে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এবং ১৯৭১-৭২ সালে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এরশাদ পশ্চিম পাকিস্তানে আটকা পড়েন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে তিনি পাকিস্তান থেকে দেশে আসেন। এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল পদে তাকে নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৩ সালে কর্নেল এবং ১৯৭৫ সালের ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ওই বছরই আগস্ট মাসে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদকে সেনাবাহিনীর প্রধান করা হয় এবং ১৯৭৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের হাতে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এর প্রায় ১০ মাস পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের সরকারকে উৎখাত করে এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে দেশে সামরিক শাসন জারি এবং নিজেকে প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে ঘোষণা দেন। এরপর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এএফএম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে অপসারণ করে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাজনীতিক হিসেবে এরশাদের প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে অনেকটাই ক্যারিশমেটিক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে রাজনীতি হয়। ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরে আওয়ামী লীগ ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং ওই সময়ে তাদের (আ.লীগ) ক্ষমতায় থাকার প্রশ্নই ওঠে না। আর জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পরে বিএনপিরও একই অবস্থা হয়েছিল। ওই সময়ে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়, এর সুযোগ নিয়েছিলেন এরশাদ। এরপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক বৈধতার সুযোগ নিয়ে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এরশাদ।
জাতীয় পার্টির ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৬ সালের পহেলা জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে পাঁচটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন এরশাদ। ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে এরশাদ পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
যদিও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জোটগত রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসেন এরশাদ। ২০১৪ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনের সময় অনেকটা নাটকীয় ঘটনার মধ্যদিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তিনি ও তার দল। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ওই নির্বাচন বয়কট করায় একমাত্র এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিই ছিল ক্ষমতাসীনদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দশম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে।
নির্বাচন বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যারা এরশাদের পতনের জন্য আন্দোলন করেছিল, তারাই আবার তাকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই দুই দলের কাছে ভোটের রাজনীতি প্রাধান্য পায়। সেই সুযোগে জেনারেল এরশাদ এবং তার দল জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে বৈধতা পেয়েছে। ১৯৯৬ সাল থেকে ভোটের রাজনীতি করতে গিয়ে এই দুই দল এরশাদকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছে। ফলে এরশাদের সামরিক শাসক থেকে রাজনীতিবিদ হওয়ার পেছনে এই দুই দলের বড় অবদান রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে এরশাদ গ্রেপ্তার হন। কারাগারে থেকেই ১৯৯১ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি রংপুরের পাঁচটি আসনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে বিজয়ী হন। ওই নির্বাচনে জিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে বিএনপি। তৎকালীন সরকার এরশাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুর্নীতির মামলা দায়ের করে। একাধিক মামলায় দÐপ্রাপ্ত হয়ে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন।
১৯৯৬ সালের ১২ জানুয়ারি সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদ আবারও পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। এই নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ছয় বছর জেলে থাকার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্ত হন। তবে আদালতের রায়ে দÐিত হওয়ার কারণে সংসদে তার আসন বাতিল হয়ে যায়।
জোটগত রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে ২০০০ সালে জাতীয় পার্টিতে ভাঙন ধরে। দলটি তিন ভাগ হয়ে যায়। তবে জাপার মূল অংশটি সব সময় এরশাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন পার্টির সভাপতি। ২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি আসনে জয়ী হয়। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে মহাজোট গঠন করেন তিনি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল ২৭টি আসনে জয় লাভ করে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আসন পায় ৩৪টি। এবার এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হন। ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন এরশাদ। বর্তমান সংসদে তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এরশাদের সন্তান
সন্ততিরা কে
কোথায়

সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের দুই স্ত্রীর দুই ছেলের পাশাপাশি অন্তত দুটি দত্তক সন্তানও রয়েছে। জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান মারা যাওয়ায় এই সন্তানরাই এখন তার উত্তরাধিকার। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে আট বছর বাংলাদেশ শাসনকারী এরশাদের প্রথম স্ত্রী রওশন এরশাদ। তবে তার আগেও তার একটি বিয়ের খবর পাওয়া যায়। এরশাদ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকার সময় ১৯৮৩ সালে তার স্ত্রী রওশন এরশাদের পুত্র জন্ম দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে তা নিয়েই ছিল বিতর্ক। রওশনের সেই ছেলে রাহগির আল মাহি এরশাদ (শাদ এরশাদ) তরুণ বয়সে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। এজন্য তাকে গ্রেপ্তারও হতে হয়েছিল।
তারপর মালয়েশিয়ায় প্রবাস জীবন শেষে শাদ এখন ঢাকাতেই থাকেন। পেশায় ব্যবসায়ী বলা হলেও তার কী ব্যবসা তা জানা যায়নি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-২ (ফুলবাড়ি-সদর-রাজারহাট) এলাকা থেকে তাকে প্রার্থী করার গুঞ্জনও ছড়িয়েছিল।
এরশাদের আরেক ছেলে এরিক এরশাদ। তার বয়স এখন ১৮ বছর। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এরিক বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে বাবা এরশাদের সঙ্গে থাকেন। গান-বাজনায় বিশেষ পারদর্শিতা রয়েছে তার। এরিকের মা বিদিশার সঙ্গে এরশাদ বিয়ে করেক বছর টিকেছিল। ২০০৫ সালে বিচ্ছেদের পর এরিককে নিয়ে এরশাদ ও বিদিশার যুদ্ধ আদালতে গড়িয়েছিল। পরে আদালতের আদেশে এরিকের দায়িত্ব পান এরশাদ। খবর বিডিনিউজের
এরশাদের ঘনিষ্ঠরা জানান, তার সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন সন্তান এরিক, তাকে নিয়েই তার যত ভাবনা ছিল। এক অনুষ্ঠানে এরশাদ বলেছিলেন, রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে এরিককে আমি সময় দিতে পারিনি। এরিক যখন আমার জীবনে আসে, তখন সে মাত্র দুই বছরের শিশু। সে স্নেহবঞ্চিত সন্তান। ছেলেবেলা থেকে মাতৃস্নেহ পায়নি। আমিও আমার অপর সন্তান জাতীয় পার্টি নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি সব সময়। ওকে স্নেহ-ভালবাসা দিতে পারিনি, বঞ্চনা করেছি।
এরশাদের পালিত পুত্র ২৫ বছর বয়সী আরমান এরশাদ রওফে এরশাদ থাকেন এরশাদের বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে। তার একমাত্র পালিত কন্যা জেবিনের বিয়ে হয়েছে। ৩৫ বছর বয়সী জেবিন এখন লন্ডনে থাকেন।

