সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ চৌধুরী

12

বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সমাজসেবী, সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ চৌধুরী চট্টগ্রামের উত্তর হালিশহর চৌধুরী পাড়ার আজগর আলী চৌধুরী পরিবারে ১৯২৮ সালের ১৬ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সিদ্দিক আহমদ চৌধুরী, মাতা আমজুন্নেছা বেগম। তিনি প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন। ছাত্র জীবনে তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতে যান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আই.এ. পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ, অর্জন করেন। বি.এ. অনার্স (রাষ্ট্র বিজ্ঞান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান এবং এম.এ. পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান। এই কৃতিত্বের ফলশ্রæতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত করে। লন্ডনের বিখ্যাত লিংকনস-ইন থেকে তিনি ব্যারিস্টারি পাস করেন। তিনি “সাংবাদিক আইন” এবং মোহামেডান ল’তে অতি উচ্চ মান লাভ করেন। ১৯৬০ সালে জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির ওপর সংক্ষিপ্ত কোর্স করেন। ছাত্রজীবন থেকে জনাব ব্যারিস্টার সুলতান রাজনীতি আরম্ভ করেন। তাঁর রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার পেছনে দেশকালের একটা পটভ‚মি আছে। চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশ উত্তাল হয়ে উঠে। মুসলিম লীগের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। জাতীয় রাজনীতির প্রভাব শিক্ষাঙ্গণেও এসে পড়েন। নবীন কলেজ পড়ুয়া সুলতান আহমদ চৌধুরী এ আন্দোলনে আকৃষ্ট হলেন এবং অবিলম্বে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে মিটিং মিছিলে অংশ নিতে থাকেন। তিনি সে সময় চট্টগ্রামের একজন বিশিষ্ট ছাত্রনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের যুগ্ম-সম্পাদক, পরে নগর কমিটির সম্পাদক নিযুক্ত হন। এ দায়িত্ব পালনের অল্পদিনের মধ্যে তিনি নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের য্গ্মু-সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৪৬ সালে নেতাজী সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের বীর নেতা ক্যাপ্টেন শাহনেওয়াজ ও অন্যান্য অফিসারদের কারামুক্তির জন্য দেশব্যাপী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ৪৬ সালে সিলেটের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে গণভোটে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করে। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালে আইয়ুবের সামরিক শাসনের কবল থেকে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারের জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে এনডিএফ নামে যে জোট গঠিত হয়েছিলো জনাব সুলতান তার কার্যকরী কমিটির সদস্য এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কারামুক্তির পর চট্টগ্রামে তাঁকে দেয়া বিশাল গণ সংবর্ধনা আয়োজনে সংবর্ধনা কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন।
এছাড়াও তিনি জহুর আহমদ চৌধুরীর সাথে ১৯৬৪ সাল হতে শ্রমিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ চৌধুরী বহু স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।
জনাব ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ চৌধুরী ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। ডেপুটি স্পিকার থাকাকালীন পূর্ণ মন্ত্রীর পদ-মর্যাদা লাভ করেন। পরে তিনি বন্দর, জাহাজ চলাচল ও অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন এবং ডাক, তার ও টেলিফোন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৮৫ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনেও তিনি তৎকালীন পাকিস্তান থেকে সরকারি শুভেচ্ছা মিশনের অন্যতম সদস্য হিসেবে তুরস্ক সফর করেন। ১৯৭৯ সালে শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বোতে অনুষ্ঠিত “আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা এবং বিশ্ব উন্নয়ন” সম্মেলনে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। একই বছরে কিউবার রাজধানী হাভানায় ৬৪টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের “ষষ্ঠ জোটনিরপেক্ষ সম্মেলন” অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে বাংলাদেশের তিন সদস্য বিশিষ্ট দলের মধ্যে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানÑএর সাথে তিনিও ছিলেন। ১৯৮০ সালে নরওয়ের রাজধানী অসলোতে অনুষ্ঠিত “আন্তঃ পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন”-এ তিন সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। সেবারই তিনি দুই বছরের জন্য আন্তঃপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে নিজের ও দেশের জন্য দুর্লভ সম্মান অর্জন করেন। ১৯৮০ সালের শেষভাগে পূর্ব জার্মানির রাজধানী বার্লিন-এ ‘‘আন্তঃপার্লামেন্টারি ইউনিয়ন”-এর সম্মেলনে দুই সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৮১ সালে কিউবার রাজধানী হাভান্য়া অনুষ্ঠিত ‘আন্তঃপার্লামেন্টারি ইউনিয়ন’-এ চার সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৩ সালের অক্টোবর মাসে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণক্রমে আমেরিকা যান। ১৯৮৫ সালের নভেম্বর মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় স্বল্পোন্নত দেশসমূহের জন্য জরুরি কর্মসূচী প্রণয়ন করে “মধ্যবর্তীকালীন আন্তর্জাতিক সম্মেলন”- এ বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে থাকাকালীন তিনি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা, চট্টগ্রামের অবহেলিত রাস্তাঘাট-এর সংস্কার ও উন্নয়ন, পাহাড়তলী এলাকায় একশত একর জমির ওপর ৪০২১টি স্বল্প আয়ের লোকদের জন্য প্লট ও ঘর নির্মাণের প্রকল্প, জলোচ্ছ্বাসে বিধ্বস্ত পতেঙ্গা ভেড়িবাঁধ সংস্কার, চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রকে ১০ কিলোওয়াট থেকে ১০০ কিলোওয়াটে উন্নীতকরণ, দ্বিতীয় চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ২৩ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ ইত্যাদি কাজে হাত দেন। মৃত্যু: ১৯ জুন, ১৯৯২। নাসিরুদ্দিন চৌধুরী রচিত ‘চট্টলনামা’ থেকে গৃহীত