৬৩ বছরের
বাঁধন, অনবরত
কাঁদছেন রওশন

প্রায় ৬৩ বছরের সংসার জীবন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও বিরোধী দলীয় উপনেতা রওশন এরশাদের। কতোশত মান-অভিমান, হাসি-কান্নায় ভরপুর জীবন। এরপরও দু’জন দু’জনার। এক ছাদের নিচে থাকা হয়নি অনেকদিন। কিন্তু কখনোই আলগা হয়নি এ দম্পতির বাঁধন। সংসার জীবনের স্বর্ণালি স্মৃতিতে মোহাবিষ্ট হয়ে কায়মনোবাক্যে বরাবরই স্বামীর জন্য আকুল প্রার্থনায় ছিলেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও বারবার ছুটেছেন স্বামীর দুয়ারে। কখনো শয্যাশায়ী স্বামীর পাশে ধর্মগ্রন্থ পড়েছেন, কখনো অনবরত মস্তকে সৃষ্টিকর্তার কাছে জীবন ভিক্ষা চেয়েছেন। হাতে হাত রেখেছেন।
প্রিয়তম স্বামীর জীবনের আলো নিভে যাওয়ার ভয়ানক দুঃসংবাদ পেয়েছেন সাত সকালেই। স্থির থাকতে পারেননি। একমাত্র সন্তান রাহগীর আল মাহে সাদ এরশাদকে সঙ্গে নিয়েই ছুটলেন নিজেদের আলাদা করতে। কিন্তু স্বামীর পাশে যেতেই স্ত্রী দুর্বিনীত কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এ কান্না থামার নয়।
বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠা এ কান্না স্পর্শ করছে কাছের মানুষ থেকে দূরের মানুষকেও। অধিক শোকে যেন পাথর হয়ে গেছেন। কথাও বলছেন কম। বন্ধ রেখেছের নিজের সেলফোন। ৬৩ বছরের অ¤ø-মধুর সম্পর্কের ইতি টেনে শূন্য হৃদয় নিয়ে গুলশানের বাড়িতে এখন স্তব্ধ-নির্বাক রওশন এরশাদ। গতকাল রোববার দুপুর থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত কয়েক দফা বিরোধী দলীয় উপনেতার সহকারী একান্ত সচিব মামুন হাসান ও দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো এমন দৃশ্যপট। খবর বাংলানিউজের
জানা যায়, ১৯৫৬ সালে ময়মনসিংহের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে রওশনকে বিয়ে করেন সেনা কর্মকর্তা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। চাকরির কারণে বিয়ের পরপরই সংসার করা হয়ে ওঠেনি। ওই সময় রওশন নিজের পড়াশোনার জন্য ময়মনসিংহে থেকেছেন। স্ত্রীর জন্য আকুল হৃদয়ে সেই সময় নিয়মিতই ‘ডেইজি’ সম্বোধন করে তাকে চিঠি লিখতেন এরশাদ।
নানা ঘাটে এরশাদের জীবন বাঁক নিলেও জীবনের গোধূলি বেলায় এসেও নিজের স্বামী অন্তঃপ্রাণ মানসিকতার প্রমাণ দিয়েছেন রওশন। দু’জন আলাদা বসবাস করলেও কথাবার্তা হতো নিয়মিতই। এরশাদের রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি দুঃসময়েই পাশে ছিলেন। ভাঙনের মুখ থেকে রক্ষা করেছেন জাতীয় পার্টিকে।
বিভিন্ন সময় এরশাদ ও রওশনের মধ্যকার দ্ব›েদ্বর বিষয়টি ছিল বহুল চর্চিত বিষয়। তবে এ সম্পর্কে দলীয় নেতা-কর্মীরা বলছেন, দু’জনের সম্পর্ক ছিল মধুর। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মান-অভিমান হয়। কিন্তু কেউ কাউকে কোনোদিনই ছোট করে কথা বলেননি। সম্পর্ক অবনতির বিষয়টি ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের অপতৎপরতার প্রকাশ। মূলত সব সময়ই স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই দু’জনের মর্যাদা রক্ষা করেছেন।
ময়মনসিংহ জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আহমেদ বলেন, প্রেসিডেন্ট স্যার আর ম্যাডামের মধ্যে কখনোই কথাবার্তা বন্ধ হয়নি। দু’জন দু’জনকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে একটি কুচক্রি মহল তাদের মাঝে বিভেদের অপপ্রচার করতেন।
জাপার নেতা-কর্মীরা বলছেন, ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) যখন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখন নিয়মিতই তাকে দেখতে গেছেন রওশন এরশাদ। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। জাতীয় সংসদেও নিজের প্রতিটি বক্তৃতায় স্বামীর প্রসঙ্গ টেনে তার জন্য দোয়া চেয়েছেন। আসলে তাদের দু’জনের সম্পর্কের গভীরতা পরিমাপ করার মতো মন ছিল না ষড়যন্ত্রকারীদের। তাই দু’জনের সম্পর্ক নিয়ে সব সময়ই কুৎসা রটিয়েছে তার।
জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতার সহকারী একান্ত সচিব মামুন হাসান বলেন, আমরা সিএমইচে দেখেছি স্যারের কাছে গিয়ে ম্যাডাম যতোবার হাত বাড়িয়েছেন স্যার হাত ধরেছেন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা স্বামীর পাশে বসে ম্যাডাম কোরআন তেলাওয়াত করেছেন।
তিনি বলেন, জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। স্যারকে হারিয়ে ম্যাডাম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। সকাল থেকেই অঝোরে কেঁদেছেন। এখন অনেকটা পাথর হয়ে গেছেন।

বিদিশার আবেগঘন
স্ট্যাটাস

জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন তার সাবেক স্ত্রী বিদিশা এরশাদ। রবিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে
ফেসবুকে তিনি এ স্ট্যাটাস দেন। এই মুহূর্তে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বিদিশা। বিদিশা এরশাদ ফেসবুক পোস্টে লিখেন, এ জন্মে আর দেখা হলো না। আমিও আজমীর শরীফ আসলাম আর তুমিও চলে গেলে। এতো কষ্ট পাওয়ার থেকে মনে হয় এই ভালো ছিল। আবার দেখা হবে হয়তো অন্য এক দুনিয়াতে যেখানে থাকবে না কোনো রাজনীতি।
একই সময়ে বিদিশা এরশাদ ফেসবুকের প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করেন। এতোদিন বিদিশার ফেসবুক প্রোফাইলে এরশাদ ও তাদের ছেলে এরিকের ছবি ছিল। সেই ছবি সরিয়ে বিদিশার শোকের কালো ব্যাজের ছবি দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এইচএম এরশাদ রবিবার সকাল পৌনে ৮টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। গত ৪ জুলাই থেকে সিএমএইচে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন